ক্রোয়েশিয়ার কিস্তিমাত

ক্রোয়েশিয়ার কিস্তিমাত
+

মস্কো, ১১ই জুলাই —  ওস্তাদের মার শেষ রাতে!

বুধবারের লুঝনিকি তারই সাক্ষী থাকলো। ইতিহাস গড়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌছলো ক্রোয়েশিয়া। হাওয়ায় ভেসে চলা ইংল্যান্ডকে পরাজিত করলো ২-১ গোলে।

অঘটনের বিশ্বকাপে হট ফেভারিট ইংল্যান্ডকে বাড়ি ফেরালো ক্রোয়েশিয়া। অথচ এটা তো ‘হোম কামিং’ ম্যাচ ছিল ইংল্যান্ডের।

গ্যালারির গেয়ে ওঠা; ইংল্যান্ডের ছন্দবদ্ধ ফুটবল আর পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই ট্রিপিয়ারের গোল। একটাই ধারণা বদ্ধমূল হয়, ইংল্যান্ডের ঘরে ট্রফি ফিরছে! কিন্তু তখনও খেল বাকি থা। বিশ্বকাপ ঘরে ফেরাতে হলে ম্যাচ জিততে হয়। ইংল্যান্ড তা পারেনি। পারতে দেননি মানজুকিচ, পেরিসিচরা।

আঠাশ বছর পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছিল ইংল্যান্ড। তাই ভিড় করে এসেছে ইংরেজরা। তা সে সমর্থক হোক, সংবাদমাধ্যম হোক বা প্রাক্তন ফুটবলার! গ্যালারিতে যেমন তিল ধারনের জায়গা ছিল না। তেমনই প্রেস বক্সেও। এতটাই ভিড় যে রায়ান গিগস থেকে অ্যালান শিয়ারারও সাধারণের মতো চেয়ারে বসেছেন। তবে বসতে পেরেছেন কি পারেননি! এমন সময়েই গোল।

মাঠ তখনও ভরেনি পুরোপুরি। ক্রোয়েশিয়ার বক্সের সামনে ফ্রি কিক পায় ইংল্যান্ড। থ্রি লায়ন্সের রাইট উইঙ্গার কিয়েরান ট্রিপিয়ারের ফ্রিকিক মানজুকিচদের তৈরি হিউম্যান ওয়ালের উপর থেকে গোলে প্রবেশ করে। চোখের পলকে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। গিগসদের উচ্ছ্বাস থেকে মনে হতে থাকে এবার বোধ হয় সত্যিই ভরসা দেবে এই ইংল্যান্ড।

 ভরসা দিয়েওছিল। প্রথম পয়তাল্লিশ মিনি ক্রোয়েশিয়াকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছেন রহিম স্টার্লিং, হ্যারি কেনরা। উইং থেকে শুরু করে মাঝমাঠ কোত্থাও যেন টিকতে পারছিলেন না মড্রিচ-রাকিটিচরা। ক্রোয়েশিয়া মাঝমাঠে সব সময়ই শক্ত এবং অভিজ্ঞ। গ্যারেথ সাউথগেট ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য ৩-৫-২ ছকে দল সাজিয়েছিলেন। ক্রোয়েশিয়ার আক্রমণে অ্যাশলে ইয়ং এবং কিয়েরান ট্রিপিয়ার নিচে নেমে আসায় সেই ছক বদলে যাচ্ছিলো ৫-৩-২। সেই রক্ষণ ভেঙে গোল করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। জ্লাতকো দালিচ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রক্ষণাত্মক কৌশলই নন। আন্দ্রেজ ক্রামারিচের বদলে ইন্টারমিলানের ব্রোজোভিচকে ডিফেন্সিভ স্ক্রিনে রেখে রক্ষণ শক্ত করতে চান। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। প্রথমার্ধে বন্যার জলের মতো বল নিয়ে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণে প্রবেশ করেছেন রহিম স্টার্লিংরা। গোল করার সুযোগও তৈরি হয়। তা কাজে লাগাতে পারেননি।

প্রথম পয়তাল্লিশ মিনিট ম্যাচের রাশ যদি ইংল্যান্ড মুঠোয় রাখে, দ্বিতীয়ার্ধে তা ছিল ক্রোয়েশিয়ার কাছে। পরের পয়তাল্লিশ মিনিট জুড়ে ক্রোয়েশিয়ার দাপট। মানজুকিচের গতি কম হওয়ায় হ্যারি ম্যাগুয়ের বা জন স্টোনসদের সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না। পেরিসিচ সেই ঘাটতি পূরণ করতেই ইংল্যান্ড হোচট খায়। একটানা আক্রমণের ফলে গোলও পায় ক্রোয়েশিয়া। ৬৮ মিনিটে সিমে ভ্রসালজকোর ক্রস থেকে গোল করেন ইভান পেরিসিচ। কাইল ওয়াকারের সামনে থেকে ছো মেরে গোল করেন পেরিসিচ। ক্রোয়েশিয়ার ওমিস শহরের উপকন্ঠে ছোটোবেলায় পারিবারিক পোলট্রি ফার্মে মুরগী পাহাড়া দেওয়ার জন্য বন্ধুরা নাম দিয়েছিলেন মোরগ বা ‘হেন’। সেই মোরগ-রক্ষকই বুধবার মস্কোয় ক্রোয়েশিয়ার রক্ষকে পরিণত হলেন। ৬৮ মিনিটে গোল করে সমতা ফেরালেনই। লেফট উইংগার পেরিসিচ ইংল্যান্ডের রক্ষণের রাতের ঘুম কেড়ে নেন। একটি শট পোস্টে লেগে ফিরেও আসে।

 সমতায় ফেরার পর ক্রোয়েশিয়া যেমন শান্তভাবে অভিজ্ঞতার সঙ্গে খেলা সামলেছে, ইংল্যান্ড তা পারেনি। নির্ধারিত সময় অমিমাংসীত থাকায় খেলা অতিরিকডত সময়ে যায়। ক্রোয়েশিয়ার গড় বয়স ইংল্যান্ডের থেকে বেশি। তারপর দশদিনে তৃতীয় ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে খেললেও ক্লান্তির কোনো ছাপ পড়েনি। বরং ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণকে দাঁড়িয়ে থাকে চীনের প্রাচিরের মতো। যত ম্যাচ গড়িয়েছে  ইংল্যান্ড রক্ষণে চির ধরিয়েছেন মানজুকিচরা। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে, ১০৯ মিনিটে পেরিসিচের মাথায় বল লেগে ইংল্যান্ড রক্ষণে প্রবেশ করে। সেই বল থেকে গোল করতে কোনো ভুল করেননি সুযোগ সন্ধানী মানজুকিচ।

ইংল্যান্ডের সমর্থকরা যদিও দলের সঙ্গ ছাড়েননি। ভিডার পায়ে বল গেলেই দুয়ো দিয়েছেন। ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকরা গোল খেয়ে চুপ করে গেলেও, ইংল্যান্ডের সমর্থকরা শেষ মুহূর্ত অবধি গান গেয়ে পাশে থেকেছেন।

জুভেন্টাস ফরোয়ার্ডের গোলেই শেষ হয় ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ সফর। কুড়ি বছর আগে বিশ্বকাপের আবির্ভাবেই সেমিফাইনালে পৌছেছিল ক্রোয়েশিয়া। নামভারী ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কুড়ি বছর পরে বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখলো। রবিবার ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রথম ফাইনালের অপেক্ষায় এবার প্রহর গোনা।

Featured Posts

Advertisement