বিজ্ঞান গবেষণার স্মারক
পাভলভের কুকুরের মূর্তি

বিজ্ঞান গবেষণার স্মারক<br>পাভলভের কুকুরের মূর্তি
+

সেন্ট পিটার্সবার্গ : ১১ই জুলাই—  নেইমারের শট ধেয়ে আসছে। দেখা মাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হাতের মুঠো দিয়ে ঠেলে বাইরে পাঠালেন থিয়াবৌ কুর্তোয়া। ব্রাজিলের সমতায় ফেরা হলো না।
ফ্রান্সের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মেসির শট। গোলমুখী শট দেখামাত্রই পা সরাতে চেয়েছিলেন মার্কাডো। বল তাঁর পায়ে লাগে। গোলে প্রবেশ করে। হুগো লরিস ঝাঁপিয়ে ছিলেন। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। গোল হয়। এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা।
বল দেখা মাত্র থিয়াবৌ কুর্তোয়ার ঝাঁপ দেওয়া; মার্কাডোর পা সরাতে চাওয়া; বল দেখা মাত্র ফুটবলারদের সাড়া দেওয়া হলো রিফ্লেক্স বা প্রতিবর্ত ক্রিয়া। ফুটবলে যার রিফ্লেক্স অ্যাকশন যত ভালো তার প্রতিক্রিয়া তত দ্রুত।
এই প্রতিবর্ত ক্রিয়াকে দুভাবে ভাগ করেছিলেন ইভান পাভলভ। সহজাত এবং অর্জিত। তাঁর এই পরীক্ষাগারও ছিল এই সেন্ট পিটার্সবার্গে। বলশায়া নেভা নদীর পাশেই দাঁড়িয়ে ইভান পাভলভ মেমোরিয়াল প্যালেস। যেখানে প্রতিবর্ত ক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেছিলেন পাভলভ। ইনস্টিটিউট অব এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিনের সাইকোলজি বিভাগের সামনে রয়েছে কুকুরের মূর্তি। বলশায়া নেভা নদী টপকে গাড়ি নিয়ে বাঁদিকে ঘুরলেই পাভলভের এই আকাদেমি। বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালের দিন ঘুরতে ঘুরতে যাওয়া গেল সেই আকাদেমিতে। 
ঘন সবুজের মাঝে কান খাড়া করা একটা ডোবারম্যান পিঞ্চ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অথচ শান্তভাবে বসে গোলাকার ব্রোঞ্জের বেদীর উপর। ডোবারম্যান পিঞ্চটিকে চারিদিকে ঘিরে রেখেছে শেফার্ড, হাউন্ড, সেট্টার, গ্রেহাউন্ড, ব্লাডহাউন্ড, স্পিৎজ এবং মাট। সামনেই ধূসর পাথরের উপর তৈরি একটি ফোয়ারা। বেদীটিকে ঘিরে রয়েছে আরও কতগুলি খোদাই করা ছবি। লালা নিঃসরণের ছবি, পরীক্ষাগারে চারজন গাউন পরে একটি কুকুরের অস্ত্রোপচার করছেন। যার নিচে খোদাই করে লেখা,  ‘‘Let the dog, a helper and friend of man from prehistoric times, be sacrificed to science, but our dignity obliges us that this should happen without fail and always without unnecessary torture”
নির্দিষ্ট সময়ে ঘণ্টা বাজিয়ে কুকুরকে খেতে দিয়ে প্রতিবর্ত ক্রিয়া প্রমাণ করেছিলেন ইভান পাভলভ। পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, বেশ কয়েক দিন ধরে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘণ্টা বাজিয়ে খাবার দেওয়ার ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রতিদিন ওই সময়ে লালা নিঃসরণ হচ্ছে কুকুরের। অভ্যাসের ফলে অর্জিত প্রতিবর্ত ক্রিয়া সহজাত প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল। গোলরক্ষকরা যেভাবে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলনের ফলে বল কৌশল রপ্ত করেন। চমক লাগার মতো তথ্য দিলেন ইনস্টিটিউট অব এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিনের সাইকোলজি বিভাগের ছাত্র অ্যালেক্সেই ডোনকোভিচ। এই কুকুরের মূর্তি সেই কুকুরটির নয় যার সঙ্গে লালা নিঃসরণের পরীক্ষা হয়েছিল। বরং পাভলভের গবেষণাগারে যেসব কুকুরের প্রাণ গিয়েছিল তাদের সবার স্মৃতিতে এই বেদী তৈরি করা হয়েছে। কুকুরটি যে রং চটা বাড়িটির দিকে তাকিয়ে সেখানেই তাঁর নোবেল জয়ী পরীক্ষা করেছিলেন পাভলভ।
১৯৩৫ সালে বন্ধু আই এফ ভাসেলেভকে দিয়ে এই তৈরি মূর্তি তৈরি করিয়েছিলেন পাভলভ। শুধু এই কুকুরের মূর্তিই নয়, উলিৎসা আকাদেমিকা পাভলভা রোড থেকে যে রাস্তা ভিতরে প্রবেশ করেছে তার দুদিকে রয়েছে চার্লস ডারউইন, লুই পাস্তুর, সেচেনভ, মেন্ডেলেভদের ব্রোঞ্জের আবক্ষমূর্তি। 
এই আকাদেমিতে সাধারণের প্রবেশ একেবারেই নিষিদ্ধ। একমাত্র এখানকার কর্মচারী এবং গবেষকরা ছাড়া এখানে কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। ফিফা বিশ্বকাপের পরিচয় পত্র এবং আগ্রহ দেখে অ্যালেক্সে অনুমতি জোগাড় করেন নিরাপত্তারক্ষীর থেকে। তারপর অ্যালেক্সেই বললেন, ‘আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত এখানে সবার প্রবেশ অবাধ ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ইনস্টিটিউটকে নতুন করে সাজানো হয়। তখন থেকেই সাধারণের প্রবেশ বন্ধ।’ আরও বলেন, ‘পাভলভের ঐতিহাসিক কুকুরগুলির দেহের একটিকে মিউজিয়ামে দেওয়া হয়েছে। মস্কোর পাসে রিয়াজান ওব্লাস্টের একটি সংগ্রহশালায় রয়েছে ওই দেহটি।

Featured Posts

Advertisement