সর্বশিক্ষার টাকায় স্কুল কিনেছে
‘জীবন-পিয়াসা’, ‘ঘুম হয় না’

সর্বশিক্ষার টাকায় স্কুল কিনেছে<br> ‘জীবন-পিয়াসা’, ‘ঘুম হয় না’
+

রণদীপ মিত্র : সিউড়ি ১৩ই সেপ্টেম্বর— সর্বশিক্ষা অভিযানের বরাদ্দ এসেছে। সেই বরাদ্দে স্কুলের জন্য কিনতে হবে বই। কোন প্রকাশকের থেকে বই কেনা যাবে, তারও নির্দেশ ছিল সরকারের পক্ষ থেকে। তার জন্য জেলায় জেলায় চলছে দুই দিনের ‘বইমেলা।’ বীরভূমেও হয়েছে। সর্বশিক্ষা অভিযানের টাকায় কী বই কেনা হয়েছে? সদর সিউড়ির এক স্কুল কিনেছে ‘ঘুম হয় না’ শীর্ষক একটি বই। প্রচ্ছদে রয়েছে রাতের পোশাক পরিহিত সুন্দরী এক মহিলার ঘুমন্ত ছবি। বইয়ের ভেতরে একটি লাইন, ‘‘...রমণী স্পর্শ অনেক সময় অর্থ দিয়ে কেনা যায়, কিন্তু অর্থ দিয়ে ঘুমের ছায়া পর্যন্ত দেখা যায় না...।’’ সদর পশ্চিম চক্রের স্কুলে এসে পৌঁছেছে ‘দহন’ শীর্ষক একটি বই। লেখক বিমলচন্দ্র গড়াই। তার প্রচ্ছদে রয়েছে আলিঙ্গনবদ্ধ নারী-পুরুষের ছবি। নাম ও প্রচ্ছদ দেখে বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না, গল্পের বইটির বিষয়বস্ত কী। আবার তৃণমূলের এক শিক্ষক নেতা জানিয়েছেন, তাঁর কেনা বইগুলির মধ্যে দু’টি বই রয়েছে, যার নাম ‘জীবন-পিয়াসা’ ও ‘হলিউড জমানা’। লেখক যথাক্রমে নির্মলকুমার গঙ্গোপাধ্যায় ও মৃণালকান্তি দাস। আরও আছে যেমন দেবদাস। রয়েছে গৌতম ভট্টাচার্যের লেখা বাংলার চলচ্চিত্রের অভিনেতা প্রসেনজিতের আত্মজীবনী ‘বুম্বাদা শট রেডি’। সরকারি বরাদ্দে স্কুলে স্কুলে লাইব্রেরিগুলিকে সমৃদ্ধ করার জন্য কেনা বইয়ের এই তালিকা স্বাভাবিকভাবেই হতবাক শিক্ষা মহল! তাতে কী। বিক্রেতারা বেজায় খুশি। কারণ কোটি টাকার কাছাকাছি বই বিক্রি হয়েছে মাত্র দু’ দিনে। চড়া দামে। কিন্তু যাঁরা ক্রেতা, সেই শিক্ষক শিক্ষিকাদের অভিজ্ঞতা কী? কোনও শিক্ষক হয় তো ইচ্ছা করেই কিনেছেন। অনেকে আবার চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি এড়াতে বরাদ্দ টাকা খরচের তাগিদে হাতের কাছে যা পেয়েছেন, তা-ই তুলে এনেছেন। আবার স্কুল পড়ুয়াদের জন্য বই কেনার স্বার্থে হওয়া বইমেলায় রুচিহীন পুস্তকের সমাহারই শুধু নয়, শিক্ষকদের অনেককেই তাজ্জব হতে হয়েছে দাম নিয়েও। এক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষকের কথায়, ‘‘কেনা বইটির আসল দাম ছাপা রয়েছে ৬৫ টাকা। দামের উপর স্টিকার লাগানো আছে ৯৫ টাকার। স্টিকারটি তুলতেই বেরিয়ে এসেছে এই জালিয়াতি।’’ সম্প্রতি রাজ্য সর্বশিক্ষা অভিযান এবং রাষ্ট্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অভিযানের পক্ষ থেকে রাজ্যের প্রত্যেকটি স্কুলে বই কেনার জন্য টাকা বরাদ্দ হয়েছে। বরাদ্দের সেই টাকা ‘সদ্ব্যবহার’-এর জন্য জেলায় জেলায় হচ্ছে বইমেলা। বীরভূমে হয়েছে গত ১০ ও ১১ই সেপ্টেম্বর। বোলপুরে শ্রীনন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ছয়-সাতটি ঘর নিয়ে তাতে বেঞ্চ পেতে হয়েছে এই ‘বইমেলা’! এখান থেকেই স্কুলগুলি বাধ্য থাকবে বই কিনতে। এই মর্মে রাজ্যের নির্দেশ মোতাবেক বীরভূম জেলাতেও জারি হয়েছিল নির্দেশিকা (মেমো নম্বর ৪৬(৩২)/লাইব্রেরি গ্রান্ট/এসএসএ/বীরভুম, তারিখ- ৩১.৮.১৮)। সর্বশিক্ষা অভিযান দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সমস্ত স্কুলকে বই কেনার জন্য অনুদান দেওয়া হবে। প্রাথমিক স্কুল পিছু তিন হাজার, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলগুলির জন্য দশ হাজার এবং মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলগুলির জন্য পনেরো হাজার টাকা করে। শুধু বীরভূমের ক্ষেত্রে ৩৭৬১টি স্কুলের জন্য মোট ১ কোটি ৮২ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। গোটা রাজ্যের ক্ষেত্রে পরিমাণ বিশাল। সর্বশিক্ষা অভিযান দপ্তরের এক কর্তা জানিয়েছেন, ‘‘রাজ্যস্তরে শিক্ষা দপ্তরের শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই বাছাই করা প্রকাশকদের বরাত দেওয়া হয়েছে জেলায় জেলায় বই বিক্রির। সেই মতোই প্রকাশকরা বোলপুরে এসে বই বিক্রি করেছেন।’’ রাজ্যের জারি করা নির্দেশে দেখা গিয়েছে, পাঁচটি প্রকাশক সংগঠনের ঠিক করে দেওয়া প্রকাশকরাই বই বিক্রি করবে মেলায়। সেই মোতাবেক মাত্র দুই দিনের বইমেলায় বিপুল পরিমাণ স্কুলের শিক্ষকরা বই কিনতে এসে ঠেলাঠেলি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি বাদ যাননি কোনও কিছু থেকেই। বিরক্ত, ক্ষুব্ধ শিক্ষকদের একটা বড় অংশই অসন্তোষের সঙ্গে জানিয়েছেন, ‘‘বাছবিচারের সুযোগ পাইনি। নিয়ম রক্ষা করেছি শুধু। আদৌ এই বই স্কুল পড়ুয়াদের কোনও কাজে লাগবে কি না, জানি না। প্রকাশকদের সঙ্গে গোপন আঁতাতেই বইমেলার নামে মোটা অঙ্কের হাতবদল হয়েছে বুঝতে বাকি নেই কারও।’’ শুধু বীরভূম বলে নয়, গোটা রাজ্যের প্রতিটি জেলাতেই চিত্র কমবেশি একই। রামপুরহাটের এক প্রবীণ শিক্ষক জানিয়েছেন, ‘‘এভাবে বই বিক্রি করে লাভ কার? একে তো এমন বই ঠাঁই পেয়েছে মেলায়, যা কোনও মতেই পড়ুয়াদের উপযোগী নয়। তার উপর মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি শতাংশ ছাড় দিয়েছে মেলায়। এই ছাড় তো আমরা জেলার যে কোনও দোকানেই পেতাম। বরং দশটা দোকান ঘেঁটে ক্লাস অনুযায়ী সাযুজ্য রেখে অনেক ভাল বই কিনতে পারতাম।’’ এ ব্যাপারে নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির রাজ্য সম্পাদক সমর চক্রবর্তী ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন, ‘‘কেন সরকারের ঠিক করে দেওয়া প্রকাশকদের কাছ থেকেই বই কিনতে বাধ্য করা হবে? এ তো চাপিয়ে দেওয়া। তার উপর কী করে স্কুলের লাইব্রেরি ভরানোর বইমেলায় প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বই স্থান পাবে? সরকারের আরও পরিচ্ছন্ন হওয়া দরকার। বই বিক্রির এমন পরিকল্পনা নিশ্চিতভাবেই সন্দেহর জন্ম দিয়েছে শিক্ষক মহলে।’’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement