প্রতিরোধ জারি
থাকবে রাস্তাতেও

প্রতিরোধ জারি<br>থাকবে রাস্তাতেও
+

কলকাতা, ১৬ই এপ্রিল— আদালতে আইনী লড়াই চলবে, আর তারসঙ্গে রাস্তার লড়াইও জারি থাকবে। বিড়লা তারামণ্ডল থেকে তেতে ওঠা পিচপথ পেরিয়ে ধর্মতলার লেনিন মূর্তির পাদদেশে এসে জনস্রোত থামলে এক সংক্ষিপ্ত সভায় একথা বললেন সি পি আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র।
রাজ্যের বাম ও বাম সহযোগী দলগুলির কর্মী সমর্থকদের উদ্দেশ্যেই তিনি বললেন, রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের আমজনতার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে শুধু আত্মরক্ষার লড়াই নয়, প্রয়োজনে প্রতিরোধের লড়াইও আরও জোরদার করতে হবে। এদিন ১৭টি বাম ও বাম সহযোগী দলের নেতৃত্বে এই মহামিছিল শেষে রাজ্য বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু বললেন, রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ করতে যাবতীয় পদক্ষেপ নিতে হবে নির্বাচন কমিশনকেই। অন্যথায় গোটা রাজ্যেই অঘটন ঘটবে।
‘নির্বাচন কমিশন, মেরুদণ্ডে জোর বাড়াও’ —আওয়াজ উঠলো কল্লোলিনীর রাজপথ জুড়ে। বৈশাখের গোড়ায় ঠা ঠা রোদে ঘেমে ওঠা পিচরাস্তার ওপর দিয়ে বইলো জনস্রোত। বিড়লা তারামণ্ডল থেকে ধর্মতলার লেনিন মূর্তির পাদদেশ পর্যন্ত লালঝাণ্ডা কাঁধে নেওয়া এই মহামিছিলে রাজ্যের দক্ষিণবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলার বাম কর্মী সমর্থকরা শামিল ছিলেন। বেলা আড়াইটেয় মিছিল শুরুর কথা, কিন্তু তার ঢের আগেই দুপুর দেড়টা থেকে তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে এদিন মানুষের দখলে বিড়লা তারামণ্ডল চত্বর, আকাদেমি, ভিক্টোরিয়ার সামনের রাস্তা। গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্যের নানা প্রান্তে পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বকে ঘিরে তৃণমূলী গুণ্ডাবাহিনীর সশস্ত্র হামলা রক্ত ঝরিয়েছে বহু বাম কর্মীর। সন্দেহ নেই এমন রক্তপাতে বাম কর্মী সমর্থকদের মধ্যে অদম্য লড়াইয়ের জোর বাড়িয়েছে। সোমবার এই মহামিছিল থেকেই সোচ্চারে স্লোগান উঠেছে লুঠের পঞ্চায়েতকে বানাও মানুষের পঞ্চায়েতে।
পূর্ব বর্ধমানের রায়না থেকে হুগলির বলাগড়, পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়ারি থেকে নদীয়ার তেহট্ট রাজ্যের নানা প্রান্তেই শাসকদলের ভাড়াটে দুষ্কৃতীবাহিনীর চোখে চোখ রেখে ব্লক অফিসে রক্তাক্ত হয়েছেন যে বাম কর্মী-নেতৃত্ব এদিন তাঁরাও শামিল এই প্রতিরোধের মিছিলে। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, সি পি আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র, ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চ্যাটার্জি, সি পি আই নেতা প্রবীর দেব, আর এস পি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য, সি পি আই (এম এল) লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষ, বিধানসভার বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী, পার্টিনেতা শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, রামচন্দ্র ডোম প্রমুখ। দুপুর তিনটে নাগাদ বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম থেকে রওনা দেয় মহামিছিল। হাজার হাজার মানুষের পায়ে পায়ে জওহরলাল নেহেরু রোড ধরে পার্ক স্ট্রিট পেরিয়ে মিছিল পৌঁছেছে ধর্মতলায়। রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসক তৃণমূলের হিংস্র আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া এদিনের মিছিল থেকেই স্লোগান উঠেছে সিরিয়ায় মার্কিন-ব্রিটিশ-ফরাসী ক্ষেপণাস্ত্র হানার বিরুদ্ধে। আমেরিকান সেন্টারের সামনে দিয়ে মিছিল এগনোর সময় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্লোগান আরও সোচ্চার হয়ে ওঠে।
এদিন মিছিলশেষে পার্টির রাজ্য সম্পাদক বললেন, আদালতে দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকার নির্বাচন কমিশন জানাচ্ছে বর্তমান পঞ্চায়েতের মেয়াদ ফুরোবে আগামী আগস্ট মাসে। তাহলে পঞ্চায়েত নির্বাচনে এত তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে কেন? শুধু তাই নয়, আদালতে দাঁড়িয়ে সচিবরা বলছেন, আইন জানি না। ওঁদের আইনের জ্ঞানের তো অভাব রয়েছে। কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরই কাণ্ডজ্ঞানের অভাব রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে এদিন সূর্য মিশ্র বলেছেন, এমন বেপরোয়া জুলুম চালিয়ে পঞ্চায়েতের কিছু আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আপনি জিতে নিতে পারেন কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মন জিততে পারবেন না। শাসকদল, রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট জানিয়েছেন, যদি হিম্মত থাকে তবে মাঝখান থেকে পুলিশকে সরিয়ে নিন। তৃণমূলী গুণ্ডাদের অস্ত্র আর পুলিসের অস্ত্র আজ আলাদা করা যাচ্ছে না। মিছিলে শামিল বাম কর্মী সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, কোন আদালতের রায় আপনার অর্জিত অধিকার দেবে না। তা কেড়ে নিতে হবে লড়াই আন্দোলনের পথে।
এদিন বিমান বসু বলেছেন, রাজ্যে গণতন্ত্র ধ্বংস করার যে কৌশল নিয়েছে শাসক তৃণমূল তার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাতেই এই মিছিল। বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান, নদীয়া, হুগলী, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪পরগণা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলাগুলি থেকে মানুষ এসেছেন এই মহামিছিলে। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান এদিন বলেন উত্তরপ্রদেশে যে কিশোরীর ওপর পাশবিক অত্যাচার চলেছে তার তীব্র বিরোধিতা করছে এই মিছিল। একইসঙ্গে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সিরিয়ার ওপর যে নাগাড়ে বোমাবাজী করে চলেছে তারও বিরোধিতা করছে বাম দলগুলি। এদিন মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সভায় এছাড়াও বক্তব্য রেখেছেন ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চ্যাটার্জি, সি পি আই (এমএল) লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষ, সি পি আই-র পক্ষে প্রবীর দেব, আর এস পি-র পক্ষে সুকুমার ঘোষ প্রমুখ। তবে এছাড়াও অন্যান্য বাম ও বাম সহযোগী দলগুলির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এদিন ছিল এই প্রতিবাদের কর্মসূচীতে। এই সংক্ষিপ্ত সভায় বাম নেতৃত্ব এদিন বলেন, গ্রামের মানুষের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়াতে হবে রাজ্যের শহরাঞ্চলের মানুষকেও। রাজ্যজুড়ে এত ‘উন্নয়ন’ হয়েছে যে সরকারের শেষযাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement