অধরা স্বপ্নপূরণে
শপথ শ্রমজীবীদের

কথা গান কবিতায় রাতভর স্বাধীনতা উদ্‌যাপন

অধরা স্বপ্নপূরণে<br>শপথ শ্রমজীবীদের
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১৪ই আগস্ট— স্বাধীন হয়েছে দেশ। বেড়েছে স্বাধীনতার বয়স। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সীমাহীন দারিদ্র, বেকারি। বেড়েছে দেশের সম্পদ সৃষ্টিকারী শ্রমজীবী মানুষের উপর শোষণ। স্বাধীনতার যে লক্ষ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে ছিলেন শালপ্রাংশু ব্যক্তিত্বরা, স্বাধীনতার যে লক্ষ্যে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন শ্রমিক কৃষকরা, স্বাধীনতার সেই স্বপ্ন আজও অধরা। জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য তীব্র করো শ্রমিক কৃষকসহ সমাজের সব অংশের খেটে খাওয়া, নিপীড়িত মানুষের সংগ্রাম। স্বাধীনতা দিবসের আগের বিকাল থেকে সন্ধে গড়িয়ে রাত। কথায় গানে কবিতায় নাটকে নীতি বদলানোর লড়াই তীব্র করার আহ্বান উঠে এল মঙ্গলবার সি আই টি ইউ-র ‘সামুহিক জাগরণ’-র মঞ্চে। সারা দেশের সঙ্গে মঙ্গলবার রাত জাগলেন এরাজ্যের শ্রমজীবী মানুষেরা ধর্মতলায় লেনিন মূর্তির সামনে। এদিনের ‘সামুহিক জাগরণ’ কর্মসূচির উদ্বোধন করে সি আই টি ইউ-র সর্বভারতীয় নেতা শ্যামল চক্রবর্তী বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছিল কৃষকদের, শ্রমিকদের অসংখ্য আন্দোলন। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন কৃষক, শ্রমজীবী। কৃষকদের নিজেদের দাবি যুক্ত হয়েছিল উপনিবেশবাদ বিরোধী লড়াইয়ে। স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছিলেন কমিউনিস্টরা, বামপন্থীরা। অথচ তাঁদের বিরুদ্ধেই এখন তকমা সাঁটা হচ্ছে ‘দেশদ্রোহিতার’, মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায়, পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইতে সামনের সারিতে ছিলেন কমিউনিস্টরা। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগেও ভগৎ সিং পড়ছিলেন লেনিনের বই। পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিও প্রথম তুলেছিলেন কমিউনিস্টরা। নেতাজী, গান্ধীজীরা যে স্বাধীন ভারতের পরিকল্পনা করেছিলেন সেই পরিকল্পনার অংশ যেমন ছিল কৃষির বিকাশ, তেমনি শিল্পের জাতীয়করণ। অথচ স্বাধীনতার পর একের পর এক সরকার কৃষক, শ্রমিকের স্বার্থ না দেখে পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। শ্যামল চক্রবর্তী বলেন, স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন ছিল সবার জন্য শিক্ষা, সবার জন্য কাজ, গণতান্ত্রিক অধিকার। অথচ আজকে মোদী সরকার সেই ধারণার মূলে আঘাত তীব্র করছে। গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর যখনই আক্রমণ এসেছে মানুষ প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন। ইন্দিরা গান্ধীও ছাড় পাননি, আজ মোদী সরকার ফ্যাসিবাদ কায়েম করার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর আক্রমণ শানাচ্ছে। মোদী সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই প্রয়োজন। কর্ণাটকের নির্বাচনে যেভাবে বিরোধী শক্তিরা এক হয়ে বি জে পি-কে আটকেছে, সেভাবে মোদী সরকারকে হারাতেই হবে খানিকটা দম ফেলার জন্য। মোদী সরকারকে হারালেই স্বাধীনতার লক্ষ্য পূরণ হবে না। কিন্তু সেই লক্ষ্যে নতুন উদ্যমে লড়াই করা যাবে। মমতা চাইছেন বিরোধীদের ঐক্য ভেঙে মোদী সরকারকে সুবিধা করে দিতে, চক্রবর্তী কটাক্ষ করে বলেন মমতার ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ আসলে ‘ফলিডল ফ্রন্ট’। সি আই টি ইউ-র পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনাদি সাহু বলেন, স্বাধীনতার ৭১টি বছর পেরিয়েও দেশের ৮৩শতাংশ মানুষের সম্পদ কুক্ষিগত রয়েছে ১শতাংশ মানুষের হাতে। এখনও দেশের ২৫শতাংশ মানুষ অনাহারে অভুক্ত অবস্থায় রাত কাটাতে বাধ্য হন। একের পর এক শাসকশ্রেণির দেশ চালিয়েছে দেশ, শ্রমিকরা কৃষকরা নিরন্তর বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু বলেছিলেন, কালোবাজারিদের ল্যাম্পপোস্টে ঝোলানো হবে, একজন কালোবাজারিরও শাস্তি হয়নি। আজও কালোবাজারিরাই দেশের সম্পদ লুট করছে। কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে, কালোবাজারি অসাধু বৃহৎ ব্যবসায়ীদের ঋণ মুকুব হচ্ছে। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক প্রতিশ্রুতি বিলিয়েছিল। অথচ গত চার বছরে কৃষক ফসলের দাম পাননি, কৃষিঋণ মুকুব হয়নি, কৃষকদের আত্মহত্যার মিছিল অব্যাহত, বছরে দুকোটি বেকারের কাজ হওয়া তো দূর, কাজ হারাচ্ছেন দেশের মানুষ। নয়া উদারনীতির যে পথে কংগ্রেস সরকার হেঁটেছিল, সেই পথেই আরও আগ্রাসী ক্ষিপ্রতায় হাঁটছে মোদী সরকার। চলছে রাজ্যেও তৃণমূলের নেতৃত্বে নৈরাজ্য, দুঃশাসন। মোদী সরকার যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বেসরকারিকরণ করছে, একই কাজ করছে মমতা সরকার। শুধু মোদী মমতার বিরুদ্ধে লড়াই না, সি আই টি ইউ-র নেতৃত্বে শ্রমিকশ্রেণির দায়িত্ব দেশের শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে দুই সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে প্রকৃত স্বাধীনতার লড়াইকে শক্তিশালী করা। এদিনের কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়ে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন অন্যান্য কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির নেতৃত্ব। এ আই সি সি টি ইউ-র পক্ষে অতনু চক্রবর্তী, টি ইউ সি সি-র পক্ষে উজ্জ্বল ব্যানার্জি, এ আই টি ইউ সি-র পক্ষে বাসুদেব গুপ্ত সংহতি জানান। ‘সামুহিক জাগরণ’-কে সংহতি জানিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন মন্দাক্রান্তা সেন, গান গেয়ে শোনান কল্যান সেন বরাট। সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট নাট্যকার চন্দন সেন, বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য, ভারতী মুৎসুদ্দি, বিশিষ্ট সাহিত্যিক কিন্নর রায়, মানবাধিকারকর্মী অম্বিকেশ মহাপাত্র, অরুণাভ গাঙ্গুলি, ক্রীড়াবিদ জ্যোতির্ময়ী শিকদার প্রমুখ। অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন এ আই ডি ডব্লিউ এ-র রাজ্য সম্পাদিকা কনীনিকা ঘোষ। সমর্থন সংহতি জানান খেতমজুর আন্দোলনের নেতা তুষার ঘোষ, কৃষক আন্দোলনের নেতা মদন ঘোষ, বামফ্রন্টের পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী, সাংসদ মহম্মদ সেলিম, গণআন্দোলনের নেত্রী মিনতি ঘোষ, ব্যাঙ্ক কর্মচারী আন্দোলনের নেতা জয়দেব দাশগুপ্ত, ১২ই জুলাই কমিটির আহ্বায়ক সমীর ভট্টচার্য প্রমুখ। এদিনের মঞ্চ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয় শাসকের বিরুদ্ধে দাবি আন্দোলনের লড়াইতে জয়ী হওয়া প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের আন্দোলনকারীদের। বিকাল পাঁচটায় সি আই টি ইউ-র রক্তপতাকা উত্তোলন করে কর্মসূচির সূচনা করেন সি আই টি ইউ-র পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সভাপতি সুভাষ মুখার্জি। বিকাল থেকে রাত। শ্রমজীবী মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার লক্ষ্যে আন্দোলনের শপথ নিয়েছেন রাত জেগে। রাত ভোর ধর্মতলায় কখনো গান গেয়েছেন, কখনো নৃত্য পরিবেশন করেছেন আদিবাসী লোকশিল্পীরা। আবৃত্তিতে গলা মিলিয়েছেন, গানে গানে উত্তাল হয়েছেন রাত জাগা মানুষ। ঘড়ির কাঁটায় যখন মধ্যরাত, ঘড়ির কাঁটায় যখন ঠিক বারোটা পাঁচ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন সি আই টি ইউ-র রাজ্য সভাপতি সুভাষ মুখার্জি। রাত পেরিয়ে বুধবারের ভোর। আরও একটি স্বাধীনতা দিবস। এবার আর নিয়ম মেনে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, সাচ্চা স্বাধীনতার জন্য যে স্বপ্ন দেখেছিলেন মানুষ, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য শপথ নিয়েছেন এরাজ্যের শ্রমজীবী মানুষ। কলকাতা ছাড়াও এরাজ্যে দুর্গাপুর ও মালদহে পালিত হয়েছে ‘সামুহিক জাগরণ’ কর্মসূচি।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement