পাইনের বনে
‘ভিন গ্রহের’ ফুটবলার

পাইনের বনে<br>‘ভিন গ্রহের’ ফুটবলার
+

প্রশান্ত দাস: ক্রাতোভো, ১৭ই জুন — টুঙ, সোনাদা হয়ে ঘুম যাওয়ার রাস্তার মতো। এঁকেবেঁকে চলা পথ। আকাশছোঁয়া পাইন গাছের ফোকর গলে আসা হলদে রোদ। নিরিবিলি চারদিক। 
ক্রাতোভো অনেকটা এরকমই। মাটির এত কাছে মেঘ আসে না। তবে পাইন বন, নিরিবিলি পথ সবটাই দার্জিলিঙ পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি। শান্ত, মন ভালো করা পরিবেশ। মস্কোর দক্ষিণ পশ্চিমে পঞ্চাশ কিমি দূরে রামেনস্কায়ার একটা ছোট্ট জনপদ। মূল সড়ক থেকে দুবার বাঁক নিলেই পর্তুগালের আস্তানা। রোনাল্ডোদের অস্থায়ী ঠিকানা।
রবিবার বেলা এগারোটায় অনুশীলন। সবাই মাঠে নামার পর এলেন সি আর সেভেন। উচ্ছল, তরমুজের ফালির মতো চওড়া হাসি নিয়ে। পর্তুগালের মসিহা। হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল পুরো দলই। রোনাল্ডোর পা থেকেই প্রথম ম্যাচে তিন গোল, স্পেনের গ্রাস থেকে পয়েন্ট ছিনিয়ে আনা। ক্রাতোভোর এই মাঠে সমর্থকদের প্রবেশের উপায় নেই। শহর থেকে দূরে হওয়ায় এফ সি স্যাটার্নের এই বেস ক্যাম্পে কেউ আসে না। মস্কোর বুকেই পর্তুগিজ সমর্থকরা হুল্লোড়ে মাতেন। পর্তুগাল দল হিসেবে কোনওদিনই দাগ কাটতে পারেনি। একজন ইউসেবিও, একজন লুই ফিগো এসেছেন। তাঁদের ঘিরে বেড়ে উঠেছে একটা দেশ। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা ইংল্যান্ড যেভাবে টানে সব্বাইকে, পর্তুগাল তা পারে না। ইউসেবিও, ফিগোদের মতোই এই সমর্থকদের টানছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। রোনাল্ডোর শক্তি কতটা তার প্রমাণ পেয়েছে স্পেন।
এক অর্থে স্পেন, জার্মানি বা ইংল্যান্ডের মতো ফুটবল কৌলীন্য নেই পর্তুগালের। তবুও পর্তুগালকে একবাক্যে সমীহ করতে হয়। এখন কারণ অবশ্যই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। পর্তুগালের প্রকৃত দল নেতা। প্রথম ম্যাচে কিভাবে উদাহরণ তৈরি করতে হয় তা দেখিয়েছেন। একটা একটা দেশকে মানসিকভাবে তাতিয়ে দিয়েছেন। হার মানার তো কোনো প্রশ্নই নেই। গোল করে এগিয়ে দেওয়ার পরও এগিয়ে গিয়েছিল স্পেন। সেখানেও হাল ছাড়েননি। বরং লড়াই চালিয়েই গেছেন। পয়েন্ট কেড়ে এনেছেন। 
বাকিদের মধ্যে থেকেও রোনাল্ডো আলাদা। সাংবাদিক বৈঠকে না থেকেও তিনিই থাকেন প্রতিটি প্রশ্নের অন্তরালে। উত্তরের প্রতিটি বাক্যেও রোনাল্ডোরই উপস্থিতি। রবিবার সাংবাদিক সম্মেলনে আদ্রিয়েন সিলভার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয়, রোনাল্ডো ছাড়া এই দলের জোর কী? ‘আপনারা কিন্তু পর্তুগালকে সন্দেহের চোখে দেখছেন’ বলেও আদ্রিয়েন জুড়ে দেন, ‘নিশ্চয় রোনাল্ডোকে ছাড়া আমাদের কাজ অনেক কঠিন হবে।’ 
ফুটবল একজনের খেলা নয়। এগারো জন সমানভাবে না খেললে ম্যাচ জেতা যায় না। তাও একজন দুজন তাঁদের অসামান্য খেলা দিয়ে পার্থক্য গড়ে দেন। রোনাল্ডোর তাঁদেরই দলে পড়েন। ব্রাজিলীয় তারকা নেইমার তো একদিন আগেই বলেছিলেন, ‘রোনাল্ডো অন্য গ্রহের।’ ভিন গ্রহের হলেও অনুশীলনে হাসি মশকরায় ভরিয়ে রাখলেন। বল পাওয়ার জন্য ‘চোর’ সাজতে হলো। যতক্ষণ সুযোগ পাওয়া গিয়েছে সব ক্যামেরাই যেন তাঁর দিকে তাক করা। ক্যামেরার শাটার পড়ার ঝনঝনানি শোনা গেছে শুধু। ক্রিশ্চিয়ানো ঔদ্ধত্যের জন্য সমালোচিত হয়েছেন বহুবার। তাঁর সতীর্থদের অবশ্য অন্য কথা। পর্তুগালের মিডফিল্ডার বললেন, ‘রোনাল্ডো নিজের ঢাক নিজে পেটায় না। তাই ওই তিন গোলের জন্য সামান্য শুভেচ্ছা ছাড়া আর কিছুই করিনি আমরা।’ 
অ্যাড্রিয়েন সিলভা বললেন, ‘রোনাল্ডোর সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করে নিতে পেরে আমরা খুশি। ক্যাপ্টেন হিসেবে আমাদের সারাক্ষণ চাঙা রাখে। সারাক্ষণ আরও ভালো করার কথা বলে ক্রিশ্চিয়ানো। এটাই একমাত্র দাবি।’ 
নিজের অধিনায়ককেই আবার সেরা মানছেন লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার। মেসির সঙ্গে তুলনায় যেতে রাজি নন। ঝড়ের বেগে বলে চললেন, ‘মেসির সঙ্গে রোনাল্ডোর তুলনা করবেন না। আমাদের একজন ক্যাপ্টেন আছে সে যা করবে ঠিক করে তা করেই ছাড়ে। আমাদের যতক্ষণ পারে সাহায্য করে যায়।’ বলেই সোজা মাঠে দৌড়ে যান। অনুশীলন শুরু হয়েছে তারপরই। রোনাল্ডোর সঙ্গ পেতেই যেন ছুটলেন। 
স্থানীয়দের কাছে এই মাঠ অ্যালিয়েন বা ‘ভিন গ্রহের’ বলেই পরিচিত। শান্ত সেই মাঠেই খেলে চলেছেন আরেক ‘ভিন গ্রহের’ তারকা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement