খারিজ শাসক
দলের আরজি 

আজ শুনানি হবে সিঙ্গল বেঞ্চেই 

খারিজ শাসক<br>দলের আরজি 
+

নিজস্ব প্রতিনিধি:কলকাতা, ১৬ই এপ্রিল— আদালতে ফের জোর ধাক্কা খেল রাজ্যের শাসক দল। পঞ্চায়েত মামলায় তৃণমূল কংগ্রেসের আরজি খারিজ করে সিঙ্গল বেঞ্চেই মামলা ফেরত পাঠাল ডিভিসন বেঞ্চ। কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের এজলাসেই মঙ্গলবার দুপুরে মামলার শুনানি আবার শুরু হবে। সোমবারই বিচারপতি তালুকদার তাঁর দেওয়া স্থগিতাদেশের নির্দেশ বাড়িয়ে মঙ্গলবার বেলা দুটোয় মামলা শুনানির জন্য রেখেছিলেন। সোমবার ডিভিসন বেঞ্চের নির্দেশে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে সিঙ্গল বেঞ্চেই এই মামলার শুনানি হবে। এদিন ডিভিসন বেঞ্চের নির্দেশের পর রাজ্য নির্বাচন কমিশনের জারি করা নির্ঘন্ট অনুযায়ী ১লা মে ভোট গ্রহণ খুবই কঠিন হয়ে পড়ল। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পঞ্চায়েত ভোটের নতুন নির্ঘন্ট তৈরির সম্ভাবনাও প্রবল হয়ে উঠছে।
সোমবার বিচারপতি বিশ্বনাথ সমাদ্দার এবং বিচারপতি অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের ডিভিসন বেঞ্চ তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দায়ের করা আপিল মামলা নিষ্পত্তি করে তাঁদের নির্দেশে বলেছেন, সিঙ্গল বেঞ্চের জারি করা স্থগিতাদেশের ওপর আমরা হস্তক্ষেপ করছি না। এই মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া পর্যবেক্ষণকে অনুধাবন করতে হবে। ডিভিসন বেঞ্চের নির্দেশে বলা হয়েছে, রাজ্যে পঞ্চায়েতের মেয়াদ আগামী আগস্ট মাস পর্যন্ত আছে। ফলে মামলার টানা শুনানি গ্রহণ করে নিষ্পত্তির দিকে যেতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিদিন শুনানি গ্রহণ করতে হবে। সোমবার আদালতের এই নির্দেশের পর তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ আইনজীবী কল্যাণ ব্যানার্জি বলেছেন, মঙ্গলবার এই মামলা আদালত গ্রহণ করতে পারে কিনা, তা নিয়ে সওয়াল করা হবে। কলকাতা হাইকোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবীরা ডিভিসন বেঞ্চের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন, এই মামলা সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টকে শোনবার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। মামলার গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে সুপ্রিম কোর্ট আগেই এই মামলা খারিজ করে দিত। নির্বাচন নিয়ে নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে পাঠিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের সেই পর্যবেক্ষণ কার্যকরী করতে গিয়েই রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজ্যের শাসক দলের রোষের মুখে পড়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, ‘কোনও রাজনৈতিক দল এবং কোনও ব্যক্তি যাতে পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বঞ্চিত না হন এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।’ এই পর্যবেক্ষণকে সামনে রেখেই রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মনোনয়ন জমা দেবার জন্য একটি দিন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং শাসক দলের চাপে নির্বাচন কমিশনারকে রাতারাতি সেই মনোনয়ন পত্র জমা দেবার বর্ধিত সময়সূচি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হতে হয়।
সোমবার ডিভিসন বেঞ্চে বিচারপতি বিশ্বনাথ সমাদ্দার তৃণমূল কংগ্রেসের আইনজীবীকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, সিঙ্গল বেঞ্চে মামলার শুনানি শেষ হয়নি। সোমবারও শুনানির দিন ধার্য ছিল। সেখানে শুনানি শেষ না করে আপনারা আপিল মামলা করলেন কেন? উত্তরে তৃণমূল কংগ্রেসের আইনজীবী জানিয়েছেন, সিঙ্গল বেঞ্চ ভোট প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আদালতের নেই। সেই কারণেই আমাদের আপিল মামলা দায়ের করতে হয়েছে। এরপরই বিচারপতি সমাদ্দার রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সচিব নীলাঞ্জন শান্ডিল্যকে প্রশ্ন করেন, আপনার আবেদনও কি এই রাজনৈতিক দলের আবেদনের সঙ্গে একই? উত্তরে রাজ্য নির্বাচন কমিশন বলেছে, ‘না আমাদের আবেদনের সঙ্গে ওই রাজনৈতিক দলের আবেদনের কিছুটা মিল থাকলেও বেশ কয়েকটি জায়গায় পৃথক বক্তব্য আমাদের আছে।’ এরপর ডিভিসন বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করে, আপনারা কি কোন রাজনৈতিক দলের রঙ দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? বিচারপতি সরাসরি বলেন, আপনি কি আইন জানেন না? নির্বাচন কমিশনের তরফে আদালতে উত্তর দেওয়া হয়, না, আইনের মানুষ নই। এই উত্তর শুনে বিচারপতি মন্তব্য করেন, আপনি নির্বাচন কমিশনের মত এতবড় গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন, যেখানে আইনই মূল কথা। সেখানে আইন জানাটাই আবশ্যিক। এদিন ডিভিসন বেঞ্চ সওয়াল জবাবের পর জানায় বিকাল সাড়ে চারটের সময় মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। 
এদিন সিঙ্গল বেঞ্চে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে হলফনামা জমা দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি সুব্রত তালুকদার গত ১২ই এপ্রিল গোটা পঞ্চায়েত নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর যে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করেছিলেন সোমবার ছিল তার শেষ দিন। এদিন দুপুরে সিঙ্গল বেঞ্চ তার শুনানি গ্রহণ করে স্থগিতাদেশের সময়সীমা বাড়িয়ে মঙ্গলবার বেলা দুটো পর্যন্ত রাখার নির্দেশ দেন। এদিন আদালতে সি পি আই (এম)-র পক্ষে সওয়ালে রবীন দেব বলেন, মনোনয়ন জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের ওপর হিংস্র আক্রমণ চালিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। সি পি আই (এম) সহ অন্যান্য বিরোধীদলের প্রার্থীরা যাতে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে না পারেন তার জন্য মহল্লায় মহল্লায় সশস্ত্র আক্রমণ চালানো হয়েছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন শাসকদলের বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও সাহায্য করেনি। উলটে নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকা পুলিশ বাহিনী একযোগে শাসকদলের সঙ্গে আক্রমণ চালিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ নিশ্চুপ থেকে শাসক দলের দুষ্কৃতিদের সাহায্য করেছে। ফলে মনোনয়ন জমা পড়ার পর দেখা গেছে বহু জায়গায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসক দল জয়লাভ করে গেছে। আদালতে নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে দেব বলেন, অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের আবেদন নিয়ে রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেও কোনও লাভ হয়নি। রাজ্য নির্বাচন কমিশন সকল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণে সদর্থক ভূমিকা পালন করছে না নির্বাচন কমিশন। আদালতে সি পি আই (এম)-র পক্ষে সওয়াল করেছেন আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যও। ডিভিসন বেঞ্চের নির্দেশের পর তিনি বলেন, মামলা এমন পর্যায়ে রয়েছে, সেখান থেকে জোর দিয়েই বলা যায় নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভোট গ্রহণ সম্ভব নয়। ভোট পিছানোর সম্ভাবনা প্রবল। এদিন প্রদেশ কংগ্রেস, বি জে পি, পি ডি এস, সি পি আই ডিভিসন বেঞ্চের নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে চারটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে একটি জনস্বার্থের মামলার শুনানি দিন ধার্য রয়েছে আগামী বৃহস্পতিবার। সোমবার সি পি আই (এম)-র পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী সামিম আহমেদ, অর্ক মাইতি, সব্যসাচী চ্যাটার্জি। 

Featured Posts

Advertisement