রক্তে ভাসছে 
গ্রাম বাংলা

মৃত বেড়ে ২৯ 

রক্তে ভাসছে <br>গ্রাম বাংলা
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১৫ই মে— রক্তাক্ত ভোটগ্রহণের দিন পার হয়ে এলেও মৃত্যুর মিছিল যেন শেষ হচ্ছে না। সোমবারে ভোট গ্রহণের দিনে প্রাণহানির আরও খবর পাওয়া গেছে এবং তারপর মঙ্গলবারও নতুন করে নির্বাচনোত্তর হিংসায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে সোমবার ভোটগ্রহণের দিন থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে মোট মৃতের সংখ্যা ২৯ হয়ে গেছে। নির্বাচন ঘোষণার পরবর্তী সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬। সোমবার ভোটগ্রহণের দিনেই প্রাণহানি ঘটেছে ২৪জনের। গুরুতর আহত ২জনের মৃত্যু হয়েছে মঙ্গলবার। নতুন করে হিংসায় এদিন প্রাণহানি ঘটেছে আরও ২জনের। 
ভোট ঘিরে সন্ত্রাস ও তার প্রতিরোধে প্রবল রক্তপাতের পরে বাংলার মানুষ আবার ধাতস্থ হওয়ার আগেই রাজ্য নির্বাচন কমিশন ১৯টি জেলায় ৫৭২টি বুথে পুনর্নির্বাচনের ঘোষণা করে দিয়েছে। বুধবার ঐ বুথগুলিতে পুনর্নির্বাচন হবে। কিন্তু যেসব জায়গায় পুনর্নির্বাচনের ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে শান্তি ও মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার কোনও পদক্ষেপই পুলিশ প্রশাসন নিতে পারেনি। বহু গ্রামে পরিস্থিতি এমনই যে মানুষ ভোট দিতে যাওয়া পরের কথা, গ্রামে নিজের বাড়িতেই শান্তিতে রাত কাটাতে পারছেন না। বহু গ্রামে পুনর্নির্বাচনের ডিউটিতে যেতে ভয় পাচ্ছেন সিভিক ভলান্টিয়ার এবং ভোটকর্মীরা। দিনহাটায় পুনর্নির্বাচনের ডিউটিতে যেতে অস্বীকার করে মঙ্গলবার থানার সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন সিভিক ভলান্টিয়ার এবং ভোটকর্মীরা। রক্তাক্ত ভোটগ্রহণের পরে রাজ্যের অবস্থা এমনই। কিন্তু সোমবারের হিংসাত্মক ভোটগ্রহণের মধ্যেই ছড়িয়ে গেছে প্রতিরোধের বার্তাও। পুলিশ প্রশাসনের ওপরে কোনও ভরসা না রেখে তৃণমূলের হামলাকারীদের দেখলেই পালটা মারের জন্য গ্রামবাসীরা সংগঠিত হতে শুরু করেছেন। 
হাওয়া বেগতিক বুঝে ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসও শুরু করেছে তৃণমূলের বাহিনী। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর দিনাজপুরসহ বহু অনেক জেলাতেই সি পি আই (এম) কর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলার ঘটনাতেই মঙ্গলবার সকালে প্রাণ হারিয়েছেন উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের কাছে গৌরীপদ সরকার নামের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। সোমবার নিজের বুথে তিনি প্রথম ভোট দেন প্রবল সাহসের সঙ্গে। তৃণমূলের কর্মীরা যখন সবাইকে ভোটদানে বিরত রাখতে ভয় দেখাচ্ছিল তখন তিনি জোর গলায় প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, নিজের ভোট নিজে দিন। তাঁর সাহসী ভূমিকায় তখনকার মতো ঘাবড়ে গিয়েছিল তৃণমূলের বাহিনী। কিন্তু তারপরেই তৃণমূল প্রার্থীর এজেন্ট বয়স্ক মানুষটিকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিল। সোমবারের হুমকির পরে মঙ্গলবার বোগ্রাম পাতিমিলের ধারে গৌরীপদ সরকারের মৃতদেহ পাওয়া যায়। সকালে তিনি প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু আঘাত করে অথবা শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে গ্রামবাসীদের অনুমান। তাঁর মৃতদেহ নিয়ে ১০নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান গ্রামবাসীরা। এদিনই উত্তর দিনাজপুরেই রায়গঞ্জের সোনাডাঙ্গি এলাকায় রেললাইনের ধারে রাজকুমার রায় নামে এক ভোটকর্মীর দেহ পাওয়া গেছে। তিনি করণদিঘি ব্লকের রহতপুর হাই মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষক। ইটাহারে সোনাপুর এফ পি স্কুলে তিনি ভোট নিতে গিয়েছিলেন। ভোট গ্রহণ শেষ হবার পরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। এদিন তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। 
এদিন তৃণমূলের এক ব্যক্তিও খুন হয়েছেন নদীয়ার ধানতলা থানার বরণবেড়িয়া গ্রামে। ঐ এলাকায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোটলুটের অভিযোগ গ্রামবাসীদের ছিলই। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল দশটা নাগাদ একদল দুষ্কৃতী প্রণব বিশ্বাস (৪৮)ওরফে বাবু নামের তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে লাঠিসোঠা, ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায়। বাড়ির বাকি লোকেরা পালিয়ে যেতে পারলেও ঐ তৃণমূল কর্মীকে পিটিয়ে কুপিয়ে খুন করেছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বি জে পি-র বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ায় মৃত্যু হয়েছে আরও এক তৃণমূল কর্মীর। ভোটের দিন সন্ধ্যায় এলাকায় ভোট লুটের অভিযোগে স্থানীয় মানুষজন এক তৃণমূল কর্মীকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল। আহত হয়েছিলেন সুশীল দাস নামের আরেক তৃণমূল কর্মী। মঙ্গলবার সকালে বারাসত হাসপাতালে তাঁরও মৃত্যু হয়েছে।  সোমবার রাতে পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুরে বোমা বাঁধতে গিয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। গ্রামবাসীর অভিযোগ, মৃতেরা দুজনেই তৃণমূল কর্মী। এদিন সকালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরেও এক তৃণমূল কর্মীর দেহ উদ্ধার হয়েছে। নিহত যুবকের নাম সাবির আলি শেখ। ভোটলুটের চেষ্টায় থাকা তৃণমূল কর্মীদের এখানেও গ্রামবাসীরা প্রতিরোধ করেছিলেন। তারপর থেকে সাবির আলির খোঁজ পাওয়া  যাচ্ছিল না। এদিন তাঁর দেহ পাওয়া গেছে। উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ ব্লকের ভগীলতা বিন্দোল রাস্তার ধারে এদিন দুজন পুরুষের অজ্ঞাত পরিচয় মৃতদেহ পাওয়া গেছে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে এখানেও তৃণমূলের ভোট লুটেরাদের মধ্যে বিরোধ হয়েছিল। কিন্তু তার জেরেই এই মৃত্যু কিনা তা জানা যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে এই দুজনের মৃত্যু পথ দুর্ঘটনায় বলেও জানানো হয়েছে।
কোচবিহার-১ ব্লকের সুটকাবাড়িতে তৃণমূল এবং বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের মারামারির মধ্যে পড়ে সোমবার ভোটগ্রহণের দিন জখম হয়েছিলেন জেন্নাদুল হক নামের এক ব্যক্তি। মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে শিলিগুড়ির একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে। তাঁর মৃত্যু ঘিরে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠী পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ চাপিয়েছে। 
সবমিলিয়ে সোম ও মঙ্গলবারে ২৯জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশন মাত্র ৬জনের মৃত্যুর কথাই বলে চলেছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১২জনই তৃণমূলের কর্মী হওয়া সত্ত্বেও সরকার, শাসকদল এবং নির্বাচন কমিশন এখন সেটুকুও স্বীকার করতে পারছে না। 
এদিকে বামপন্থী কর্মীদের ওপরে তৃণমূলের নির্বাচনোত্তর সন্ত্রাসও তীব্র হয়ে উঠেছে। তমলুকের ডিমারিবাজারের মহিষদা গ্রামে হাইস্কুলের শিক্ষক এবং সি পি আই (এম) নেতা চিত্ত খানের বাড়িতে তৃণমূলের দুষ্কৃতীবাহিনী হামলা করেছে এবং ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। বাঁকুড়া জেলায় সারেঙ্গার সি পি আই (এম) নেতা চিত্ত হাজরার বাড়িতেও মঙ্গলবার সকাল থেকে বোমা ফাটিয়ে ব্যাপক হামলা চালায় তৃণমূলবাহিনী। বারে বারে সারেঙ্গা থানায় জানানোর পর বিকালে সারেঙ্গার পুলিশ তাঁকে বাড়ি থেকে উদ্ধার করে। গোয়ালবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতে সি পি আই (এম) যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে তারজন্য এর আগেও তাঁর পরিবারের ওপরে হামলা হয়েছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষের প্রতিরোধে সোমবার মানুষ ভোট দিতে পেরেছেন। তারপরেই ফের এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার এক নম্বর ব্লকের সুন্দরপুরের আরিফপুরে ভোটের দিন তৃণমূলের ভোট লুটেরাদের সঙ্গে বিরোধ ঘটেছিল গ্রামবাসীদের। মঙ্গলবার পুলিশকে নিয়ে তৃণমূলীরা হামলা চালিয়েছে গ্রামের বামফ্রন্ট কর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে। পুলিশ দিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে পঞ্চায়েত সমিতির বামফ্রন্ট প্রার্থীকেও। বীরভূমের ময়ূরেশ্বর ২নম্বর ব্লকের আকোলপুরে তৃণমূল এবং পুলিশের যৌথ অভিযানে হামলা হয়েছে। সোমবার ভোটের দিন গ্রামবাসীরা তৃণমূলের বাইকবাহিনীকে রুখে ভোট দিয়েছিলেন। প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেন এলাকার সি পি আই (এম) নেতা সুশান্ত দাস। এরপর গভীর রাত্রে আচমকা ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যায় সুশান্ত দাসের ঘরে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পুলিসবাহিনীর সঙ্গে ছিল একদল মুখ ঢাকা লোক। এমনটা ঘটতে পারে আগাম আঁচ করেই বাড়ি থেকে আগেই সরে গিয়েছিলেন সুশান্ত দাস। পুলিস দলবল নিয়ে বাড়িতে সুশান্ত দাসকে খুঁজে না তাঁর দুই ভাইকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পুরুলিয়ার মফস্বল থানার চেপরি গ্রামে সি পি আই (এম)-র শাখা সম্পাদক শেখ মহম্মদ হুসেনের বাড়িতেও হামলা করে তাঁকে রক্তাক্ত করেছে তৃণমূলের সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা। 
পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের ৬নম্বর চাউলবুড়ি অঞ্চলের ধামসাই এলাকায় তৃণমূলের সশস্ত্রবাহিনীর আক্রমণে দেড়শোর বেশি সি পি আই (এম) কর্মী সমর্থক ঘরছাড়া হয়ে গিয়েছেন। ভোর থেকে তাঁদের ওপরে হামলা শুরু হয়। পুলিশকে খবর দিলেও পুলিশ আসেনি। চার পাঁচ ঘণ্টা ধরে মুখে কাপড় বেঁধে তৃণমূলীবাহিনী হামলা চালিয়ে ৪২টি বাড়ি ভাঙচুর করেছে, ৬টি দোকানপাট ভাঙচুর করেছে এবং লুটপাট করেছে। ১২টি ঘরের টিনের ছাউনি খুলে নিয়ে গেছে। বাড়ির রান্নার সরঞ্জাম, আসবাব ইত্যাদি লুট করেছে। ঘরছাড়া মানুষের বেশিরভাগই গরিব হলেও পুলিশ এখনো পর্যন্ত তাঁদের ঘরে ফেরানোর কোনও ব্যবস্থাই করেনি।

Featured Posts

Advertisement