জেলা আছে, মহকুমা নেই
সবজি আছে, বাজার নেই

জেলা আছে, মহকুমা নেই<br>সবজি আছে, বাজার নেই
+

জয়ন্ত সাহা: আলিপুরদুয়ার ১৩ই সেপ্টেম্বর- দাবি আদায়ের ঠিকানা রাস্তা। অধিকার কেড়ে নিতে হয়। অধিকার কেড়ে নেওয়ার লড়াই চলছে এখন বীরপাড়া, জটেশ্বর, ফালাকাটা, শালবাড়ির প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে। এসব এলাকায় এক অফুরান সবুজের সমাহিত প্রশান্তি। আপাত-শান্ত ডুয়ার্স। কিন্তু এর আড়ালেই লুকিয়ে শাসকের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ আর ঘৃণা। চা বাগিচা এলাকায় ক্ষোভ যেন এখন আগ্নেয়গিরির মত। যে কোন মুহূর্তে উগরে দেবে জ্বলন্ত লাভা! সারাদিন কাজ করে দিনের শেষে হাতে মেলে ১৬৯ টাকা। দিনভর কঠিন মেহনত এখানে বিকোয় জলের দরে। যখন মালিকের খামখেয়ালিপনায় লকআউটের নোটিস ঝোলে তখন সেটুকুও মেলে না। চা বাগিচা শ্রমিক নেতা রবীন রাই বলছেন, আমরা দাবি করছি, সরকারের নির্ধারিত হাজিরা দিতে মালিককে বাধ্য করুক সরকার।দিন-প্রতিদিন এমন চড়া বঞ্চনার শিকার শ্রমিকরা তাই এখন অধিকার যাত্রার পদযাত্রীদের কাছে নিজেদের যন্ত্রণার কথা ক্ষোভের কথা উগরে দিচ্ছেন। পদযাত্রায় পা মিলিয়ে হাঁটছেনও কিছুটা। এগিয়ে দিচ্ছেন লড়াইয়ের সহযোদ্ধাদের। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতেই মজুরির বঞ্চনা যে মালিক আর রাজ্য সরকারের অশুভ আঁতাতের ফসল সেটাই বুঝিয়ে দিলেন চা বাগান শ্রমিক সোমরাও সাহানী। আলিপুরদুয়ার জেলা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশা কি মিটেছে মানুষের? মুজনাই বাসস্ট্যান্ডে তখন চলছে অধিকার যাত্রার পথসভা। হেদায়েত নগরের এম এ পাশ যুবক একটু দূরে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শুনছিলেন। অবিনাশ অধিকারির সাথে আলাপ জুড়তেই বললেন, গোটা রাজ্যে বুঝি আলিপুরদুয়ার একমাত্র জেলা, যার কোনও মহকুমা নেই। গ্রাম পঞ্চায়েত এর পর একেবারে জেলা। মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েই চুপ করে গেছেন। এখানেই ছোট হোটেল চালান নরেন অধিকারি। ছেলে তপন অধিকারি ইংরেজিতে এম এ করে বাড়িতে বসে আছে। তিনিই জানালেন, এখানকার বেলতলি, দেঁওগা, প্রমোদনগর প্রভৃতি এলাকায় প্রচুর সবজি চাষ হয়। অথচ বাজার কোথায়? ভরসা জটেশ্বর সুপার মার্কেট। সেখানেও জায়গার অভাব। সুরতি নদীর ক্যানেল থেকে কিছু কৃষক সেচের জল পায়। বাকিদের ভরসা সেই প্রকৃতি। জেলা পরিষদ থেকে মন্ত্রী বিধায়ক কেউ আমাদের কথা ভাবে না। অধিকার যাত্রায় শামিল হওয়া কৃষক সভার জেলা সম্পাদক শম্ভু বর্মণ বলেন, এলাকার এসব দাবি নিয়েই আমাদের লড়াই চলছে। জটেশ্বরের পর অধিকার যাত্রা যত ফালাকাটার দিকে এগিয়েছে মিছিল থেকে আওয়াজ উঠছে ফালাকাটাকে গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে পৌরসভায় উন্নীত করতে হবে। অধিকার যাত্রার মিছিলে পা মেলানো রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী যোগেশ বর্মণকে জিজ্ঞেস করতেই জানালেন ২০১১ সালেই মন্ত্রীসভার বৈঠকে ফালাকাটাকে পৌরসভায় উন্নীত করার প্রস্তাব পাশ হয়। এমনকি তৎকালীন রাজ্যপালের স্বাক্ষরও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার আসার পর সেসব চলে গেছে ঠান্ডা ঘরে। জেলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম নেতা মৃণাল রায় বলেন, ফালাকাটার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নীল-সাদা বাড়ি আছে। কিছু যন্ত্রপাতিও এসে বাক্সবন্দি হয়ে আছে। কিন্তু নেই ডাক্তার। আর তাই সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে এখন শুধুই বহির্বিভাগে রোগী দেখা হয়। সকালে যখন মাদারিহাট থেকে অধিকার যাত্রা পথ চলা শুরু করে তখনও আকাশের মুখ ভার। ডালিমপুরে অধিকার যাত্রা পৌঁছাতেই ঝমঝমিয়ে এলো বৃষ্টি। বৃষ্টি কমতেই শুরু হলো পথসভা। এখানেই দেখা হয়ে গেল এস এফ আই জেলা সম্পাদক দীপক বর্মণের সাথে। গত ৯ই আগস্ট জেল ভরো আন্দোলনে পুলিশ মিথ্যা মামলা দিয়ে ১৫ জনকে আটকে রাখে। জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। এতটুকু ভীত নয় ছেলেটি। অধিকার যাত্রা সেরেই শনিবার যাবে কলেজ স্ট্রিটের আন্দোলনে যোগ দিতে। শ্রমিক নেতা রবীন রাই জানালেন, শুধু দীপক নয় ওর সাথে মিথ্যা মামলায় ১৫ দিন জেলে ছিলেন কোহিনুর চা বাগানের ভবানী ওঁরাও, কিরণ কাওয়ার। জেল থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে ফের যোগ দিয়েছেন লড়াই আন্দোলনে। ডুয়ার্সের এই সব এলাকায় এখন হারানো অধিকার ফিরে পেতে চলছে এক মরণপণ লড়াই। অধিকার যাত্রা যে সাধারণ মানুষকে অনেকটাই ভরসা জোগাচ্ছে সেটা বোঝা যায় সবজি বিক্রেতা ৭০ পেরিয়ে যাওয়া নব নগরের নারায়ণ সরকারের সাথে কথা বলেই। পায়ের ব্যথার জন্য জটেশ্বরের স্থানীয় ডাক্তারের কাছে এসেছিলেন চিকিৎসা করাতে। বাসস্ট্যান্ডে সভা হতে দেখেই বসে গেছেন বক্তব্য শুনতে। জিজ্ঞেস করেছিলাম ডাক্তার দেখাবেন না? দেরি হয়ে যাবে তো? নারায়ণ সরকারের জবাব, ডাক্তার তো অন্যদিন দেখানো যাবে। আজ তো সভাটা শুনি। সভা শেষে মিছিলেও হাঁটলেন কিছুটা। । বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অধিকার যাত্রা প্রায় ৫২ কিমি পথ পেরিয়ে গেল। সব মিলিয়ে ৭ সভা করলেন বি পি এম ও-র নেতারা। সভাগুলিতে বক্তব্য রাখলেন বিদ্যুৎ গুন, রবীন রাই, শম্ভু বর্মণ, অরূপ পাকড়াশি, রাজীব দাস, সন্তোষ সরকার প্রমুখ। ফালাকাটার সভায় সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে বক্তব্য রাখেন জলপাইগুড়ির বি পি এম ও নেতা আশিস সরকার। আলিপুরদুয়ার এলাকার শেষ সভা ভুটনিঘাটে। মাদারিহাট থেকে গোটা পথ অধিকার যাত্রার পাশে থাকলেন কৃষ্ণ ব্যানার্জি, মৃণাল রায়, যোগেশ বর্মণের মতো প্রবীণ নেতারা। ঘড়ির কাঁটা তখন ৬টা পেরিয়েছে। অধিকার যাত্রা পৌঁছেছে শালবাড়ির ডুডুয়া নদীর সেতুর কাছে। সেতু পেরিয়েই জলপাইগুড়ি জেলা। কোচবিহার থেকে ১১ই সেপ্টেম্বর অধিকার যাত্রার সূচনা করে সারা দেশের কৃষক আন্দোলনের নেতা হান্নান মোল্লা যে পতাকা তুলে দিয়েছিলেন বি পি এম ও -র কোচবিহারের নেতা মহানন্দ সাহার হাতে এবার সেই পতাকা আলিপুরদুয়ারের বি পি এম ও নেতা বিদ্যুৎ গুন তুলে দিলেন জলপাইগুড়ির নেতা আশিস সরকারের হাতে। এখানকার জোরাপানি এলাকার নতুন শালবাড়ি এলাকায় হলো জলপাইগুড়ির প্রথম সভা। হরিহর বসুনিয়া, রাজকুমার মোদক সহ একাধিক বক্তা বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন তাপস মিত্র। এক জেলা থেকে অন্য জেলার হাতে লড়াইয়ের পতাকা তুলে দেবার সাক্ষী রইলেন জলপাইগুড়ির গণআন্দোলনের নেতা সলিল আচার্য ও মমতা রায়। আলিপুরদুয়ারকে পেছনে রেখে লড়াইয়ে প্রতীক অধিকার যাত্রা তখন এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। ধূপগুড়ির ১ নং ওয়ার্ডের কলেজ মোড়ে অধিকার যাত্রাকে স্বাগত জানালেন সি আই টি ইউ-র রাজ্য সম্পাদক অনাদি সাহু, শ্রমিক নেতা জিয়াউল আলম, সুভাষ রায়। এখানে সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য রাখেন সি আই টি ইউ রাজ্য সম্পাদক অনাদি সাহু। এরপর মিছিল এগিয়ে গেছে কলেজ রোডের ফালাকাটা বাস স্ট্যান্ডে। রাত বেড়েছে তবুও লড়াই থেমে নেই, সেখানে তখন সভা শুরু হয়েছে। এখানে বক্তব্য রাখেন সলিল আচার্য ও জিয়াউল আলম। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রাণগোপাল ভাওয়াল। রাত পোহালে জলপাইগুড়িতে ফের শুরু হবে অধিকার যাত্রা। মিছিল আবার এগিয়ে যাবে কৃষি বলয় ছেড়ে চা-বাগিচা এলাকায়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement