নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে
আশা রাশিয়ার ফুটবলের 

নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে<br>আশা রাশিয়ার ফুটবলের 
+

প্রশান্ত দাস: মস্কো , ১৩ই জুন — গড়ের মাঠের প্রায় দ্বিগুণ। লুঝনিকি স্টেডিয়াম চত্বরটা বিশাল। একবার পথ ভুল করলে, উবের ট্যাক্সিতেও কয়েক কিলোমিটার চক্কর খেতে হয়। যেমনটা হলো বুধবার। অনেকেরই হচ্ছে এরকম। রাস্তা বন্ধ থাকলেই গোলকধাঁধায় পথ হারাচ্ছেন ট্যাক্সিচালকরা। 
রাশিয়া খেলতে নামবে। কিন্তু স্টেডিয়ামের চারিদিকে জীবন খুবই স্বাভাবিক। অফিস যাচ্ছেন কেউ, কেউ বা শিশু নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন। নিজেদের ম্যাচ নিয়ে উচ্ছ্বাস নেই। নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনিতে সমর্থকদের একটু হাঁসফাঁস অবস্থা হতে পারে। অথচ রেড স্কোয়্যার ভিড়ে ঠাসা। 
অবাক ব্রাজিলের সাংবাদিক আলমির লিয়ান্দ্রো সিলভিয়েরাও। চার বছর আগের আয়োজক ছিল ব্রাজিল। এস্তাদো দি সাও পাওলোর অভিজ্ঞ এই সাংবাদিক উন্মাদনার তুলনা টানতে গিয়ে তল খুঁজে পাচ্ছিলেন না। একটা প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে কেন এতটা নিঃস্পৃহ অবস্থা। রাশিয়ানদের উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশের স্ফুরণ কমই হয়। তাও এতটা সাবধানী কেন? এর উত্তর রাশিয়াই দিতে পারবে। দিলেনও তাই। ফিফার স্বেচ্ছাসেবক ইগর কুদ্রিয়াশভ। ফুটবল দলগুলির সঙ্গে থাকতে পারবেন এমন আশা নিয়েই স্বেচ্ছাসেবক হয়েছিলেন। তাই নিজ দেশের ফুটবল নিয়ে বেশ ওয়াকিবহাল। 
একেবারে আশাহত করলেন না অবশ্য। বরং বললেন ‘একটু ধৈর্য ধরুন। কাল ম্যাচে দেখবেন!’ ঘরের মাঠে খেললেও আকিনফিভ বা স্মলভদের রাশিয়া ফেভারিট নয়। নিজেদের দোষেই যে এই অবস্থা। কখনো ফুটবল সংস্থা তো কখনো নিয়মের গলায় দোষের মালা চড়ালেন। ২০১৫ সালে বিদেশির সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। রাশিয়ান প্রিমিয়ার লিগে ছয়জন বিদেশির বেশি খেলতে পারবে না। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে যেখানে ৬৬.৪ শতাংশ বিদেশি ফুটবলার খেলে, রাশিয়ান প্রিমিয়র লিগে সেই সংখ্যা ৪৩ শতাংশ। ফলে ম্যাচে রঙ এনে দেওয়ার মতো রসদ থাকছে না।
ইগর নিজে অবশ্য চাকরিসূত্রে ইংল্যান্ডে ছিলেন বহুদিন। তাই সহজেই বলে দিলে, রুশ ফুটবলাররা ঘরকুনো। আর্সেনালে আন্দ্রে আর্শাভিন জমিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে তাঁদের অন্য ফুটবলাররাও এখন আর বিদেশি লিগে ডাক পায় না। আর্শাভিন দিশারি হতে পারতেন। কিন্তু নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে ছোটোবেলার ক্লাব জেনিথ সেন্ট পিটার্সবার্গে ফিরে আসেন। ঘরোয়া ফুটবলেই এত বেশি অর্থ যে, রুশ ফুটবলাররা দেশ ছাড়তেই চান না। কোনও কোনও ফুটবলার তো মরশুমে চল্লিশ লক্ষ ডলারের চুক্তিতেও সই করেন। ফলে ইগর আকিনফিভ, অ্যালান জাগোয়েভ এবং আলেকজান্ডার কোকোরিনদের কাছে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, এভার্টন ও আর্সেনালের প্রস্তাব থাকলেও দেশের হাওয়া, মাটি ছেড়ে যেতে চাননা কেউ। 
ইউরোপীয় ক্লাবগুলির জন্য হাজার হাজার কোটি ডলার ঢালে স্পনসররা। রাশিয়ার রোমান আব্রামোভিচও কোটি কোটি পাউন্ড খরচ করেন চেলসির পিছনে। তবে রাশিয়ার ক্লাবগুলি অনুসরণ করে সোভিয়েত আমলের নিয়ম। রাশিয়ার প্রথম সারির দুটি লিগের ৩৬টি দলের মধ্যে ৩১টি দলই চালায় সরকার অথবা স্থানীয় কর্পোরেশন। তাই অর্থ ব্যয় হয় না বেশি। প্রচার কম। অথচ এক সময় এই ফুটবলই ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত সোভিয়েতের বিনোদন। প্রচার আর চাকচিক্য না থাকায় ম্যাচও হয় অনুত্তেজক। ম্যাচ পিছু গড় উপস্থিতি নেমে দাঁড়িয়েছে মোটে ১২ হাজার। 
এত কিছু মধ্যেও রাশিয়ার ফুটবলের ভালো দিক হলো ইউথ ডেভেলপমেন্ট সিস্টেম। তরুণ ফুটবলারদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বেড়ে ওঠার জন্য সবরকম উপকরণ রয়েছে। কিন্তু ফুটবলারদের নিয়ে কোনোরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে রাজি হন না কোচরা। এর কারণ অবশ্য মান্ধাতার আমলের ফুটবল রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি। নিয়ম হচ্ছে, ফুটবল ক্লাবগুলিকে মরশুম শুরুর আগেই নামের তালিকা জমা দিতে হবে। মরশুম একবার শুরু হলে আর ফুটবলার কেনাবেচা বা অদল বদল করা যায় না। ফলে কোচেদের সাবধানী হওয়া ছাড়াও উপায় থাকে না। জেনিথ সেন্ট পিটার্সবার্গ ও স্পার্টাক মস্কোর দ্বিতীয় দল ডিভিসন ওয়ান লিগ খেলে। এই ক্লাবের কোনও ফুটবলার যদি দ্বিতীয় ডিভিসন লিগে ভালো খেলেও, তাহলেও তাদের প্রিমিয়র লিগে নেওয়া যায় না। তার জন্য লিগ হওয়া শেষপর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। 
পরিস্থিতি যদিও বদলাচ্ছে দ্রুত। ক্লাবগুলি আকাদেমি ও ইউথ ডেভেলপমেন্টে বেশি নজর নিচ্ছে। স্টানিস্লাভ চেরচেসভের দলের অধিকাংশ তরুণ ফুটবলারই এই ইউথ সিস্টেমের ফল। জোবনিন এবং মিরানচুক চেচেরভের প্রথম একাদশে সুযোগ পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যা হলে রাশিয়ার ফুটবল দল প্রাণবন্ত হবে। তবে সমস্যা এখনও আছে। আর সেই সমস্যা ধরিয়ে দিয়েছেন সৌদি আরবের কোচ। উদ্বোধনী ম্যাচেই মুখোমুখি হবে দুই দেশ। এই রক্ষণ কিভাবে সুয়ারেজ, কাভানি বা সালাহকে সামলায় তা বড় পরীক্ষা। অন্ধকারেও আশার আলো দেখাচ্ছে বিশ্বকাপ। রাশিয়ার দর্শকরা ফুটবল বিমুখ নয়। রুশ কোচ চেরচেসভ ম্যাচের আগের দিন শুনিয়ে রাখলেন, ‘অর্ধেক রাশিয়া জানেই না যে বিশ্বকাপ হচ্ছে। একবার শুরু হোক তাহলে বুঝতে পারবেন কতটা বদল এসেছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement