অঙ্ক কষে খেলেই
ফাইনালে ফ্রান্স

অঙ্ক কষে খেলেই<br>ফাইনালে ফ্রান্স
+

অঙ্ক। সহজ সরল অঙ্ক। অঙ্ক করে খেলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্স। যে অঙ্কে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল বেলজিয়াম। ঠিক সেই অঙ্কেই এবার পরাস্ত বেলজিয়াম। একটা যে টানটান সেমিফাইনাল দেখব, প্রত্যাশা ছিলই। শুরুটা সেরকমই হয়েছে। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ। প্রতি মুহূর্তেই টানটান উত্তেজনা। যে ফুটবল দেখতে রাত জাগা, একদম সেরকমই ফুটবল। দুদলের ফারাক বলতে আমার চোখে অন্তত কিছুই লাগেনি। ফুটবলে আদি-অনন্তকাল ধরে যা ফারাক গড়ে, মঙ্গলবারও তাই গড়লো। একটা গোল। উমতিতির গোল এবং সেই গোলের পর দেঁশর সাধারণ কিছু অঙ্ক। কোনোভাবেই গোল না খাওয়ার জেদ। রক্ষণ, মাঝমাঠ জমাট রেখে সুযোগ পেলে আক্রমণ। দেঁশ অধিনায়ক হিসাবে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। এবার কোচ হিসাবে বিশ্বকাপ জেতার খুব কাছে পৌঁছে গেলেন। আরও একবার প্রমাণ করলেন বড় মঞ্চে কোচের ট্যাকটিকসও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে রং দেওয়ার ফুটবলারের অবশ্য অভাব ছিলো না। ফ্রান্সে এমবাপ্পে, গ্রিজম্যান, পোগবা, মাতুইদি। অন্যদিকে বেলজিয়ামে হ্যাজার্ড, লুকাকু, দি ব্রুইন। বেলজিয়াম এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দল। ব্রাজিল নিজেদের সেরা ম্যাচ খেলেও বেলজিয়ামকে হারাতে পারেনি। সেমিফাইনালেও দুরন্ত শুরু করেছিলো রবার্তো মার্টিনেজের দল। সেমিফাইনালে আমার কিছুটা নিস্প্রভ লাগলো লুকাকুকে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে লুকাকুর জন্যই দানা বাঁধলো না বেলজিয়াম আক্রমণ। তবে একজন ফুটবলারকে দেখে এই বিশ্বকাপে ভীষণ ভালো লাগলো। ইডেন হ্যাজার্ড। বল নিয়ে এতো ভালো একজন ফুটবলারকে খেলতে দেখলে অসাধারণ লাগে। বেলজিয়ামে এদিন একাই খেললো হ্যাজার্ড। বার তিনেক অন্তত গোলের কাছে পৌছে গিয়েছিলেন হ্যাজার্ড। একাই তিনজন ফুটবলারকে টেনে নিয়ে যাওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে বেলজিয়ামের এই ফুটবলারের। তাঁকে আটকাতে বেশ কয়েকবার ফাউল করল ফ্রান্স রক্ষণ। এমনকি আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় বেলজিয়াম একটি পেনাল্টি পেতেই পারতো। 
ফ্রান্সের জয়ে স্কোরবোর্ডে লেখা থাকবে উমতিতির নাম। যা লেখা থাকবে না, তা হলো নিশ্চিত তিনবার ফ্রান্সের পতন বাঁচালেন ফরাসি গোলরক্ষক হুগো লরিস। ২১ মিনিটে কর্নার থেকে বেলজিয়ামের অল্ডারউইরেল্ডের চকিতে শট দুরন্ত দক্ষতায় বাঁচান লরিস। তার কিছুক্ষণ পরেই ফ্রান্সের হয়ে সহজ সুযোগ নষ্ট করলেন জিরু। ফরাসি আক্রমণে বেশ নজর কাড়ছিলেন গ্রিজম্যান, এমবাপ্পেরা। বেলজিয়াম গোলের নিচে কুর্তোয়াও একটি ভালো সেভ করেন। 
দ্বিতীয়ার্ধের ৫১ মিনিটেই গোল পেয়ে যায় ফ্রান্স। কর্নার থেকে দুরন্ত হেডে গোল উমতিতির। ফুটবলে যে কে কবে নায়ক হবে, আগে থেকে বোঝা যায় না। যেমন এদিন এমবাপ্পে, হ্যাজার্ডদের মঞ্চে নায়ক হলেন উমতিতি। গোলের কিছুক্ষণ পরেই চোখ জুড়িয়ে গেল এমবাপ্পের একটা ফ্লিক দেখে। চোখের আরাম। এমবাপ্পে যদি নিজেকে ধরে রাখতে পারে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও ধারালো করতে পারে নিজেকে তাহলে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। গোলের পরেই কিন্তু ফ্রান্সের খেলার স্টাইলটা মুহূর্তে পালটে গেল। অনেকটা পিছিয়ে গেল গোটা দল। ঠিক যেন ব্রাজিল ম্যাচে বেলজিয়াম দল। এরপর বারবার বেলজিয়াম আক্রমণ করেও গোলের মুখটা খুলতে পারলো না। হ্যাজার্ড দুরন্ত খেললেও পাশে কাউকে পেলেন না। এবারের বিশ্বকাপ বারবার একটা বিষয় প্রমাণ করছে কোনও একজন ফুটবলার নয়, দলগত শক্তিই টেক্কা দিচ্ছে। বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালেও তাই হলো। হ্যাজার্ড হেরে গেলেন ফরাসি দলের সংঘবদ্ধ রক্ষণের কাছে।
বেলজিয়ামকে কিন্তু এই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট বলা হচ্ছিলো। ব্রাজিলকে হারানোর পর স্বপ্ন দেখাটা শুরু করে দিয়েছিলেন বেলজিয়ামের মানুষ। তবে ফ্রান্সের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা এখন বেলজিয়ামে। আবার কবে এতোজন ভালো ফুটবলার দলে থাকবেন, সেই আশাতেই প্রহর গোনা। ম্যাচে শেষে টিভিতে কুর্তোয়াকে দেখে খুব খারাপ লাগছিলো। ম্যাচের শেষ দিকে বার দুয়েক বেলজিয়াম রক্ষণের ফাঁককে কাজে লাগিয়ে গোলের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল ফ্রান্স। একের বিরুদ্ধে এক পরিস্থিতিতে গোল বাঁচিয়ে দলকে ম্যাচে রেখেছিলেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ফ্রান্স এবারের বিশ্বকাপের প্রথম থেকেই অন্যতম ফেভারিট। ঠিক যে ম্যাচটা যেভাবে খেলা দরকার দেঁশর দল সেভাবেই খেলেছে। বেলজিয়াম ম্যাচটাও ওরা তাই খেললো। ফারাক বেশি ছিল না। তাই একটা গোল পেয়ে যাওয়ার পর সেটা সফলভাবে ধরে রাখলো। শেষ হাসিও হাসলো। 
ফাইনালে ফ্রান্স। ২০০৬ সালের পর। প্রতিপক্ষ যেই হোক এই ফ্রান্স কিন্তু অনেক ধারালো। ট্রফিটা কিন্তু দেখতে পাচ্ছে দিদিয়ের দেঁশর দল। ২০ বছর পর আবার বিশ্বজয়ের হাতছানি। ২০ বছর আগে পেরেছিলেন। দেঁশ কি এবারও পারবেন? উত্তর পেতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে ফ্রান্স যে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দাবিদার, তা কিন্তু বলে দেওয়া যায় এখনই। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement