শোষণের নানা মাত্রার
কথা শোনালেন
তরুণ শ্রমজীবীরা

শোষণের নানা মাত্রার<br>কথা শোনালেন<br>তরুণ শ্রমজীবীরা
+

কলকাতা, ১২ই জুন— এক অনিশ্চিত শ্রম-সম্পর্কে জড়িয়ে রয়েছি আমরা। যেখানে না রয়েছে রুজির নিরাপত্তা, না মজুরির নিশ্চয়তা। না থাকছে আইনি সুরক্ষা, না জুটছে সংগঠিত হওয়ার প্রাপ্য অধিকার। ওঁরাই জানালেন উদারনীতির এমন দিনে আমরা কেউই ভালো নেই। 
কাজ করার ফাঁকেই মোবাইলে চার্জ চলে গেলে, লোকেশন অফ হয়ে গেলে এক সীমাহীন মানসিক চাপ তৈরি হয় —চাকরি থাকবে তো? বলছিলেন এই কলকাতাতেই সেলস-এর চাকরিতে যুক্ত থাকা তরুণ কর্মী সৌরভ গাঙ্গুলি। যখন-তখন বদলি, চাকরির নির্ধারিত সিডিউল নেই, মাইনে কবে জানা নেই, সামাজিক সুরক্ষা তো দূরস্ত, ছুটির কোনও বালাই নেই। প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়ে ন্যূনতম উপার্জন করা তরুণ শ্রমজীবীরা মঙ্গলবার সি আই টি ইউ কলকাতা জেলার উদ্যোগে কৃষ্ণপদ ঘোষ মেমোরিয়াল হলে আয়োজিত কনভেনশনে জানালেন মহানগরের নানা উঠোনের শ্রম শোষণ, যন্ত্রণার কথা।
পাঁচ থেকে ছ’হাজার টাকা এমনকি ৫হাজার টাকারও কম বেতনে এই কলকাতায় বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষাদান করে চলেছেন। স্কুল ৬ঘণ্টার হলে কি হবে ওঁদের কাজ ৮ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় ধরে কাজ করে যেতে হচ্ছে। একইসঙ্গে শিক্ষকের কাজ এবং শিক্ষাকর্মীর কাজও করে যেতে হচ্ছে ওঁদের। কনভেনশনে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তরুণ শিক্ষক বিহঙ্গ প্রশ্ন তুললেন আমাদেরও একটা ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ জরুরি। কিন্তু কোথায় জানাবো আমাদের অভাব, অভিযোগের কথা? খুবই গরিব ঘর থেকে লড়াই চালিয়ে উঠে আসা ডেলিভারি বয় সুমন মাঝি-র কথায় আমাদের কাজের সময় অনেকটাই বেশি, কিন্তু ঘামের মূল্য বড়ই কম।
এই শহরের বুকেই ঘরে ঘরে ফিজিওথেরাপির কাজ করে যাওয়া অভীক জানালেন, কলকাতার বুকে অটো, টোটো-র স্ট্যান্ড রয়েছে কিন্তু আমাদের কোন স্ট্যান্ড নেই। অথচ মহানগরের বুকে আমার মতোই ফিজিওথেরাপির কাজ করে যাওয়া হাজার হাজার ছেলেমেয়ে রয়েছে যাঁরা একে অপরকে চিনি না। বললেন, আমরা প্রত্যেকেই প্রচ্ছন্ন বেকার। কেন না চিকিৎসকেরা কাজ দিলে আমরা সকার, অন্যথায় আমরা বেকার। সকাল থেকে রাত কাজ করে গেলেও আমাদের পি এফ, ই এস আই, গ্র্যাচুইটি, বোনাস, পেনশন কোনওকিছুরই বালাই নেই। দমকল বিভাগে কর্মরত ঠিকাকর্মী জানালেন আগুন নেভাতে গিয়ে আহত হলেও আমাদের চিকিৎসার খরচটুকু দেওয়া হয় না। অথচ স্থায়ীকর্মীদের মাসে ২২দিন, ২৪দিন কাজ হলেও আমাদের কাজ মাসের মধ্যে ৩০দিন। আর্কিটেক্ট সপ্তক এদিন বললেন, আমাদের শ্রমিক সারণিতে ফেলা হয় না, অথচ শ্রমের শোষণ চরম মাত্রায় হয়ে থাকে। আমাদের বোঝানো হয় কোম্পানিটা নাকি আমাদের নিজেদের। অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো কোম্পানির মুনাফা বেড়ে চলে, আমাদের বেতনের হার নিচের দিকে নেমে চলে।
রুজির বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এদিন কনভেনশনে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্ষেত্রে কাজ করে যাওয়া তরুণী শবনম জানালেন, মাইক্রো বায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করেও এরাজ্যে সেই বিষয়ে কোনও চাকরি পাইনি। বাধ্য হয়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজে আমার মতোই অনেক মেয়েদের অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে যেতে হচ্ছে। আমাদের নেই কোনও সামাজিক সুরক্ষা। বললেন, প্রতিদিন বাড়ছে বেকারি, দারিদ্র। এবার আমাদের উঠেপড়ে লাগতে হবে যাতে এই ব্যবস্থাটার বদল ঘটানো যায়। কনভেনশনে দাঁড়িয়ে আক্রান্ত তরুণ শ্রমজীবীরাই এদিন বললেন, উদার নীতিতে আমরা কেউই ভালো নেই। নিজেদের রুজির জ্বলন্ত সমস্যার চিত্র তুলে ধরতেই এদিন মার্কেটিংয়ের তরুণ কর্মী দেবদত্ত বললেন, দোকানদার ১৫দিনের মধ্যে টাকা শোধ না করলে সেলস কর্মীর বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়া চলে। ইউনিয়ন করার অপরাধেই সেলস কর্মী সত্যজিৎ দত্তকে ৩মাস কাজ থেকে ছাঁটাই করে দেওয়া হয়েছে। 
শুধু এই মহানগরীর বুকে নয়, গোটা দেশে যে হারে বেকারি ছাপিয়ে বেড়ে চলেছে সেই চিত্রও এদিন উঠে এসেছে কনভেনশনে পেশ করা প্রতিবেদনে। ২০০৭সালে যে বেকারির হার ছিল ৮শতাংশ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গেই তা আরও বেড়ে ২০১৬সালে দাঁড়িয়েছে ১০.২শতাংশ। কেন কলকাতা মহানগরের বুকে প্রতিদিন ঘাম ঝরানো নানা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই তরুণ শ্রমিক কর্মাচারীদের কাছে একজোট হওয়ার আহ্বান নিয়ে এই কনভেনশন? আক্রান্ত রুজি, পেশার ক্ষেত্রগুলিকে চিহ্নিত করা, কোন ধরনের অমানবিক শোষণ চলে তা তুলে ধরা, একজোট হয়ে ইউনিয়ন গড়ে দাবি আদায়ের পথে আরও অনেক তরুণ কর্মীর সঙ্গে নিজেকে শামিল করা। এসব লক্ষ্যের পাশাপাশি আক্রান্ত শ্রমজীবীদের যেমন নিজের অধিকারের হাতিয়ারগুলিকে চিনিয়ে দেওয়া, আইনি অধিকার তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া এবং সর্বোপরি ট্রেড ইউনিয়নে যুক্ত থাকা শ্রমিক কর্মচারীদের প্রজন্মভিত্তিক ব্যবধান দূর করার লক্ষ্য নিয়েও এই কনভেনশন। কর্মরতদের সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন, শ্রমিক মালিক সমস্যা সম্পর্কিত প্রশ্নে অর্জিত আইন এবং শ্রম আইনগুলি রুজির জমিতে দাঁড়িয়ে লড়াই চালানো কর্মচারীদের চিনিয়ে দেওয়াও একটা লক্ষ্য এই কনভেনশনের।
মহানগরের বুকে তরুণ শ্রমজীবীদের জীবন-যন্ত্রণার নানা দিক তুলে ধরেছেন এদিন সি আই টি ইউ কলকাতা জেলার সাধারণ সম্পাদক দেবাঞ্জন চক্রবর্তী। বললেন, নামে শুনতে ভালোই লাগে আই টি সেক্টরে কাজ করছে, কিন্তু কী জীবন নির্ধারিত হয়েছে তাঁদের জন্য? এই মুহূর্তে খোদ কলকাতায় মানসিক চিকিৎসকদের চেম্বারে ভিড় বাড়ছে এই তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের তরুণ কর্মীদের। অনিদ্রা, সারা রাত জেগে কাজের অমানবিক চাপ, রুজির অস্থিরতা —এসব কিছুই ক্রমশ মানসিক রোগগ্রস্ত করে তুলছে আই টি সেক্টরে কর্মরত শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের। রাত সাড়ে ১২টাতেও কাজের ডিউটি শেষ হচ্ছে না একজন ডেলিভারি বয়ের। তারপর সেই কর্মী বাড়ি ফিরে রাত দেড়টা, দুটোয় খেতে পাবেন কিনা জানা নেই, কিন্তু অন্যের খাবার জোগান দিয়ে যেতে হচ্ছে নিরন্তর।
নানা পরিষেবা ক্ষেত্রেই আক্রান্ত শ্রমজীবীদের পাশে দাঁড়ানোর একটা লক্ষ্য নিয়ে সি আই টি ইউ যৌথ ভাবনার এই কনভেনশন সংগঠিত করছে। তিনি বললেন, আমরা পাশে থাকবো প্রতিটি আক্রান্ত কর্মজীবীদের। তিনিই এদিন জানালেন আপাতত ন্যূনতম মজুরি, রুজির নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা —এই মৌলিক তিনটি প্রশ্নে প্রতিটি আক্রান্ত পেশার শ্রমজীবীদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই সংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাব আমরা। হোয়াটসঅ্যাপ, ই-মেইল, ফেসবুকে যোগাযোগের একটা সচল মাধ্যম গড়ে তোলা হবে। মঙ্গলবার এই কনভেনশনে উপস্থিত ছিলেন সি আই টি ইউ সর্বভারতীয় নেতা শ্যামল চক্রবর্তী, সি আই টি ইউ রাজ্য সভাপতি সুভাষ মুখার্জি, শ্রমিক সংগঠক রাজদেও গোয়ালা, নিরঞ্জন চ্যাটার্জি প্রমুখ। কনভেনশনে সভাপতিত্ব করেছেন দেবাশিস রায়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement