মোদী সরকার গোটাচ্ছে রাজ্যের কেন্দ্রীয় সংস্থা্
একই নীতিতে পথ হেঁটে নীরব মমতার সরকার

মোদী সরকার গোটাচ্ছে রাজ্যের কেন্দ্রীয় সংস্থা্<br>একই নীতিতে পথ হেঁটে নীরব মমতার সরকার
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১৩ই সেপ্টেম্বর— চিট ফান্ড এবং অন্যান্য প্রতারণার ঘটনায় কেন্দ্রীয় সংস্থা সি বি আই-র তৎপরতা সামান্য বাড়লে রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, নির্যাতনের ওজর ওঠে সোচ্চারে। কিন্তু মোদী সরকার চুপিসাড়ে পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে একে একে গুটিয়ে ফেলার দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও তা নিয়ে মুখে কুলুপ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর। রাজ্যে তৃণমূল সরকারের মেয়াদেই ধাপে ধাপে পশ্চিমবঙ্গে চালু ১৭টি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ৬৫৮ শতাংশ শেয়ার চোরাগোপ্তা বিক্রিবাট্টা হয়ে গেছে। অথচ তৃণমূল সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রির এমন কেন্দ্রীয় সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় একলাইন বিবৃতিও আজ পর্যন্ত হাজির করতে পারেনি। এই ১৭টি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মধ্যে রয়েছে আই বি পি কোম্পানি লিমিটেড, যার একশো শতাংশই বিক্রি হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের বুকে এখনও টিকে থাকা এমন ১৭টি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মধ্যে রয়েছে জেসপ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, লগন জুট মেশিনারি এবং মর্ডার্ন ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ, যাদের বিক্রি হয়ে গিয়েছে শেয়ারের সিংহভাগ। এখন সরকারের হাতে আছে নাম মাত্র শেয়ার। লগন জুট মেশিনারি এবং মডার্ন ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ৭৪ শতাংশ করে শেয়ার ইতিমধ্যেই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পড়ে রয়েছে সাকুল্যে ২৬ শতাংশ করে শেয়ার। জেশপেরও ৭২ শতাংশ শেয়ার মোদী সরকার বিক্রি করে দিয়েছে। সরকারের হাতে স্রেফ ২৭ শতাংশ শেয়ার। এগুলির বাইরে পশ্চিমবঙ্গে টিকে থাকা যে সমস্ত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ৫০ শতাংশের সামান্য বেশি শেয়ার সরকারের হাতে পড়ে রয়েছে, সেগুলিও আগামী দিনে এমন শেয়ার বিক্রির পথে বেসরকারি হাতে চালান হওয়ার মুখে। তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেডের ৪৯ শতাংশ শেয়ারই বেসরকারি হাতে চালান হয়ে গেছে। সরকারের হাতে আর মাত্র পড়ে রয়েছে ৫১ শতাংশ শেয়ার। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের মাত্র ৫৮ শতাংশ শেয়ার পড়ে রয়েছে সরকারের হাতে। শিপিং কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেডেরও সাকুল্যে ৫৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সরকারের হাতে। এছাড়াও অ্যান্ড্রু ইয়ুলের ৬২ শতাংশ শেয়ার, ভারত পেট্রোলিয়ামের ৬৬ শতাংশ শেয়ার, এন টি পি সি-র ৬৩ শতাংশ শেয়ার, অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের ৬৬ শতাংশ শেয়ার, পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার ৬৯ শতাংশ শেয়ার এবং স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়ার ৭৫ শতাংশ শেয়ার পড়ে রয়েছে সরকারের হাতে। ধাপে ধাপে এমন শেয়ার বিক্রির পথেই ক্রমশ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি বেসরকারি হাতে চালানের পাকা বন্দোবস্তে নেমেছে কেন্দ্রের মোদী সরকার। এই সময়েই রাজ্যের যে সমস্ত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ঝাঁপ সম্পূর্ণ বন্ধ করে গুটিয়ে ফেলার পথে এগিয়েছে মোদী সরকার, সেগুলির সংখ্যাও কম কিছু নয়। রাজ্যে তৃণমূল সরকারের মেয়াদেই বেঙ্গল কেমিক্যালের জমি বিক্রির চেষ্টা চলেছিল। অবশ্য আদালতের স্থগিতাদেশ দিয়ে তা আটকানো গিয়েছে। অন্যদিকে পাকাপাকি ঝাঁপ বন্ধের লক্ষ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বার্ন স্ট্যান্ডার্ডকেও এন সি এল পি (ন্যাশনাল কোম্পানি ল’ ট্রাইব্যুনাল)-তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ব্রিজ অ্যান্ড রুফ সংস্থার গেটেও তালা ঝোলানোর চেষ্টা চলছে। সেক্ষেত্রেও আদালত থেকেই তা আটকানো গিয়েছে। কেন্দ্রের মোদী সরকারের এমন পদক্ষেপগুলির প্রশ্নে এ রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস কখনই রা কাড়ে না। অবশ্য যে সময়ে মোদী সরকার কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে বেসরকারি হাতে চালান কিংবা গেটে তালা ঝুলিয়ে যন্ত্রপাতি বিক্রির পথে, ঠিক সেই সময়েই এ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারও রাজ্য সরকার অধিগৃহীত ৪৬টি সংস্থাকে হয় বন্ধ বা সংযুক্তিকরণের পথে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। ইস্টার্ন ডিসটিলারিজ অ্যান্ড কেমিক্যালস-এর মতো রাজ্য সরকার অধিগৃহীত সংস্থা এই সময়েই বন্ধ করেছে খোদ তৃণমূল সরকার। রাজ্যের মৎস্য দপ্তরের অধীন ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিসারিজ কর্পোরেশন লিমিটেডকেও এই সময়ে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলি ছাড়াও রাজ্য সরকার অধিগৃহীত কৃষ্ণা গ্লাস, লিলি প্রোডাকশন, কার্টার পুলার, দি ইনফিউশন ইন্ডিয়া, কল্যাণী স্পিনিং মিল, ওয়েস্ট বেঙ্গল সিরামিক ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন, ওয়েস্ট বেঙ্গল প্লাইউড অ্যান্ড অ্যালায়েড প্রোডাক্টস, ডি পি এল কোক ওভেন, ওয়েস্ট দিনাজপুর স্পিনিং মিল, স্টেট লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন প্রভৃতি তৃণমূল সরকারের বদান্যতায় কার্যত বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। শুধু রাজ্য সরকার অধিগৃহীত সংস্থাকে বন্ধ বা সংযুক্তিকরণের মোড়কে লাটে তোলার পদক্ষেপই নয়, তার সঙ্গেই রাজ্যের সরকারি পরিবহণ ক্ষেত্রের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ মহার্ঘ জমি বেচে দেওয়ার পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে এই সময়ে। সরকারি সংস্থা, জমি বিক্রি, সরকারি সংস্থার গেটে তালা ঝোলানো এসব কর্মসূচিতে কেন্দ্রের মোদী সরকারের সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলে এ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার। উৎসবের মুখে ক্লাবের হস্তশিল্প চালু রাখতে মুখ্যমন্ত্রীর উদার হস্ত ২৮ কোটি টাকার জোগান দিতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ থেকে একে একে গুটিয়ে ফেলা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাঁচানোর আর্জিতে রাজ্যের শাসক দল কিংবা খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দেখা মেলে মৌনব্রতেই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement