চ্যাম্পিয়নের হার

চ্যাম্পিয়নের হার
+

১৭ই জুন —  সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটেই গেল। শুরুর ম্যাচেই হারলো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়াম সাক্ষী রইলো ইতিহাসের এক অধ্যায়ের। 
লুঝনিকি স্টেডিয়াম বিশাল। দুতলা ও তিনতলা মিলিয়ে মিডিয়া সেন্টার। প্রেস বক্স সেই টঙে : ছতলায়। এই তিনতলার মিডিয়া সেন্টারের সামনেই কিছুটা ফাঁকা জায়গা। সুস্থ সবলদের জন্য তো সারা গ্যালারিই রয়েছে। এই ছোট্ট খালি জায়গাটা যাঁরা শারীরিকভাবে অক্ষম তাঁদের জন্য। খেলা দেখার সাধ যেন অপূর্ণ না থাকে কারোর, তাই এই ব্যবস্থা। 
হুইল চেয়ারের বসা এই দর্শকদের ভিড়ে মিশে গিয়েছিল দুই দলই। বেশিটা জার্মানি। বাকি মেক্সিকো। পুরো গ্যালারি উচ্ছ্বাসে ভাসছে, এই সমর্থকরাও উচ্ছ্বাসে মেতেছেন। এর মধ্যেই একজন মেক্সিকোর সমর্থক সবথেকে বেশি উৎসাহিত। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন না তো কি হয়েছে! ইলেকট্রিক হুইলচেয়ারে চড়েই এদিক সেদিক ছুটে বেড়ালেন। মেক্সিকো ফুটবল দলের ডাক নাম ‘এল ট্রাই।’ কার্লোজ ভেলা বা চিচারিতো যখনই কাউন্টারে উঠেছে তখনই তিন চক্কর দিয়েছেন। আর গোল হওয়ার পর কতক্ষণ যে আনন্দ করলেন তার কোনও ইয়ত্তা নেই। যাকে পারছেন তাঁকেই জড়িয়ে ধরছেন। দুবার পাশে বসা জার্মান সমর্থকেরও পিঠ চাপড়ে দিলেন। তাঁর আনন্দের সীমা নেই। 
সীমা হবেই বা কেন? গত বছরই কনফেডারেশন কাপে এই মস্কোর মাটিতে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল জার্মানি। সেই হারের ক্ষত তো মিলিয়ে যায়নি। টাটকাই আছে। সেই হারের যন্ত্রণাই যেন সুদে আসলে ফেরত দিল মেক্সিকো। 
বিশ্বকাপের শুরুতেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জন্য বড়সড় ধাক্কা। শেষ সাতটি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে অপরাজিত ছিল জার্মানরা। মেক্সিকোর কাছে ১-০ তে হেরে সেই তকমাই হারালেন টনি ক্রুজ, টমাস মুলাররা। মস্কোয় যদিও বরাবরই বেগ পেতে হয়েছে জার্মানিকে। সেই ধারাই যেন বজায় থাকল। গতবারের চ্যাম্পিয়নরা যদিও হেরেই মস্কোয় পা রেখেছিলেন। অস্ট্রিয়ার কাছে প্রস্তুতি ম্যাচে হারের পরেও সতর্ক হননি জোয়াকিম লো। সম্ভবত সেই ম্যাচ থেকেই জার্মানিকে হারানোর রসদ জোগাড় করেছিলেন জুয়ান কার্লোজ ওসোরিও। মাঝমাঠেই লুকিয়েছিল জার্মানির পরান পাখি। সেই মাঝমাঠকেই অকেজো করেছিলেন মেক্সিকো কোচ। সঙ্গে কাউন্টার অ্যাটাক। ম্যাট হামেলস ও জেরম বোয়াতেঙরা মেক্সিকোর গতির সঙ্গে পেরে ওঠেননি। উইংয়ে হার্ভিং লোজানো, মাঝমাঠে মিগুয়েল লায়ুনের গতি এবং সঙ্গে কার্লোজ ভেলা ও জাভিয়ের হার্নান্ডেজের সামনে রক্ষণ দাঁড়াতে পারেনি। একাধিকবার গোল করার সুযোগ পেলেও শেষপর্যন্ত তাতে সফল হয়নি। সঙ্গে মাঝমাঠে টনি ক্রুজকে অকেজো করে রেখেই যেন কাজ হাসিল হয়। মেক্সিকোও কমসম করেও শেষ পাঁচবার না হেরে বিশ্বকাপ সফর শুরু করেছিল। ফলে ৩৫ মিনিটে জাভিয়ের হার্নান্ডেজের পাস থেকে গোল করে ম্যাচ মুঠোয় এনে দেন হার্ভিন লোজানো।
মেসুত ওজিল ও টনি ক্রুজরাও সহজে হাল ছাড়ার নয়। দ্বিতীয়ার্ধে মেক্সিকোর পায়ে বল জমা করতে চায়নি। তাই নিজেদের  মধ্যে পাস খেলেই গোলের জন্য ঝাঁপাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। লোজানোর গোলই তাতিয়ে দিয়েছিল। চোখের সামনে জয়ের হাতছানি মেক্সিকোর রক্ষণ থেকে জমাট বাঁধিয়ে তুলেছিল। ওসোরিও-র পরিকল্পনার মতোই এল ট্রাইয়ের দুর্গ রক্ষা করার শেষ কারিগর ছিলেন গিলেরমো ওচোয়া। মেক্সিকোর গোলের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তার আন্দাজ পাওয়া গিয়েছিল ম্যাচ শেষে সাংবাদিক বৈঠকে। মেক্সিকোর এক সাংবাদিক মজার ছলে প্রশ্ন করলেন, ‘শুনলাম মেক্সিকোর সরকার নাকি গোলের পর ভূমিকম্প অনুভব করেছে!’ যদিও তাতে খুব একটা সাড়া দেননি। অভিজ্ঞ কোচের জবাব, ‘আমি গোলের পর শুধু বসে পড়েছিলাম। কীভাবে পরের পাঁচ মিনিট গোল না হয় সেই কথায় মাথায় এসেছিল।’ 
বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত সব থেকে বড় অঘটন বোধ হয় জার্মানির পরাজয়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর হ্যাটট্রিক, মেসির পেনাল্টি নষ্ট বা রাশিয়ার পাঁচ গোলের থেকে বেশি আলোচনার বিষয় গতবারের চ্যাম্পিয়নদের হার। ম্যাচের যে এই অবস্থা হতে পারে তা কখনোই ভাবেননি জোয়াকিম লো এবং তা স্বীকার করেও নিয়েছেন। ‘এই হার হতাশার তো নিশ্চই। অনেক সময় অনেক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেগুলোকে অতিক্রম করেই এগিয়ে যেতে হয়। পরের ম্যাচে আমাদের জিততেই হবে। চাপে থেকেই নামতে হবে। ওই ম্যাচই আমাদের জন্য নির্ণায়ক হবে।’ উইংয়ে সমস্যা, বলের দখল হারানো, কাউন্টার অ্যাটাকে খেলতে না পারার মতো একাধিক ভুল ত্রুটি হয়েছে। আর তার ফলেই সমস্যা হয়েছে জানালেও, পরের ম্যাচেও নিজেদের খেলার শৈলী বদল করবেন না বলেই দাবি করেছেন। একটা হারেই ভীত সন্ত্রস্ত হওয়ার কোনও দরকার নেই বলেই মনে করেন জোয়াকিম লো। 
জার্মান কোচ যতই অভয় দিন, সমর্থকরা অত সহজে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। মুখ চুন করে গ্যালারি ছেড়েছেন। শুধু মিডিয়া সেন্টারের সামনের যে গুটি কয়েক সমর্থক ছিলেন হুইলচেয়ারে, তাঁরা হাসতে পেরেছেন। মেক্সিকোর সমর্থকরাই এগিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন কষ্ট ভাগ করার জন্য। যে কষ্টটা এক বছর আগে পেয়েছিলেন তাঁরা।

Featured Posts

Advertisement