ধর্মঘট মিটতেই মামলা
চা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে

দেওয়া হচ্ছে জামিন অযোগ্য ধারা

ধর্মঘট মিটতেই মামলা<br>চা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে
+

নিজস্ব সংবাদদাতা : শিলিগুড়ি, ১৪ই আগস্ট— ধর্মঘট মিটতেই জামিন অযোগ্য ধারা দিয়ে চা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা করছে মমতা ব্যানার্জির পুলিশ।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে পাহাড়ের চা শ্রমিকদেরই প্রথম জড়ানো হলো মামলায়। এবারে পাহাড়ে চা ধর্মঘটের কর্মসূচিই ছিল না জয়েন্ট ফোরামের। পাহাড়কে ধর্মঘটের আওতার বাইরে রেখেই ৭ই আগস্ট থেকে ৭২ঘণ্টার চা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল জয়েন্ট ফোরাম। কিন্তু ন্যূনতম মজুরির দাবিতে মিরিক, সোনাদা, সুখিয়াসহ পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় কাজে যোগ না দিয়ে ধর্মঘটে শামিল হয়ে গিয়েছিলেন চা শ্রমিকরা। তাই এবার সরকার আক্রমণের লক্ষ্য হিসাবে প্রথমেই বেছে নিয়েছে পাহাড়কে।
এদিনই নবান্ন থেকে মমতা ব্যানার্জি নাগরিক পঞ্জি নিয়ে আসামের বি জে পি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘ওখানে এন আর সি-র বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেই জেলে ভরে দেওয়া হচ্ছে। সুপার এমারজেন্সি জারি করা হয়েছে। সাংবাদিকরা পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। লোকাল চ্যানেলকে ভয় দেখিয়ে একতরফা প্রচার করাচ্ছে।’ আসামের বি জে পি সরকার যা করছে এরাজ্যেও সরকারের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে আন্দোলন করলে একই পরিণতি মুখে পড়তে হচ্ছে আন্দোলনকারীদের। 
ভারতীয় দণ্ডবিধির ৫০৫(বি) ধারার সঙ্গে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার ১২০(বি) ধারায় চা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পাহাড়ের পুলিশ। জয়েন্ট ফোরামের আওতায় থাকা সব ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে সাধারণ চা শ্রমিক এমনকি ধর্মঘটের প্রতি সংহতি জানানো শিক্ষকের বিরুদ্ধেও মামলা সাজিয়েছে পুলিশ। 
সোনাদা, মিরিক থানা থেকে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলায় জড়িয়ে ফেলার খবর পেয়ে স্তম্ভিত পাহাড়ের চা শ্রমিক নেতারা। পাহাড়ের জয়েন্ট ফোরামের আহ্বায়ক জি এন এল এফ দলের শ্রমিক সংগঠনের নেতা জিত বাহাদুর তামাঙ্গ টেলিফোনে প্রশ্ন তোলেন,‘আমাদের লড়াই তো সরকারের বিরুদ্ধেও নয়, পুলিশের বিরুদ্ধেও নয়। আমাদের দাবি বাগান মালিকের বিরুদ্ধে। মালিকের বিরুদ্ধে চা শ্রমিকদের এই লড়াইয়ে সরকার কেন নিজেদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছে।’ 
সোনাদা থানার পুলিশ জন আন্দোলন পার্টির অমর লামা, জি এন এল এফ-এর জিত বাহাদুর তামাঙ্গ, লোকমান খাওয়াস, সি পি আর এম দলের শ্রমিক সংগঠনের নেতা প্রণয় শেরপা, সুনীল রাই, সি আই টি ইউ নেতা সমন পাঠক, তিলক রাই, গোর্খা লিগের লক্ষণ প্রধান, চা শ্রমিক রুপেশ রাই, শিক্ষক ভূপেন্দ্র ছেত্রীসহ মোট ১১জনের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা সাজিয়েছে। জয়েন্ট ফোরামের আহ্বায়ক জিয়াউল আলম জানান,‘ন্যূনতম মজুরি, বন্ধ বাগান খোলাসহ একাধিক দাবি দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য সরকারের কাছে পড়ে আছে। সরকার অবান্তর দমনমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে চা শ্রমিকদের দাবির প্রতি নজর দিক।’
কী ঘটেছিল সেদিন সোনাদায়?
গত ৯ই আগস্ট ছিল ধর্মঘটের শেষদিন। ওইদিনই সোনাদা ভ্যালির মুনডা, বাঁশঘেরি, রঙমুখ, সিডার ওকস চা বাগান থেকে শয়ে,শয়ে চা শ্রমিক কাজ বন্ধ করে বেরিয়ে পড়েন বাগান থেকে। চড়াই-উৎরাই পথে ১৫কিমি হেঁটে চা শ্রমিকরা জড়ো হন সোনাদায়। জাতীয় সড়কে ওঠার পর পুলিশ পথ আটকায়। শ্রমিকদের দাবি, তাঁরা উত্তরকন্যা যাবেন। ওখানে গিয়ে ধরনায় বসবেন। 
পুলিশের বাধার মুখে পড়ে সোনাদা বাজারেই শেষ পর্যন্ত সভা করেন চা শ্রমিকরা। ‘সেদিন অনেক দূর, দূর পাহাড়ি এলাকার পথ পার করে কয়েক হাজার চা শ্রমিক সোনাদায় এসে জড়ো হয়েছিলেন। সবার একটাই কথা, উত্তরকন্যা যাবে। পুলিশ রাস্তা আটকালে ওখানেই বসে সভা শুরু হয়ে যায়। পাঁচ ঘণ্টা ধরে সেদিন সভা হয়েছিল।’ বলছিলেন চিয়াকামান মজদুর ইউনিয়নের সভাপতি সমন পাঠক। 
স্রেফ এই ঘটনার পরই পুলিশ চা শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার ধারা দিয়ে মামলা করছে। 
ধর্মঘট ভাঙতে এরাজ্যে পুলিশের সক্রিয়তা নতুন কোনও বিষয় নয়। এরআগেও চা বাগানে ধর্মঘট ভাঙতে সরাসরি অংশ নিয়েছিল রাজ্য প্রশাসন। গত বছরই ১২ই জুন থেকে ৪৮ঘণ্টার চা ধর্মঘটের সময় মমতা ব্যানার্জি ধর্মঘটকে বেআইনি বলেছিলেন। গতবারও ধর্মঘটী চা শ্রমিকদের আদালতের সমন ধরিয়ে মিথ্যা মামলা সাজিয়েছিল পুলিশ। আদালতে উপস্থিত হয়ে সেবার জামিন নিতে হয়েছিল অনাহার পীড়িত চা শ্রমিকদের। 
জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা নিয়ে জয়েন্ট ফোরাম তার পরবর্তী বৈঠকে অবস্থান ঠিক করবে বলে জানা গেছে। তবে পাহাড়ের চা শ্রমিকনেতা জিত বাহাদুর তামাঙ্গ জানিয়ে দিয়েছেন, পুলিশ আমাদের ধরতে এলে থানা ঘিরে রাখবেন চা শ্রমিকরা।’
 
 

 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement