ধর্ষকাদের শাস্তির
দাবিতে উত্তাল দেশ

ধর্ষকাদের শাস্তির<br>দাবিতে উত্তাল দেশ
+

নয়াদিল্লি, ১৫ই এপ্রিল — কাঠুয়া ও উন্নাওয়ের ধর্ষণকাণ্ডের প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে। নৃশংস এই দুই ঘটনায় জড়িতদের চরম শাস্তির দাবিতে রবিবার বিক্ষোভে শামিল হয় নাগরিক সমাজ। দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট, মুম্বাইয়ের বান্দ্রা কিংবা বেঙ্গালুরুর রিচমন্ড টাউনে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে মিছিল হয়। মানুষ বিক্ষোভ দেখান তিরুবনন্তপুর, ভোপালে। গোয়ার পাঞ্জিমে মোমবাতি মিছিলে শামিল হন বহু মানুষ। মোমবাতি মিছিল হয়েছে অমৃতসরেও। 
দিল্লির মিছিল ডাকা হয়েছিল ‘নট ইন মাই নেম’র ব্যানারে। দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক এবং জাতপাতভিত্তিক হিংসার প্রতিবাদে ২০১৭সালের জুনে এই ব্যানারেই বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন বহু মানুষ। এদিনও অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে তাঁরা পথে নামেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। দিল্লির আরেক প্রান্তে কাঠুয়ার ৮বছর বয়সি মেয়েটিকে ধর্ষণ এবং খুনের প্রতিবাদ জানায় প্রায় ওরই সমবয়সিরা। বান্দ্রার কার্টার রোডের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের হিসাবমাফিক শামিল হয়েছিলেন ৫০০-রও মানুষ। এই মিছিলে ছিলেন গায়ক ও সুরকার বিশাল দাদলানি। তিরুবনন্তপুরমের প্রতিবাদী মিছিলে ছিল শিশুরাও। আমেদাবাদে বিক্ষোভ দেখিয়েছে স্কুল এবং মাদ্রাসার পড়ুয়ারা। প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদেও।
এদিকে, বেগতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে জম্মু-কাশ্মীরের জোট সরকার। দেশজুড়ে আলোড়নের মুখে কাঠুয়া ধর্ষণ কাণ্ডের ক্ষতে প্রলেপ দিতে ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বি জে পি-র দুই বিতর্কিত মন্ত্রী। এদিন সকালে ওই দুই মন্ত্রী লাল সিং এবং চন্দর প্রকাশ গঙ্গার ইস্তফা গ্রহণ করে তড়িঘড়ি রাজ্যপাল এন এন ভোরার কাছে পাঠিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। বি জে পি-র শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে ওই দুই মন্ত্রী ইস্তফা দিতে বাধ্য হলেও জানিয়ে দেন যে, রাজ্য সভাপতির সম্মতিতেই তাঁরা অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। এরই পাশাপাশি ৮বছরের যাযাবর সম্প্রদায়ের ওই মেয়েটির ধর্ষণের পর নৃশংস খুনের মামলার শুনানি শুরু হচ্ছে সোমবার। এই মামলায় ৮জন অভিযুক্ত যাদের মধ্যে একজন নাবালকও আছে।
পদত্যাগী দুই মন্ত্রী শনিবার জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতি বুঝতে দলের নির্দেশেই তাঁরা প্রথমে কাঠুয়া গিয়েছিলেন। এরপরেই ধৃতদের মুক্তির দাবির মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা। জানা যায়, ওই মিছিলে জাতীয় পতাকাও ওড়ানো। জম্মু-কাশ্মীরের দায়িত্বপ্রাপ্ত বি জে পি নেতা রাম মাধব অবশ্য শনিবার দাবি করেন, ‘‘ওই মিছিলে অংশ নেওয়ার জন্যই ওঁদের ইস্তফা দিতে বলা হয়। গত মাসে দলের কাজে এসে স্পষ্ট বলে যাই যে ওই বিষয়ে কেউ মুখ খুলবেন না। তদন্ত শেষ করতে সাহায্য করুন।’ প্রশ্ন উঠছে, ১লা মার্চ ধৃতদের মুক্তির দাবিতে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন ওই দুই মন্ত্রী। তাহলে এতদিন পর কেন তাঁদের ইস্তফা দিতে বলা হলো। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, দেশজুড়ে প্রতিবাদ এবং পি ডি পি-র সঙ্গে গাঁটছড়া বজায় রাখার স্বার্থেই ইস্তফা দিতে বলা হয় ওই দুই মন্ত্রীকে।
কাঠুয়ার মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট একটি চার্জশিটের ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করবেন দায়রা আদালতে। ওই চার্জশিটে রয়েছে ৭ অভিযুক্তের নাম। আর এক চার্জশিটে রয়েছে অভিযুক্ত নাবালকের নাম। সেই শুনানি হবে জুভেনাইল আইন অনুযায়ী বিশেষ আদালতে। জম্মু-কাশ্মীর সরকার স্পর্শকাতর এই মামলায় দুইজন শিখ সরকারি কৌঁসুলি নিযুক্ত করেছে। রাজ্য সরকারের দাবি, শুনানি প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থেই দুইজন শিখকে সরকারি কৌঁসুলি হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছে। কেননা, ওই ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ড ঘিরে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভাজন চরমা আকার নিয়েছে।
রোহিঙ্গা-বাংলাদেশী শরণার্থী অনুপ্রবেশের অজুহাত দেখিয়ে আদালত কর্মবিরতির মেয়াদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন জম্মু-কাশ্মীরের আইনজীবীরা। ১৭ই এপ্রিল পর্যন্ত তাঁরা শুনানিতে অংশ নেবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন। মুখে শরণার্থী সমস্যার কথা বললেও কাঠুয়া কাণ্ডের ধর্ষক-খুনিদের আড়াল করতেই আইনজীবীদের ওই কৌশলী কর্মবিরতি মনে করছেন সবাই। আর সেকারণেই এদিন আইনজীবীদের এই কর্মবিরতি প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়েছে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (বি সি আই)। শুধু তাই নয়, কাঠুয়া ধর্ষণ মামলায় আইনজীবীরা যে অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটিয়েছেন তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধানকারী দল পাঠানোর কথাও জানিয়েছে বি সি আই। হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি তরুণ আগরওয়ালের নেতৃত্বে ওই দল গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। এদিন বি সি আই-র চেয়ারম্যান মান্নানকুমার মিশ্র সাংবাদিকদের বলেছেন, যদি দেখা যায় ওই অনভিপ্রেত কাণ্ডের সঙ্গে কোনো আইনজীবী যুক্ত ছিলেন তাহলে তাঁর লাইসেন্স বাতিল পর্যন্ত করে দিতে পারে অনুসন্ধানী দল। এমনকি এই ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান মান্নান কুমার। তেমন হলে ওই ধর্মঘটকে বেআইনিও ঘোষণা করতে পারে বি সি আই। একারণেই জম্মু-কাশ্মীর এবং কাঠুয়া বার অ্যাসোসিয়েশনকে অবিলম্বে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিতে বলেছে বি সি আই।
বি সি আই চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, অনুসন্ধানী দল ২০শে এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরে যাবে। সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে দল রিপোর্ট দাখিল করবে বি সি আই-র কাছে। সেই রিপোর্ট আবার বি সি আই দাখিল করবে সুপ্রিম কোর্টে। অবশ্য আগামী ১৯শে এপ্রিল এই ধর্ষণকাণ্ডের শুনানি আছে সুপ্রিম কোর্টে। আবার বি সি আই-র দল ওই রাজ্যে যাচ্ছে ২০শে। সেকারণে মিশ্র এদিন বলেছেন, তাঁরা দুই অথবা তিনদিনের স্থগিতাদেশের আবেদন জানাবেন সুপ্রিম কোর্টে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement