জমি-জটে বেলাইন হবে
মোদীর বুলেট ট্রেন?

বেঁকে বসছে বহু গ্রাম

জমি-জটে বেলাইন হবে<br>মোদীর বুলেট ট্রেন?
+

নয়াদিল্লি, মুম্বাই ও আমেদাবাদ, ১৭ই জুন — গ্রামবাসীদের বাধার মুখে কার্যত বেলাইন হওয়ার আশঙ্কা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘স্বপ্নের’ বুলেট ট্রেন প্রকল্পের! তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ফুরোনোর আগে মুম্বাই-আমেদাবাদ তীব্র গতির এই রেলের লাইন বসানোর কাজ আদৌ শুরু করা যাবে কিনা, ঘোর সন্দেহ তৈরি হয়েছে তা নিয়েই! মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং কেন্দ্রশাসিত দাদরা ও নগর হাভেলির বেশ কিছু জেলার বুক চিরে এই রেলপথ তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু বেঁকে বসে গোল বাধিয়েছেন মূলত মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটের কৃষক ও গ্রামবাসীরা। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, আগে গ্রামবাসীদের জন্য পুকুর, অ্যাম্বুলেন্স, রাস্তায় সৌরশক্তির আলো, ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। তারপরে বুলেট ট্রেনের জন্য জমি ছাড়ার কথা ভাববেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই গ্রামবাসীদের কেউ কেউ এসব দাবির কথা লিখিতভাবে জানিয়েও দিয়েছেন।
জাপানের সহায়তায় প্রস্তাবিত বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গঠিত হয়েছে ন্যাশনাল হাই স্পিড রেল কর্পোরেশন লিমিটেড (এনএইচআর সিএল)। পরিকল্পনা রয়েছে আগামী ২০২২সালের মধ্যেই এই লাইনে দুরন্ত গতিতে ছুটে যাবে বুলেট ট্রেন। কেন্দ্রের দাবি, এই ট্রেন চালু হলে রেলপথে মুম্বাই থেকে আমেদাবাদের দূরত্ব বর্তমানের ৭ঘন্টা থেকে কমে হবে ৩ঘন্টা। কিন্তু গোল বেধেছে রেললাইন বসানোর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে। এনএইচআর সিএল সূত্রের খবর, সবচেয়ে বেশি বাধা আসছে মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার মানুষের থেকে। প্রকল্পের মোট ৫০৮কিলোমিটার রেললাইনের ১১০কিলোমিটারই বসবে এই জেলার মাটিতে। শুধু পালঘরেই অন্তত ৭৩টি গ্রামের আনুমানিক ৩০০হেক্টর লম্বা জমি দরকার, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রায় ৩হাজার মানুষ। তাই বুলেট ট্রেন আটকাতে কোমর বেঁধে নেমেছেন এই জেলার বিশেষত ২৩টি গ্রামের ফলচাষি এবং আদিবাসীরা। তাঁরা সোচ্চারে বলছেন, ‘আগে আমাদের দাবি মানো, তারপরে জমি নাও’।
গ্রামবাসীদের দাবিও নানান রকম। পালঘরের মুকুন্দসর গ্রামের মানুষ জানিয়েছেন, তাঁদের গ্রামে ৫হেক্টরের একটি বিরাট পুকুর আছে। জমি নেওয়ার আগে সেই পুকুরের পাড় বাঁধিয়ে দিতে হবে রেলকে, দাবি তুলেছে মুকুন্দসর। খুর্দ এবং বিক্রমগড় গ্রামদু’টির বাসিন্দারা আবার চাইছেন, তাঁদের গ্রামে নিয়মিত চিকিৎসক আসার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। বেটে গ্রামের দাবি, আগে অ্যাম্বুলেন্স এবং রাস্তায় সৌরশক্তির আলোর ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কেলোয়া গ্রামের দাবি ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ।
জোরালো প্রতিরোধে নেমেছেন পালঘরের আমচাষি এবং সবেদাচাষিরাও। ৬২বছর বয়সী দশরথ পূরভ যেমন বলেছেন, টানা তিন দশকের খাটুনি দিয়ে সবেদাবাগান গড়ে তুলেছি। এখন সরকার বলছে, এই জমি দিয়ে দাও। আমার দুই ছেলেই বেকার। ওদের অন্তত একজনকে পাকা সরকারি চাকরি দেওয়া হোক। তারপরে জমির কথা। অন্যদিকে পালঘরের আদিবাসী মানুষের যেন হয়রানির অন্ত নেই। ১৯৯০সালে সূর্য বাঁধ প্রকল্পের কারণে একবার বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিলো হনুমান নগর এবং চন্দ্রনগর গ্রামের আদিবাসী মানুষকে। ফের ঘর হারানোর আশঙ্কায় এবার কার্যত রুখে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা।
গ্রামবাসীদের এহেন বিরোধিতার মুখে নিজেদের কৌশলও খানিকটা বদলে নিতে বাধ্য হয়েছে মরিয়া এনএইচআর সিএল। সংস্থার মুখপাত্র ধনঞ্জয় কুমার বলেছেন, ‘এবার আমরা পালঘরের ২৩টি গ্রামের জমিদাতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে তাঁদের বক্তব্য শুনবো, আশ্বাস দেবো। গ্রামবাসীদের দাবিও মেনে নেবো আমরা। ঘোষিত ক্ষতিপূরণের বাইরে তাঁরা কি কি চান, সুনির্দিষ্টভাবে তার উল্লেখ করে গ্রামের সরপঞ্চের কাছে আবেদন জমা দিতে বলবো। সেইমতো ব্যবস্থা নেবো। উভয় তরফে স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই মাঝখানে গ্রামের সরপঞ্চকে রাখতে চাইছি।’ একইসঙ্গে অবশ্য তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘এতদিন গ্রামের সরপঞ্চের মাধ্যমে সভা ডেকে আমাদের প্রকল্পের কথা জানিয়ে জমিদাতাদের সমর্থন চাইছিলাম। কিন্তু তাতে চিঁড়ে ভেজেনি। বাধ্য হয়েই কৌশলে বদল আনলাম আমরা।’ 
তবে গুজরাটে বাধা থাকলেও তা ‘সামলে নেওয়া যাবে’ বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন এনএইচআর সিএল মুখপাত্র। জানিয়েছেন, গুজরাট নিয়ে তাঁদের ‘বিশেষ উদ্বেগ নেই।’ এই প্রকল্পের জন্য রাজ্য সরকারের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী ১৯৫টি গ্রামের মধ্যে ১৮৫টিতেই নোটিস পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে গুজরাটে জমি অধিগ্রহণ বাধাহীন হবে এমন ভাবার কোন কারণ আছে বলে মনে হচ্ছেনা। কৃষক আন্দোলনের এক কর্মী সাগর রাহারি জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই বহু কৃষক জমি অধিগ্রহণে আপত্তি তুলে জেলাশাসকদের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। কৃষ্ণকান্ত নামে আরেকজন বলেন, দু’টি রাজ্যের প্রকল্প এটি। ফলে গুজরাটের জমি অধিগ্রহণ আইন এখানে কার্যকরী হতে পারেনা। তেমন কিছু হলে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে বাধ্য হবেন কৃষকরা। এছাড়াও এই প্রকল্প ঘিরে গুজরাটের বহু কৃষকের বিস্তর অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। ভালসাদ জেলার সারন গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত জমিমালিক ভাগুভাই প্যাটেল ক্ষোভ ঝরিয়ে শোনালেন, ‘বুলেট ট্রেন নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা হচ্ছে গুজরাটে। জমিমালিকদের অন্তত ৬০দিনের নোটিস দেওয়ার কথা আইনে লেখা থাকলেও বাস্তবে মাত্র এক-দু’দিন আগে নোটিস দেওয়া হচ্ছে। রেজিস্টার্ড পোস্টে নোটিস না পাঠিয়ে স্থানীয় অফিসারদের হাতে হাতে নোটিস পাঠানো হচ্ছে। তাঁরা দেরি করছেন। সামান্য চিন্তাভাবনার সময় পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছেনা ক্ষতিগ্রস্ত জমিমালিকদের।’ 
প্রসঙ্গত, বুলেট ট্রেনের জন্য গুজরাটে আনুমানিক ৮৫০হেক্টর জমি দরকার পড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রায় ৫হাজার জমিমালিক। গুজরাটের ৮টি জেলা— আমেদাবাদ, খেদা, আনন্দ, ভদোদরা, ভারুচ, সুরাট, নভসরি এবং ভালসাদের মাটিতে এই রেললাইন বসার কথা।
দেশে কোন সমস্যারই বিন্দুমাত্র সুরাহা না দিতে পারলেও প্রধানমন্ত্রী মোদীর স্বপ্ন, আগামী ২০২২সালের ১৫ই আগস্ট তিনিই পতাকা নেড়ে বুলেট ট্রেন উদ্বোধন করবেন! সেসময় তিনি আদৌ প্রধানমন্ত্রী থাকবেন কিনা সে প্রশ্ন তোলা থাকলেও, আপাতত তাঁর অফিসাররা শেষপর্যন্ত জমি বিভ্রাট সামলাতে পারেন কিনা সেটিই এখন দেখার।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement