২টাকা কেজি চালে
কারচুপি মানলেন মমতা

২টাকা কেজি চালে<br>কারচুপি মানলেন মমতা
+

চন্দন দাস: ঝাড়গ্রাম ,৯ই আগস্ট — রাজ্যে ২টাকা কেজির চাল মানুষ ঠিকমত পাচ্ছেন না। ঝাড়গ্রামে বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।  এই প্রথমবার মমতা ব্যানার্জি দুটাকা কেজি চাল নিয়ে কারচুপির কথা স্বীকার করলেন। এদিন তিনি পরোক্ষে আরও স্বীকার করেছেন যে, রাজ্যের মানুষ সামাজিক পরিষেবাগুলিও ঠিকমতো পাচ্ছেন না। 
এই না পাওয়ার সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব কাদের হাতে তুলে দিলেন তিনি? পুলিশের হাতে— রাজ্যে যারা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক তৃণমূল কর্মীর থেকে সক্রিয় দলদাস। 
মমতা ব্যানার্জি কী বলেছেন এদিন এই প্রসঙ্গে? তাঁর মন্তব্য, ‘‘আমি পুলিশকে বলবো আদিবাসী গ্রামগুলিতে যান। তফসিলি গ্রামগুলিতে যান। সংখ্যালঘু গ্রামগুলিতে যান। মানুষের ঘরে ঘরে যান। গিয়ে দেখুন দুটাকা কেজি চাল মানুষ যেন ঠিকমতো পায়। যদি কেউ না দেয় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিন। মানুষ যেন ঠিকমত পরিষেবাগুলো পায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।’’
এদিন এত বড় গুরুদায়িত্ব যখন পুলিশের হাতে অর্পিত হচ্ছে, তখন আলিপুরদুয়ার, বালুরঘাট, মালদহ, মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, উলুবেড়িয়ার মতো বেশ কয়েকটি জায়গায় পুলিশ বেধড়ক লাঠি চালাচ্ছে আন্দোলনকারীদের উপর। সেই আন্দোলনকারীরা আক্রান্ত হচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে, যাঁরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের সমস্যা, সরকারি ব্যর্থতার ছবি তুলে ধরেছেন। চাষ, খেতমজুর, শ্রমিকদের সমস্যার পাশাপাশি আরও নানা সংকটের কথা উঠে এসেছে তাদের গত প্রায় তিনমাসের প্রচারে। সেগুলির মধ্যে আছে রেশনের ২ টাকা কেজি চাল কিভাবে বাইরে চড়াদামে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, তার বিবরণ। বার্ধক্য ভাতা থেকে আদিবাসী, সংখ্যালঘু, তফসিলি ছাত্রছাত্রীদের ভাতাগুলি কিভাবে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে রাজ্যে — তাও বামপন্থী সংগঠনগুলির ‘জেল ভরো’ আন্দোলনের দাবিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দাবিগুলি সঠিক — বৃহস্পতিবার তা প্রমাণ করেছেন মমতা ব্যানার্জিই।
তাহলে সেই দাবিগুলির ভিত্তিতে আন্দোলনকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর হামলা কেন? কেন ডায়মন্ডহারবারে বুধবার রাত থেকে ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, কর্মীরা তাণ্ডব চালালো? কেন দোস্তিপুরে এদিন সকালে হামলা চালালো সেখানকার সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির অনুগতরা? 
এদিন দুপুরে ওই হামলা যখন চলছে, প্রায় সেই সময়ে ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়ামের সভায় কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী? তিনি দাবি করলেন, ‘‘আমাদের এখানে প্রত্যেকের রাজনীতি করার অধিকার আছে। ভদ্রভাবে। প্রত্যেকের অধিকার আছে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার। ভদ্রভাবে।’’ যে শহরে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই দাবি, সেই ঝাড়গ্রামেই কৃষকের ফসলের দাম, খেতমজুরের দুশো দিন কাজ, দৈনিক ৩৫০ টাকা মজুরির মতো দাবিতে এদিন ‘ভদ্রভাবে’ মিছিল করতে দেয়নি মমতা ব্যানার্জিরই সরকার।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী আবার মাওবাদী প্রসঙ্গ এনেছেন। এদিন তিনি দাবি করেছেন যে, বেলপাহাড়িতে কিছু জায়গায় মাওবাদীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। বিশেষত যে পঞ্চায়েতগুলিতে তৃণমূল কংগ্রেস জেতেনি, সেই এলাকাগুলিতেই মাওবাদীরা আসা যাওয়া শুরু করেছে। প্রসঙ্গত, বিনপুর-২নং ব্লক এলাকায় আদিবাসী সমন্বয় মঞ্চ নামে একটি প্রধানত আদিবাসীদের সংগঠন অনেকগুলি আসনে জিতেছে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে। মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘‘মাওবাদীদের আর সাপোর্ট দেবেন না। যারা উগ্রপন্থী তাদের আমি ভালোবাসি না। এটা মাথায় রাখতে হবে। উগ্রপন্থী সে যেখানেই থাকুক, আমরা তাদের ভালোবাসি না। আমাদের এখানে থাকলেও আমরা তাদের সাপোর্ট করি না।’’
কে বললেন এই কথা? মমতা ব্যানার্জি। যিনি মাওবাদীদের মুখপত্র গৌর চক্রবর্তী গ্রেপ্তার হওয়াকে অভিহিত করেছিলেন ‘অগণতান্ত্রিক’ হিসাবে। ছত্রধরের গ্রেপ্তার হওয়ার পর বলেছিলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকার ওকে গ্রেপ্তার করতে চায়নি।’’ মাওবাদীদের হটিয়ে রামগড়ে যৌথবাহিনীর পদার্পণের পর মানুষের উচ্ছ্বাসকে বলেছিলেন, ‘‘সব নাটক।’’ লালগড়ের সভায় ছত্তিশগড়ের জঙ্গলে মাওবাদী শীর্ষনেতা আজাদের মৃত্যুর সমালোচনা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জিই, তখন তিনি রেলমন্ত্রী। মাওবাদীদের প্রকাশ্য সংগঠন পুলিশি সন্ত্রাসবিরোধী জনসাধারণের কমিটির মুখপত্র ছত্রধর মাহাতোর সঙ্গে একমঞ্চে সভা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি — লালগড়ে। সেই সভায় মাওবাদীদের লাগাতার সি পি আই (এম) কর্মীদের খুন, জঙ্গলমহল থেকে পুলিশকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টাকে ‘দ্বিতীয় আদিবাসী বিদ্রোহ’ যিনি বলেছিলেন, তিনি মমতা ব্যানার্জিই। এমন উদাহরণ আরও অনেক আছে। 
এদিন সেই আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক দিবস ছিল। কিন্তু আদিবাসীরা এবং জঙ্গলমহল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে — তাও এদিন বোঝা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর কথায়। আদিবাসীদের উদ্দেশ্যে তাঁর কাতর আবেদন, ‘‘ভুল বুঝে সরে যাবেন না। অন্য কাউকে ঢুকতে দেবেন না।’’
এদিন মুখ্যমন্ত্রী ঝাড়গ্রাম বিশ্ববিদ্যলয়ের শিলান্যাস করেছেন। বলেছেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে গেলাম।’’ প্রসঙ্গত, ঝাড়গ্রামের ৯টি কলেজ এখন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যলায়ের অধীন। তাহলে কী ওই ৯টি কলেজ নিয়ে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় হবে? স্পষ্ট করা হয়নি এদিন সরকারি প্রকাশ্য জনসভা থেকে। এরজন্য ২৭.০২ একর জমি অবশ্য সরকারি জমি অবশ্য চিহ্নিত হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছে —‘অলচিকি ভাষাসহ কলা বিভাগ’ থাকবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে। যদিও অলচিকি কোনও ভাষা নয়। একটি হরফ। এছাড়া এদিন মুখ্যমন্ত্রী ‘অলচিকি পড়ানোর’ চারটি স্কুল চালুর ঘোষণা করেছেন। তার দুটি বাঁকুড়ার খাতরায়। বাকি দুটি ঝাড়গ্রামে। ২০০জন ‘অলচিকির’ শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও ‘দিয়ে গেছেন’ মুখ্যমন্ত্রী। আদিবাসীদের প্রতি এত মনযোগ প্রকাশের দিনেও মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘‘আমাদের সিধু-কানু-ডহরের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করতে হবে।’’ কিন্তু ‘ডহর’ মানে পথ, কোনও ব্যক্তির নাম নয় — তিনি মনে রাখতে পারেননি।

এদিনের সভায় শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি, পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement