তৃণমূলের হাতে পড়লে
চার আনাও মিলবে না

মৃতের বাবার কথায় অপ্রস্তুত পার্থ চ্যাটার্জী

তৃণমূলের হাতে পড়লে<br>চার আনাও মিলবে না
+

নিজস্ব সংবাদদাতা: মেদিনীপুর, ১৭ই জুন— ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর বারোটা। ‘উন্নয়ন বাহিনী’র দাপটে পঞ্চায়েত দখল করলেও গ্রামবাংলা শাসক তৃণমূলকে কীভাবে চেনে, তার এক নিদারুণ দৃশ্য তখন রচিত হচ্ছে গড়বেতা থানা এলাকার বুড়ামারা গ্রামে।
শনিবার দুপুরে লালগড়ের ঝিটকার জঙ্গল লাগোয়া পিচ রাস্তায় বাস উলটে ছয় জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে তিন জন বুড়ামারা গ্রামের বাসিন্দা। সেই গ্রামেই এদিন সকালে নিহতদের বাড়িতে যান তৃণমূলের মহাসচিব ও রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি। বুড়ামারা গ্রামের বাসিন্দা নিহত শম্ভু সরেনের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী দিল্লিতে আছেন। তাঁর নির্দেশেই এসেছি, আর্থিক সাহায্য করা হবে নিহতদের পরিবারকে।’’
শুধু এই কথাটুকু শোনার অপেক্ষা।
সন্তান হারিয়ে শোকে মুহ্যমান শম্ভু সরেনের বাবা লক্ষ্মী সরেন কান্নাভেজা গলাতেই চিৎকার করে উঠলেন। পার্থ চ্যাটার্জির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘যদি কিছু সাহায্য দিতেই হয়, তা যেন পরিবারের হাতেই দেওয়া হয়। তৃণমূল নেতাদের হাতে দিলে একটা টাকাও মিলবে না। ১ টাকা দিলে চার আনাও হাতে আসবে না।’’ রীতিমতো অপ্রস্তুত তখন পার্থ চ্যাটার্জি। দৃশ্যতই বিব্রত বিধায়ক এবং তৃণমূলের বাকি নেতারাও। একে অপরের মুখ চাওয়াচায়ি করছেন। বলে চলছেন মৃতের বাবা। খুব বেশিক্ষণ আর কথা বাড়াতে পারেননি তৃণমূলের মহাসচিব।
বাস দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা ও আর্থিক সহায়তার কথা জানাতে গিয়ে খোদ নিহতের বাবার মুখ থেকেই তৃণমূলের তোলাবাজির কথা শুনতে হচ্ছে শাসক তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে। গ্রামে গ্রামে তৃণমূল কী, সাধারণ গ্রামবাসীরাই বা তাদের কী চোখে দেখেন, নিজের চোখেই তা এদিন দেখতে পেলেন পার্থ চ্যাটার্জি।
বুড়ামারা গ্রামে যাওয়ার আগে শালবনী ব্লকের বয়লা গ্রামে গিয়েও প্রায় একই ধরনের নিদারুণ অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয় পার্থ চ্যাটার্জিকে। গ্রামবাসীদের রীতিমতো ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। এই গ্রামের বাসিন্দা ভগীরথ বেসরা ও নেপা হাঁসদা শনিবার বেলপাহাড়িতে আদিবাসীদের সভায় যাওয়ার পথে বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। ভগীরথের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। তাঁর বাড়ির সামনে এদিন সকাল থেকেই শাসক তৃণমূলের কর্মীরা জড়ো হন। গ্রামবাসীদের বুঝিয়েও দেওয়া হয়— বড় নেতা আসছেন, সকলে যেন দাঁড়িয়ে থাকেন, ‘অপ্রিয়’ প্রশ্ন যেন না হয়।
বিশাল কনভয় নিয়েই গ্রামে ঢোকেন পার্থ চ্যাটার্জি। ষাটোর্ধ্ব রতন বেসরা, নিহত ভগীরথ বেসরার বাবা। পার্থ চ্যাটার্জির সামনে হাউহাউ করে কাঁদছিলেন। তৃণমূলের মহাসচিব জানালেন, ‘‘আর্থিক সহায়তা করা হবে। ঘর করে দেওয়া হবে।’’ কান্নার মাঝেই এরপরেই যেন ক্ষোভের বিস্ফোরণ সন্তান হারানো পিতার গলায়।
চোখে জল নিয়েই রতন বেসরা বলে উঠলেন, ‘‘ছেলে মরে যাওয়ায় ঘর করে দেওয়ার কথা বলছেন! কী হবে তাতে? সেই ঘরে কে থাকবে? ছেলেই তো নেই।’’ 
সপাটে মুখের উপর এই জবাব। থমকে যান পার্থ চ্যাটার্জি। পাশেই তখন এলাকার তৃণমূল বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাতো। প্রৌঢ় রতন বেসরার কথা শুনে তিনিও চুপ, অস্বস্তিতে পড়ে যান। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক করতে পার্থ চ্যাটার্জি তখন বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাতোকে ডেকে বলেন, কী হয়েছে দেখতে। শালবনী ব্লকের বিষ্ণুপুর অঞ্চলের বয়লা গ্রাম। রতন বেসরার পাশে তখন তাঁর পুত্রবধূ পানমনি বেসরা ও ছোট চার বছরের নাতি। এরপরেই স্থানীয় তৃণমূলী নেতারা রতন বেসরাকে হাত দিয়ে টেনে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পার্থ চ্যাটার্জি তখন বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাতো ও স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানকে তলব করেন। গোটা ঘটনাটি কী, তা জিজ্ঞাসা করেন। 
পার্থ চ্যাটার্জির সামনেই তখন তৃণমূলী পঞ্চায়েত প্রধান আমতা আমতা করে বলেন, এই বুথে ৩৫-৪০ জনের ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে আবাস যোজনায়। আশপাশের তৃণমূল কর্মীরাও তাতে সায় দেন। কিন্তু তারপরেই বদলে গেল পরিস্থতি। গ্রামের সাধারণ মানুষজনই এবার পালটা জবাব দিলেন। এলাকার বাসিন্দারাই নিহত ভগীরথ বেসরার বাবা রতন বেসরার চালাঘরটি দেখিয়ে বলে উঠলেন, এই পরিবার তো বি পি এল। আবাস যোজনায় নাম থাকলেও ঘর তৈরির টাকা পায়নি। তৃণমূল নেতারা নাম তোলেননি। বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই ১০ কাঠা জমি পেয়েছিল। খেতমজুরির সঙ্গে নিজের জমিতে চাষ করেই সংসার চলে। 
আরও শুনতে বাকি ছিল পার্থ চ্যাটার্জির। গ্রামবাসীরা তখন তৃণমূলের মহাসচিবের সামনে গলার জোর বাড়িয়ে বলে চলেছেন, এই গ্রামে যে কটি পরিবার ঘর পেয়েছে, সবাইকে টাকা দিতে হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে থেকেই একজন বলে উঠলেন, এই নিহতের পরিবারের কাছ থেকে আবাস যোজনায় ঘরের জন্য কুড়ি হাজার টাকা চেয়েছিলেন তৃণমূলের নেতারা। টাকা দিতে পারেনি বলে ঘরও পায়নি। কোনও মতে নিজেরাই মাটির দেওয়াল তুলেছে। তখন চুপ পার্থ চ্যাটার্জি। নিজের কানে শুনছেন গরিব আদিবাসী গ্রামের ক্ষোভের প্রতিটি শব্দ। 
যে পরিবারকে ঘর দেবেন বলেছেন, সেই পরিবারই তৃণমূলকে ২০ হাজার টাকা দেয়নি বলে ঘর পায়নি— নিজের কানে শুনলেন পার্থ চ্যাটার্জি। তৃণমূলী বিধায়কও তখন চুপ। এত আয়োজন করেও গ্রামবাসীদের মুখ খোলা বন্ধ করা গেল না। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement