দশ কিলোমিটার যেতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা
বেহালা-ধর্মতলা যাতায়াত যেন বিভীষিকা

দশ কিলোমিটার যেতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা<br>বেহালা-ধর্মতলা যাতায়াত যেন বিভীষিকা
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১২ই সেপ্টেম্বর— ঠাকুরপুকুর থেকে ধর্মতলার দুরত্ব আনুমানিক ১০.২ কিলোমিটার, সেতু ভাঙার আগে আসতে লাগত ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা। ভাঙার পরে সময়ের কোনও হিসাব নেই। কখনও লাগছে ৩ ঘণ্টা, কখনও বা ৪ ঘণ্টা। দিনের যে সময়েই আসা হোক না কেন, মাঝেরহাট সেতুর ওপার থেকে আসতে এবং যেতে অসহনীয় এই যানজটের মধ্যে পড়তে হবেই। ঠাকুরপুকুর এলাকার নিত্যযাত্রী সাগ্নিক মিত্র তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বললেন, তাঁর অফিস শিয়ালদহ এলাকায়। তাঁর বক্তব্য, সেতু ভাঙার পরই তিনি ঠিক করেন, অটো বা বাসে করে টালিগঞ্জ থেকে মেট্রোর পথই হবে এখন যাতায়াতের রাস্তা। কিন্তু বুধবার সেই পরিকল্পনার পরিবর্তন করতে হয় বেহালা থেকে টালিগঞ্জ অবধি একাধিক রুটের অটোচালকদের ডাকা আকস্মিক ধর্মঘটের কারণে। অটো স্ট্যান্ড থেকে আরেকটু এগিয়ে একটি সরকারি বাসে ওঠার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ইতিমধ্যে তাতে ঝুলে ঝুলে যাচ্ছেন লোকজন। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত বদল করে ট্রেনে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। তারপর তারাতলাগামী এক বাসে ওঠা। কিন্তু যতক্ষণে মাঝেরহাট স্টেশনে পৌঁছালেন, ততক্ষণে ট্রেন বিদায় নিয়েছে। এর পরের ট্রেন ১ ঘণ্টা বাদে। তাই সময় নষ্ট না করে আবারও ছুটলেন তারাতলা মোড়ে। প্রসঙ্গত, অধিকাংশ বাসকেই যেহেতু তারাতলা থেকে ব্রেস ব্রিজের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাই বেশিরভাগ যাত্রীকেই ১০ থেকে ১২ মিনিট হেঁটে মাঝেরহাট স্টেশনে পৌঁছাতে হচ্ছে। তারতলা মোড় থেকে এস ১২ ডি-তে উঠে বসলেন সাগ্নিক মিত্র। তখন বাসে অল্প কিছু যাত্রী আছেন এবং সময় ঘড়িতে ১২টা বেজে ৪৭ মিনিট। মোড় ঘুরে বাস ঢুকে গেল ব্রেস ব্রিজের দিকে। পার করল ব্রিটানিয়া, দীপ ভবন। তারপরই শুরু হলো তীব্র যানজট। খিদিরপুর মোড় ডিঙিয়ে সেই যানজট কাটে। ততক্ষণে পার হয়ে গিয়েছে ৩ ঘণ্টা। প্রায় ৯ কিলোমিটার রাস্তা আসতে ঘড়িতে বেজে গেছে ৩ টে ৩৯ মিনিট। বাসের কন্ডাক্টরের মুখ ততক্ষণে মলিন হয়ে গিয়েছে। ক্লান্তি তাঁকে গ্রাস করেছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের উদ্দেশে তিনি আর বলছেনও না যে, বাসটা হাওড়া যাবে। অধৈর্য হয়ে পড়া এক যাত্রীর উদ্দেশে কন্ডাক্টার বলে উঠলেন, ‘‘এখনও তো অনেক বাকি, এর পরে ৪ ঘণ্টা সময় লাগবে।’’ সিটে বসে থাকা এক মহিলা যাত্রী অহনা মিত্র, কাপড়ের ব্যবসায়ী। ব্যবসার স্বার্থে তিনি খিদিরপুরে নিয়মিতই যাতায়াত করেন। তিনি বললেন, গত এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি তিন বার খিদিরপুর গিয়েছেন। তিন দিনই তাঁর ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লেগেছে, আগে যেখানে লাগত বড় জোর ১ ঘণ্টা। এই বাসেই ছিলেন এক স্কুল পড়ুয়ার মা দোলনা রায়। মেয়ের স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে, তাঁকে আনতে যাচ্ছেন মা। যানজটে আটকে থাকা মা ছটফট করছেন। বারবার ফোন করতে থাকেন তিনি মেয়ের বান্ধবীর মায়ের কাছে। অন্য দিন আরও আগে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। কিন্তু আজ দেরি হয়ে গিয়েছে। ফলে সমস্যায় পড়েছেন। মেয়ের স্কুল ছুটি হয় ২টো ১৫ মিনিটে, আজ সেই সময় পেরিয়ে গিয়ে ২টো ৪০ বেজে গিয়েছে। উদ্বিগ্ন মাকে ফোনে বলতে শোনা গেল মেয়ের বান্ধবীর মাকে, ‘‘দিদি আমার মেয়েকে আপনার বাড়ি নিয়ে যান। আমি আসছি।’’ সেই পৌঁছানো কতক্ষণে হবে, তা তিনি জানেন না। তখন তাঁর মাথায় শুধু চিন্তা, মেয়ের খিদে পেয়ে যাবে, কান্নাকাটি করবে। হাইড রোড থেকে বি এন আরের দিকে বাঁক নিয়ে আসতে আসতে দেখা গেল, খিদিরপুর ডক থেকে কন্টেনার গাড়ি বের হচ্ছে। তার জন্য যানজট আরও বেড়েছে। বাসে ছিলেন আরও এক ব্যবসায়ী, তনয় দে। তাঁর দোকান রয়েছে, সঙ্গে মোবাইলও সারিয়ে থাকেন তিনি। যন্ত্রাংশ আনতে খিদিরপুর যেতে হয় তাঁকে। সেতু ভাঙার পর প্রথম যাচ্ছেন তিনি। কারণ, যানজটের কারণে এতদিন তিনি সাহস করেননি। তিনি বললেন, ‘‘মাল নেই, তাই কাস্টমার ফিরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এভাবে কতদিন চলে! খিদিরপুর যাব, বাস ছাড়া তো উপায়ও নেই। কিন্তু কয়েক মিনিটের এই রাস্তা যেতে এখন কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। আমরা কী করব, উপায় তো নেই।’’ না, উপায় নেই। সত্যিই উপায় নেই। সেতু ভেঙে পড়াটা যেরকম মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘দুর্ঘটনা হতেই পারে, বরং আরও বড় হতে পারতো,’’ তেমনই এই নিত্য দিনের এই যন্ত্রণা এখন বেহালা, ঠাকুরপুকুর এবং তার পরবর্তী অঞ্চলের মানুষের ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবে মিটবে কেউ জানেন না। বিকল্প পথ কবে পাবেন, তাও জানা নেই কারও। তবুও ‘চুপ’ থাকতে হবে। কারণ, ‘সরকার তো চলছে’।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement