ত্রিশঙ্কু কর্ণাটক
অনিশ্চিত

ত্রিশঙ্কু কর্ণাটক<br>অনিশ্চিত
+

বেঙ্গালুরু, ১৫ই মে— সকালে উল্লাস গেরুয়া শিবিরে। বেঙ্গালুরু থেকে নয়াদিল্লি ‘দাক্ষিণাত্য অভিযানের’ সূচনা বলে প্রবল বৃন্দবাদন। দুপুর গড়াতেই চিত্র গেল বদলে। শুরু হলো টানাপোড়েন। কংগ্রেস নির্বাচনে পরাস্ত হলেও জনতা দল (এস)-কে খোলাখুলি সমর্থন দিয়ে দেওয়ায় সুতোর ওপরে ঝুলছে সরকার গঠন। আপাতত অনিশ্চয়তায় কর্ণাটকের ভবিষ্যৎ। 
শেষ পর্যন্ত ত্রিশঙ্কুই হয়েছে কর্ণাটক বিধানসভা। বি জে পি-র ফল ভালো হলেও ১০৪-এ গিয়ে থেমেছে সেই রথ। ২২৪ সদস্যের বিধানসভায় ভোট হয়েছে ২২২ আসনে। নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১১৩ আসনের থেকে ৯টি কম রয়েছে কেন্দ্রের শাসকদলের। কংগ্রেস জয়ী হয়েছে ৭৮টি আসনে। জে ডি (এস) পেয়েছে ৩৭টি আসন। অন্যান্যরা ৩টি আসনে জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে বি এস পি জয়ী হয়েছে কোল্লেগাল কেন্দ্রে। রানিবেন্নুর কেন্দ্রে জিতেছেন কে পি জে পি দলের প্রার্থী। মুলবাগাল কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন নির্দল প্রার্থী। 
নিজেদের সরকার অসম্ভব, দুপুরেই বুঝে যান কংগ্রেস নেতৃত্ব। তখনই নয়াদিল্লির সর্বোচ্চ মহলে সিদ্ধান্ত হয় বি জে পি-কে ঠেকাতে সমর্থন করা হবে জে ডি (এস)-কে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে কংগ্রেস আরও একটু কম, দেবেগৌড়ার জে ডি (এস) আরও একটু বেশি আসন পাবে বলে মনে করা হচ্ছিল। স্বয়ং সোনিয়া গান্ধী টেলিফোন করেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেবেগৌড়াকে। প্রস্তাব দেন সমর্থন করার। রাজিও হয়ে যান দেবেগৌড়া। তাঁর পুত্র কুমারস্বামী এখন দলের প্রধান নেতা। নির্বাচনে কংগ্রেস এবং বি জে পি উভয়েই জে ডি (এস) বিরোধী বক্তব্য রাখলেও রাজনৈতিক বিন্যাসের দ্রুত বদল ঘটে যায় মঙ্গলবার। বিকালে ফল দাঁড়ায় কংগ্রেস-জে ডি (এস) জোট হলে তাদের বিধায়ক সংখ্যা হচ্ছে ১১৫। বস্তুত মায়াবতীর বি এস পি-ও এই জোটেই যুক্ত হবে, জে ডি (এস)-র সঙ্গী হিসাবেই ভোটে লড়েছে তারা। সেক্ষেত্রে সংখ্যা দাঁড়াবে অন্তত ১১৬। দুজন নির্দলের সমর্থনও দাবি করছে এই জোট। 
তৎপরতা কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় রাজভবন। কংগ্রেসের রাজ্য নেতারা প্রথমে রাজ্যপালকে গিয়ে জানিয়ে আসেন তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী পদে কুমারস্বামীকে সমর্থন করবেন। পরে, দিল্লি থেকে দৌড়ে আসা গুলাম নবি আজাদ, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া, মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং কুমারস্বামী একসঙ্গেই গিয়ে সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছেন। রাজ্যপাল ভাজুভাই ভালার কাছে দৌড়ে যান বি জে পি-র মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার বি এস ইয়েদুরাপ্পাও। তাঁর দাবি, বৃহত্তম দল হিসাবে তাঁদেরই আগে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া উচিত। কুমারস্বামী এবং ইয়েদুরাপ্পা উভয়েই দাবি করেছেন, সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তাঁরা বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেবেন। 
কাকে ডাকবেন রাজ্যপাল? এই প্রশ্নই এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেস- জে ডি (এস) প্রাক্‌ নির্বাচনী জোট না থাকলেও এখন এই কোয়ালিশনই গরিষ্ঠ। এই জোটের হাতেই বেশি বিধায়ক, এই দাবিই করেছেন জোটের নেতারা। অন্যদিকে, বি জে পি-র দাবি বৃহত্তম দলকেই সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ দেওয়া রীতি। সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, বি জে পি নিযুক্ত রাজ্যপালরা গোয়া, মণিপুর, মেঘালয়ে বৃহত্তম দলকে ডাকেননি। গোয়ায় ২০১৭সালে কংগ্রেস ৪০ আসনের ১৭টি পেয়েছিল, মণিপুরে ২০১৭সালে কংগ্রেস ৬০ আসনের ২৮ পেয়েছিল, মেঘালয়ে ২০১৮-তে কংগ্রেস ৬০ আসনের ২১ পেয়েছিল। কোনওটিতেই তাদের ডাকা হয়নি। মণিপুর, বিহারে পরে তৈরি হওয়া জোটকে ডাকা হয়েছিল এই নজিরই অনুসরণ করা হোক। এখন কর্ণাটকে কংগ্রেস- জে ডি (এস) গরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থনপুষ্ট। ইয়েচুরি ২০১৭সালে অরুণ জেটলির একটি টুইটও উদ্ধৃত করে বলেন, মণিপুর, গোয়াতে রাজ্যপাল ঠিক কাজই করেছেন বলে জেটলি দাবি করেছিলেন। 
কর্ণাটকের রাজ্যপাল ভালা গুজরাটে বি জে পি সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। মোদীর মুখ্যমন্ত্রীত্বে তিনি অর্থমন্ত্রী ছিলেন। মোদী যখন প্রথম বিধানসভায় দাঁড়াবেন বলে ঠিক হয়, নিজের বহুদিনের জেতা রাজকোট পশ্চিম কেন্দ্র ভালা ছেড়ে দিয়েছিলেন মোদীর জন্য। পরে মোদী মণিনগরে চলে গেলে ভালা ফের পুরানো আসন থেকেই জেতেন। কৈশোর থেকে আর এস এস কর্মী ভালা ২০১৪সালে মোদী সরকার তৈরি হবার পরে কর্ণাটকে রাজ্যপাল হয়েছেন। তাঁর স্বাভাবিক পক্ষপাতিত্ব কোনদিকে থাকবে, তা আন্দাজ করেই এগচ্ছেন কংগ্রেস-জে ডি (এস) নেতারা। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীকে এনে রাজ্যব্যাপী প্রচার চালিয়ে এতদূর পৌঁছানোর পরে থমকে গেলেও হাল ছাড়েনি বি জে পি। কর্ণাটকে দল ভাঙানোর প্রস্তুতিও চলছে বলে অনুমান রাজনৈতিক মহলে। বেল্লারির রেড্ডি ভাইদের সসম্মানে পুনর্বাসন দিয়েছেন স্বয়ং মোদী। তাঁদের টাকার অন্ত নেই। বিজয় মালিয়া থেকে রাজীব চন্দ্রশেখরকে রাজ্যসভায় এই রাজ্য থেকেই জিতিয়েছে বি জে পি। এবারের ভোটেও বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে বি জে পি। 
কর্ণাটকে সরকার ধরে রাখতে পারার ব্যাপারে আশাবাদী থাকলেও শেষ পর্যন্ত হারতেই হয়েছে কংগ্রেসকে। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া চামুণ্ডেশ্বরী কেন্দ্রে জে ডি (এস) প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলেও বাদামি কেন্দ্রে তিনি কোনওক্রমে জয়ী হয়েছেন। বাদামি কেন্দ্রে মাত্র ১৬৯৬ভোটে তিনি জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে বি জে পি-র মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ও রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদুরাপ্পা ৩৫, ৩৯৭ভোটে জয়ী হয়েছেন শিকারিপুরা কেন্দ্রে। জে ডি (এস) নেতা এইচ ডি কুমারস্বামী জয়ী হয়েছেন ২১হাজারেরও বেশি ভোটে। সিদ্দারামাইয়া সরকারের দশ মন্ত্রী ভোটে হেরে গেছেন। 
২০১৩সালের নিরিখে বেঙ্গালুরু শহরের কেন্দ্রগুলিতে কংগ্রেসের তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। গত বিধানসভায় তারা ১৩টি আসনে এবং বি জে পি ১১টি আসন পেয়েছিল। এবারও রাজ্যের রাজধানীর আসনগুলিতে একই ফলাফল রয়ে গেল। তবে, গ্রামাঞ্চলে বেশ কয়েকটি আসন এবার কংগ্রেসের হাতছাড়া হয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ১২২টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গড়েছিল। এবার তারা ৪৩টি আসন খুইয়েছে। কিন্তু ভোটের হারে এগিয়েই কংগ্রেস। শতাংশের বিচারে তারাই সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। কংগ্রেস প্রায় ৩৮শতাংশ ভোট পেয়েছে। গতবারের তুলনায় তাদের প্রায় ১.৫শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বি জে পি ৩৬.২শতাংশ এবং জেডি (এস) এর ঝুলিতে ১৮.৪শতাংশ ভোট গেছে। ২০১৪সালের লোকসভার তুলনায় বি জে পি প্রায় ৭শতাংশ ভোট খুইয়েছে। কংগ্রেসের কমেছে ৩শতাংশ ভোট। তবে, লোকসভার তুলনায় অনেক বেশি ভোট পেয়েছে জে ডি (এস)। 
অন্যদিকে বাগেপল্লি কেন্দ্রে চর্তুমুখী লড়াইয়ে দ্বিতীয় স্থান পেলেন সি পি আই (এম) প্রার্থী জি ভি শ্রীরামারেড্ডি। এই কেন্দ্র জয়ী হয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থী। শ্রীরামারেড্ডি পেয়েছেন ৫১, ৬৯৭টি ভোট। কংগ্রেস প্রার্থী এস এন সুবারেড্ডি পেয়েছেন ৬৫, ৭১০টি ভোট। তবে, মাত্র ৪১৪০টি ভোট পেয়ে এই কেন্দ্রে বি জে পি প্রার্থীর জামানত বজেয়াপ্ত হয়েছে। ২০১৩সালে এই কেন্দ্রে প্রায় ২৩হাজার ভোট পেয়েছিল বি জে পি প্রার্থী। 

Featured Posts

Advertisement