উদ্বাস্তু নাগরিকদের স্বীকৃতির
দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই

কনভেনশনে বিমান বসু

উদ্বাস্তু নাগরিকদের স্বীকৃতির<br>দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১৪ই আগস্ট— এরাজ্যেও নাগরিকপঞ্জির কাজ শুরু হলে তখন বহু নাগরিককে তাড়ানোর ষড়যন্ত্র শুরু হবে। প্রশ্ন হলো, নাগরিকদের রক্ষার দায়িত্ব কার? মঙ্গলবার কৃষ্ণপদ মেমোরিয়াল হলে উদ্বাস্তুদের কনভেনশনে এই প্রশ্ন তুললেন রাজ্য বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। তিনি বললেন, দীর্ঘ অতীতজুড়ে যে বসতি গড়ে উঠেছে তার স্বীকৃতির দায়িত্ব খোদ সরকারের।
আসাম প্রসঙ্গেই এদিন বসু বললেন, যদি ভাষার ভিত্তিতে আজ নতুন করে নাগরিকত্ব খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়, তাহলে সর্বনাশ হবে। দেশের সম্প্রীতি নষ্ট হবে। সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই কনভেনশনে রাজ্য বিধানসভার বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বললেন, রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার শুধু উদ্বাস্তুদের বসবাসের জমির পাট্টা দেওয়া নয়, তার সঙ্গেই বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে যে খেতমজুর শ্রম ঢালতো তাঁদের সেই জমির ফসলের অধিকার দিয়েছিল বর্গা রেকর্ডের মাধ্যমে। জাতীয় নাগরিকপঞ্জির নামে আসামে বাংলা ভাষাভাষী এবং অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষদের বিতাড়নের বিরুদ্ধে এবং রাজ্যে গণতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষার আহ্বান জানিয়ে এদিন কনভেনশনের আয়োজন করে সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদ। প্রায় তিনশো উদ্বাস্তু নাগরিক অংশ নেন এই কনভেনশনে। মঙ্গলবার কনভেনশন শেষে এই উদ্বাস্তু নাগরিকরাই কৃষ্ণপদ ঘোষ মেমোরিয়াল হল থেকে বেরিয়ে কাইজার স্ট্রিট পর্যন্ত এক সুসজ্জিত পদযাত্রা সংগঠিত করেন।
এদিন বিমান বসু বললেন, কারোর দয়ার ওপর দাঁড়িয়ে নেই নাগরিকদের বাসস্থানের সমস্যা, নাগরিকত্ব আইনসিদ্ধ করার প্রশ্ন। যে দাবি এখনও আদায় হয়নি, তা আদায় করতে হবে লড়াই আন্দোলন করেই। আজকের প্রজন্ম জানে না কোন দীর্ঘ লড়াই আন্দোলনের পথ পেরিয়ে সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদ আজ এই জায়গায় এসেছে। শুধু কনভেনশন করলেই হবে না, আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখনও আদায় না হওয়া দাবির লড়াই লড়তে হবে। তিনি বললেন, এমন একটা কঠিন সময় আজ যখন বাংলা বনাম আসামের লড়াই বাঁধানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। কিন্তু এরাজ্য ছাড়াও বহু রাজ্যেই তো বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছেন। ধর্মের নিরিখে, বর্ণের নিরিখে, ভাষার নিরিখে পরষ্পরের বিরুদ্ধে বিভাজন, দাঙ্গা বাঁধানোর খেলা শুরু হয়েছে। সতর্ক থেকে আমাদের আন্দোলন সংগ্রামে শামিল হতে হবে।
উদ্বাস্তুদের লড়াই আন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রসঙ্গেই তিনি বললেন, ১৯৫৪সালে দেশ যখন স্বাধীন তখন এরাজ্যে নদীয়ার কল্যাণীতে এ আই সি সি-র অধিবেশন বসেছিল। অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন জওহরলাল নেহরুও। এখানেই উদ্বাস্তুরা গণডেপুটেশান দিতে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁদের দাবিসনদ নেওয়া দূরের কথা, গুলি চালিয়েছিল উদ্বাস্তুদের ওপর। ৭জন উদ্বাস্তুকে শহীদের মৃত্যুবরণ করতে হয় সেই ঘটনায়। বিমান বসু বললেন, কেন্দ্র এবং এরাজ্য কোন সরকারই উদ্বাস্তুদের জন্য কিছু করতে চায় না। বামফ্রন্ট সরকারের মেয়াদে থাকলেও এখন এরাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তরটাই তুলে দিয়েছে। একইরকম দিল্লিতে এখন আর উদ্বাস্তুদের কোন দপ্তরই নেই। তাই দিল্লির সরকারের কানেও জল ঢোকাতে হবে।
মঙ্গলবার কনভেনশনে বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বললেন, এই বিশ্বে সকলেই উদ্বাস্তু। কেননা মানব জাতিটাই এক চলমান জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। যাঁরাই কমপক্ষে পাঁচ বছর বসবাস করছেন, তাঁরাই নাগরিক অধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। এই উদ্বাস্তুদের মধ্যেও বিভাজন তৈরির লক্ষ্যে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কে হিন্দু আর কে মুসলমান। তিনি বললেন, আইনি লড়াই তো থাকবে। কিন্তু মাঠের লড়াইটাও জারি রাখতে হবে। এদিন কনভেনশনে গণআন্দোলনের নেতা সুমিত দে বললেন, এরাজ্যে ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটা প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। আসলে তৃণমূল এবং বি জে পি দুই শক্তিই মানুষকে ভাগ করার খেলায় নেমেছে। জনগণনায় দেখা গিয়েছে গোটা দেশে যে হারে জনসংখ্যা বেড়েছে তার তুলনায় আসামের বুকে অনেক কম জনসংখ্যা বেড়েছে। অথচ এখন সেখানেই অনুপ্রবেশকারী ধুয়ো তুলে নাগরিক অধিকার কাড়ার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। এদিন কনভেনশনে সভাপতিত্ব করেন জীবন ভট্টাচার্য। মূল প্রস্তাব পেশ করেন সাধারণ সম্পাদক মধু দত্ত। কনভেনশনে সাংগঠনিক প্রতিবেদন পেশ করেছেন নিরঞ্জন মজুমদার। কনভেনশন শুরুর সময়ে কমরেড সোমনাথ চ্যাটার্জির প্রতি শোকজ্ঞাপন করা হয়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement