সংঘাত বন্ধে চুক্তি
ট্রাম্প-কিমের

সংঘাত বন্ধে চুক্তি<br>ট্রাম্প-কিমের
+

সিঙ্গাপুর, ১২ই জুন— সব জল্পনা, প্রতীক্ষার অবসান। অবশেষে ‘শতাব্দীর বৈঠকে’ দুই কোরিয়ার জনগণের জয়। 
পরমাণু বিতর্ককে পিছনে ফেলে মুখোমুখি মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প আর গণতান্ত্রিক কোরিয়ার শীর্ষনেতা কিম জঙ উন। দুদেশের মধ্যে দীর্ঘ সাত দশকের বৈরিতা শেষে সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত করে দিয়ে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ। 
দিনভর বৈঠকের শেষে ‘কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক মহড়া বন্ধের’ কথা ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। আশা প্রকাশ করেছেন কিমও ‘খুবই দ্রুততার’ সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবেন দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার। ‘কোরীয় উপদ্বীপে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তি’ এবং ‘সার্বিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে’ দুই দেশ যৌথ প্রয়াস চালাবে বলে একটি দলিলে সই করেছেন দুই নেতা। 
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধের সঙ্গেই ‘একসময়ে এসে সেনা প্রত্যাহারের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি। গত শতকের পাঁচের দশকে কোরীয় যুদ্ধের অবসান হলেও, এখনও দক্ষিণ কোরিয়াতে রয়েছে মার্কিন সেনাঘাঁটি, ২৮,০০০ মার্কিন সেনা। আজকের এই চুক্তি ওয়াশিংটন কতটা অনুসরণ করবে, তা বলবে সময়। এবং এখনই সেনা প্রত্যাহার নয়। ‘আমি চাই আমাদের সেনাদের বের করে আনতে। আমি চাই আমাদের সেনাদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে।’ বলেছেন ট্রাম্প। ‘তবে এখনই তা সমীকরণের অংশ নয়। আশাকরি, একসময় গিয়ে সেটা হবে।’ 
‘তবে, আমরা বন্ধ করব সামরিক মহড়া। যদি না আমরা দেখি ভবিষ্যতের বোঝাপড়া বিপথে এগচ্ছে।’ মার্কিন রাষ্ট্রপতি স্বীকার করে নিয়েছেন, সামরিক মহড়া ‘খুবই ব্যয়বহুল’ এবং ‘খুবই প্ররোচনাকর’। গণতান্ত্রিক কোরিয়া বরাবরই এই মহড়াকে উত্তরমুখী আগ্রাসনের মহড়া বলে নিন্দা জানিয়ে আসছে। ট্রাম্প বলেছেন, ‘এই সামরিক মহড়া (ওয়ার গেম) খুবই ব্যয়বহুল। আর এর জন্য বেশিরভাগ অর্থ আমরাই দিতাম। আজকের পরিস্থিতিতে, যেহেতু আমরা আলোচনা করছি, আমার মনে হয়, এই সামরিক মহড়া চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।’ 
যৌথ বিবৃতিতে, গণতান্ত্রিক কোরিয়াকে ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার অঙ্গীকার’ করেছেন ট্রাম্প। পরিবর্তে, ‘কোরীয় উপদ্বীপে সার্বিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রতি তাঁর প্রত্যয় আর অবিচল অঙ্গীকারের কথা পুনরুচ্চারিত’ করেছেন কিম। 
গণতান্ত্রিক কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পদক্ষেপ খতিয়ে দেখার জন্য সেখানে থাকবেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। দুই নেতার সই করা চুক্তিতে অনেক ফাঁক থাকলেও ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি তাকিয়ে আছেন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দিকে। যদিও জানিয়েছেন, গণতান্ত্রিক কোরিয়ার উপর এখনও থেকে যাচ্ছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। 
যথোচিত সময়ে হোয়াইট হাউসে কিমকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি, যোগ্য সময়ে তিনিও পিয়ঙইয়ঙ সফরে রাজি হয়েছেন। 
ঐতিহাসিক বৈঠকের আগে বারো সেকেন্ডের করমর্দন। দুই নেতার শরীরি ভাষাতেই ছিল সৌজন্যের আবহ তৈরির চেষ্টা। পরে ৪০-মিনিট একান্তে বৈঠক। দুজনের সঙ্গে ছিলেন শুধু তাঁদের দোভাষী। রূদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে দুজনে পাশাপাশি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ‘খুব, খুবই ভালো’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তারপর তাঁরা ঢোকেন আরেকটি বৈঠকে, যেখানে অপেক্ষা করছিলেন দুই দেশের পদস্থ আধিকারিকরা। ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন চিফ অব স্টাফ জন কেলি, বিদেশসচিব মাইক পম্পেও আর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন। কিমের সঙ্গে বিদেশমন্ত্রী রি ইয়ঙ হো, কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির দুই ভাইস চেয়ারম্যান কিম ইয়ঙ চোল এবং রি সু ইয়ঙ। সেখানেই কিম বলেন, ‘আমার মনে হয় গোটা বিশ্ব এই মুহূর্তটা দেখছে। অনেকেই একে রূপকথা, বা সায়েন্স ফিকশন মুভির একটি দৃশ্য বলে মনে করছেন।’ পরে ট্রাম্প বলেন, এই বৈঠক ‘বিশ্ব ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।’ 
চুক্তি সই করে ট্রাম্প বলেছেন, ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সুশ্রী পূর্ণাঙ্গ দলিল।’ আর কিম বলেছেন, ‘একটি ঐতিহাসিক দলিল,’ যোগ করেছেন, দুই পক্ষই ‘পিছনে ফেলে এসেছে অতীতকে’ এবং বিশ্ব ‘দেখবে একটি বড় পরিবর্তন।’ কোরীয় উপদ্বীপে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এই প্রক্রিয়া খুব, খুবই দ্রুততার সঙ্গে করছি, সত্যি, সত্যিই করছি।’ যোগ করেছেন, গণতান্ত্রিক কোরিয়া এবং কোরীয় উপদ্বীপের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ‘অতীতের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা।’ 
যৌথ বিবৃতিতে সাহসী পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি আছে। নেই নির্দিষ্ট করে বিশদে পদক্ষেপের কথা। অন্তত তেমনই মনে করে নিউ ইয়র্ক টাইমস। পরবর্তী সম্ভাব্য পদক্ষেপ, অথবা কোনও ‘টাইমটেবিল’ এতে নেই। 
‘ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করে এই বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছে চীন। বেজিঙ বলেছে, আন্তর্জাতিক মহলের এখন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। চীনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াঙ ই বলেছেন, ‘দুই নেতা একসঙ্গে বসে আলোচনা করলেন, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক, যা তৈরি করেছে এক নতুন ইতিহাস।’ দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি মুন জায়ে ইন বলেছেন, ‘শান্তি ও সহযোগিতার নতুন অধ্যায়।’ যোগ করেছেন, ‘সামনে অনেক প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে, তবে আমরা কখনোই আর অতীতে ফিরব না।’ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য আমি মুখিয়ে আছি এবং সবকিছু আমরা সমাধান করব দ্বিপাক্ষিক স্তরে।’ 
ঐতিহাসিক এই বৈঠকে ট্রাম্প ও মুনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি মুন জায়ে ইন বলেছেন, এই বৈঠক ‘শতাব্দীর বৈঠক’। মঙ্গলবার পর্যন্ত যিনি চোখের পাতা এক করতে পারেননি, সেই মুন সোমবার ট্রাম্পকে ফোনে বলেছেন, ‘এই বৈঠক শুধু কোরীয় উপদ্বীপ নয়, গোটা বিশ্বের শান্তির জন্য মজবুত বুনিয়াদ তৈরি করবে।’ আরও বলেছেন, ‘যুদ্ধ ও সংঘাতের অন্ধকার দিনগুলিকে পিছনে ফেলে আমরা লিখব শান্তি ও সহযোগিতার নতুন অধ্যায়।’ 
সি পি আই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, এই বৈঠক দুই কোরিয়ার জনগণের জয়। তবে আমাদের দেখতে হবে, চুক্তিকে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, যার অর্থ দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সেনাঘাঁটি প্রত্যাহার করছে কি না। তবে, তারপরেও কোরিয়ার জনগণের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক দিন।

Featured Posts

Advertisement