তুতিকোরিনে পুলিশের
গুলিতে মৃত ১৬ 

স্টারলাইট কারখানার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নির্মম আক্রমণ 

তুতিকোরিনে পুলিশের<br>গুলিতে মৃত ১৬ 
+

এস পি রাজেন্দ্রন: চেন্নাই , ২২শে মে- বহুজাতিক স্টারলাইটের তামার কারখানা সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদী বিক্ষোভে পুলিশের নির্বিচার গুলিচালনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তামিলনাডুর তুতিকোরিনে বেদান্ত গোষ্ঠীর তামা গলানোর এই কারখানার বিরুদ্ধে দূষণ ছড়ানোর অভিযোগে টানা বিক্ষোভ চলছিল। মঙ্গলবার বিক্ষোভের একশো দিনের মাথায় প্রায় ২০হাজার মানুষ মিছিল করে জেলাশাসকের অফিস অভিমুখে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, পরে গুলিতে গোটা এলাকা রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। 
মঙ্গলবারের বিক্ষোভ ঘোষিতই ছিল। জেলা প্রশাসন ১৪৪ধারা জারি করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা ভেঙেই হাজার হাজার মানুষ নানা দিক থেকে জেলাশাসকের অফিস অভিমুখে যেতে থাকেন। তুতিকোরিন- তিরুনেলভেলি জাতীয় সড়কের ভি ভি ডি মোড়ে পুলিশ ব্যারিকেড করে জনতাকে আটকে দেয়। কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ-জনতা সংঘাত বেধে যায়। পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে লাঠি চালায়, পুলিশকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরাও ইট ছুঁড়তে থাকেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। একসময় বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে জেলাশাসকের অফিসের প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে। দপ্তরের বাইরে থাকা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, ইট ছুঁড়ে কাচের দরজা-জানালা ভেঙে দেওয়া হয়। পুলিশের দাবি, এরপরই তারা গুলি চালায়। নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে। অসংখ্য বিক্ষোভকারী গুলিতে হতাহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৬। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক ছাত্রীও। পুলিশ তাড়া করেও বিক্ষোভকারীদের মেরেছে। অন্তত ৬৫ জন জখম হয়েছেন। 
তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী ই কে পালানিস্বামী দাবি করেছেন, গুলি চালানো ‘অনিবার্য’ ছিল। বিক্ষোভকারীরা হিংসাশ্রয়ী হয়ে ওঠায় পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে। যদিও ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হতাহতদের ক্ষতিপূরণ ও মৃতদের পরিবারের একজনকে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেবার কথাও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। 
বেদান্ত গোষ্ঠী দেশে তামার খনি থেকে উত্তোলন, তামা গলিয়ে পণ্য উৎপাদন করে। ২০০১সালে এরাই রাষ্ট্রায়ত্ত বালকোর সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার কিনেছিল। দেশের অন্যতম বড় বন্দর তুতিকোরিনের সমুদ্র তীরেই স্টারলাইটের এই তামার কারখানা। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, বেদান্ত গোষ্ঠীর স্টারলাইট তামার কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। সমগ্র এলাকার জল, বাতাস দূষিত হচ্ছে। পরিবেশ কর্মীদের অভিযোগ, এই এলাকায় গলা ও চোখের ক্যানসার বেড়ে গেছে। চামড়ার রোগ হচ্ছে। পানীয় জল দূষিত হচ্ছে। স্টারলাইট কর্তৃপক্ষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেবার বদলে বারংবারই পরিবেশ নিরাপত্তার মাপকাঠি লঙ্ঘন করছে। তামা গলানোর সময়ে যে দূষণ হয় তাতে এই ধরনের কারখানা জনবসতি থেকে দূরে হওয়াই  উচিত। এই কারখানায় চিমনির উচ্চতাও কম। চারপাশের গ্রামগুলিতে জলস্তর নেমে যাচ্ছে, চাষবাসের কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ নিয়ে বারংবার বলা হয়েছে কিন্তু কর্তৃপক্ষ কান দেয়নি। প্রশাসন বেদান্তকেই সাহায্য করছে বলে অভিযোগ। 
এই কারখানা ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৩সালে এই কারখানা থেকে গ্যাস নির্গমন হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট জরিমানাও করেছিল। শীর্ষ আদালত তখনই বলেছিল প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় এই কারখানা চালানো হয়েছে। 
তামিলনাডু সরকারের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের ওই নির্দেশের পরেই জয়ললিতার সরকার কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেয়। বেদান্ত ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালে রাজ্য সরকারের নির্দেশের বিরুদ্ধে আবেদন জানায় এবং রাজ্যের আদেশ খারিজ হয়ে যায়। রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে যায়। সেই মামলা এখনও চলছে। এর মধ্যেই এ বছর মার্চে কারখানার লাইসেন্স পুনর্নবীকরণের আবেদন জানালে তামিলনাডু দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ তা খারিজ করে দেয়। কারখানা কর্তৃপক্ষ ফের অ্যাপেলাইট অথরিটির কাছে আবেদন জানায়। সেই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ৬ই জুন। ‘মেরামতির জন্য’ ২৯শে মার্চ থেকে ১৫দিনের জন্য কারখানা বন্ধ ছিল। কিন্তু কারখানার পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। তাতে একদিকে দাবি করা হয় পরিবেশ রক্ষার শর্ত মেনেই কারখানা চলছে। অন্যদিকে, কারখানা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই বিজ্ঞাপনও স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের পারদ আরও চড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। মার্চ থেকে বিক্ষোভের মাত্রাও বাড়তে থাকে। ২৪শে মার্চ বড় আকারে জমায়েত করে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন মানুষ। তুতিকোরিন জেলার নানা প্রান্তে, কারখানার আশপাশের এলাকায় ছোট ছোট বিক্ষোভ চলতেই থাকে। সি পি আই (এম), ডি এম কে, এম ডি এম কে-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও প্রতিবাদকে সমর্থন জানিয়েছে। এদিনের বিক্ষোভে ১৫টি গ্রামের মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। পুলিশও মজুত ছিল বিশাল সংখ্যায়। অনুমান করা হচ্ছে এমন বিক্ষোভ এবং তা মোকাবিলা করতে বড় আকারে শক্তি প্রয়োগের জন্য তৈরি ছিল পুলিশ। মুখে যাই বলা হোক না কেন, বেদান্তর মতো বহুজাতিক সংস্থা রাজ্য প্রশাসনকে ব্যবহার করেই নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে কারখানা চালাচ্ছে।  
এদিনের বিক্ষোভে গুলি চালানোর তীব্র প্রতিবাদ উঠেছে। সি পি আই (এম)-র তামিলনাডু রাজ্য সম্পাদক কে বালকৃষ্ণান ঘটনাস্থলে যান। তিনি বলেন, বি জে পি-সমর্থিত তামিলনাডুর এ ডি এম কে সরকার বেদান্তের হয়ে সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করেছে। এমনকি হাসপাতালে ঢুকে পুলিশ মানুষকে মেরেছে। এই গুলিচালনার নিন্দা ও তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি করে পার্টির পক্ষ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যব্যাপী প্রতিবাদের ডাক দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে সেই বিক্ষোভ থেকে কয়েক শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডি এম কে নেতা এম কে স্ট্যালিন এই গুলিচালনাকে ‘অমানবিক’ বলে অভিহিত করেছেন। কর্ণাটকে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যাবার কথা ছিল স্ট্যালিনের। তিনি তা বাতিল করে তুতিকোরিনে চলে গেছেন। এম ডি এম কে নেতা ভাইকো জালিয়ানওয়ালাবাগের সঙ্গে তুলনা করেছেন এই ঘটনাকে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেছেন, রাষ্ট্রের মদতে সন্ত্রাসবাদ। কমল হাসানের দল মাক্কাল নিধি মাইয়াম বলেছে, স্টারলাইটের জন্য মৃত্যু হচ্ছিল, এখন গুলিতে প্রাণ গেল। দায়ী সরকারই। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement