তদন্তের আগেই
ফয়সালা মমতার

পার্ক স্ট্রিটে পুলিশ ভুল, ইসলামপুরে ঠিক!

 তদন্তের আগেই<br>ফয়সালা মমতার
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ২৩শে সেপ্টেম্বর — তদন্তের আগে তদন্ত রিপোর্ট ঘোষণা করে দেওয়া সোজা কথা নয়। সেই ক্ষমতাই ধরেন মমতা ব্যানার্জি। শনিবার ইতালি থেকে ইসলামপুরের গুলিতে ছাত্র খুনের ঘটনার তদন্ত রিপোর্টও ঘোষণা করে দিয়েছেন তিনি।

ইসলামপুরে ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশ গুলি চালায়। দুই ছাত্রের মৃত্যু হয়। অনেক গ্রামবাসীর সামনেই সেই ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনার তদন্তও এখনও পুরোদস্তুর শুরু হয়নি। সেসবের অনেক আগে শনিবার মিলানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত পুলিশের যা রিপোর্ট তাতে ওই গুলি পুলিশের নয়।’’

মুখ্যমন্ত্রীই রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী। পুলিশ সম্পর্কে রাজ্যের মানুষের আস্থা তলানিতে। ‘‘এমন সময়ে পক্ষপাতহীন পুলিশি তৎপরতাই সময়ের চাহিদা ছিল’’ — মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ এক বুদ্ধিজীবীও এইভাবেই রবিবার অভিমত জানালেন। আর তখন, মমতা ব্যানার্জি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন যে, ‘‘ওই গুলি পুলিশের নয়।’’

অথচ পুলিশের রিপোর্টেই ছিল পার্ক স্ট্রিটে ধর্ষণ হয়েছিল। খোদ কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান সেই কথা জানিয়েছিলেন। ২০১২-র ৫ই ফেব্রুয়ারি পার্ক স্ট্রিটে ওই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। দিন দশেক পর ১৬ই ফেব্রুয়ারি মমতা ব্যানার্জি মহাকরণে বলেছিলেন, ‘‘সাজানো ঘটনা। সরকারকে ম্যালাইন করার জন্য এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। সব বের হবে।’’ অন্যদিকে সেদিনই কলকাতা পুলিশের তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ দমন) দময়ন্তী সেন বলেছিলেন ধর্ষণ হয়েছে।

দময়ন্তী সেনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর পদ থেকে। পাঠানো হয়েছিল গুরুত্বহীন পদে। কারণ সেদিন ‘পুলিশের রিপোর্ট’ আর মমতা ব্যানার্জির ‘তদন্ত রিপোর্ট’ মেলেনি।

মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জি একাধিকবার যে বিষয় তদন্তাধীন, তার সম্পর্কে এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। যা আসলে তদন্তকেই প্রভাবিত করার চেষ্টা বলে বারবার অভিযোগ উঠেছে।

যেমন মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়ার ঘটনা।

মাঝেরহাটে ব্রিজ ভাঙল চলতি মাসের ৪ তারিখ। তিনজনের মৃত্যু হলো। পরেরদিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী দায়ী করলেন মেট্রো রেলের কাজকে। পরে নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলনে মানলেন, গাফিলতি পূর্ত দপ্তরের। ‘দপ্তর’ এক বড় বিষয়। দায়ী কে কে তা নির্দিষ্ট করতে হবে। তার জন্য তদন্তের ঘোষণা করলেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু সেই তদন্ত শুরু হওয়ার আগে, সেই সাংবাদিক সম্মেলনের পরে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তিনি জানিয়ে দিলেন তাঁর ‘চার্জশিট’ — ‘পূর্তমন্ত্রীর কাছে কোনও ফাইলই পাঠানো হতো না।’

অর্থাৎ মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়ার দায় থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ, পূর্তমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বেকসুর খালাস!

সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির বিষয়ে মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যে বরাবরই সাম্প্রদায়িকতার বিপদকে তাঁর খাটো করে দেখার মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। উদাহরণ? বসিরহাটের ঘটনা। ২০১৭-র জুলাইয়ে বাদুড়িয়া, বসিরহাট লাগোয়া বিস্তীর্ণ জায়গায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সেই ঘটনারও ময়নাতদন্ত পুলিশের রিপোর্ট পৌঁছানোর আগেই মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে পেশ করেন। কী বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী? সেই ঘটনাতে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘‘একটা ছোট জায়গায় গোলমাল হয়েছে। এত ভাববার কিছু নেই। ২-৩টি ছোট ব্লক এলাকার গোলমাল।’’ ৫ই জুলাই নবান্নে এই মন্তব্য করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

সেই ‘ছোট জায়গার গোলমাল’, যা নিয়ে ‘ভাববার কিছু নেই’, তা এখন সারা রাজ্যের মারাত্মক বিপদ হয়ে উঠেছে।

নারদ স্টিং অপারেশনের তদন্ত কলকাতা পুলিশকে দিয়ে করানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ২০১৬-র জুনের ঘটনা। স্টিং অপারেশন তখন বিচারাধীন বিষয়। তবু নিজের মতামত ঘোষণা করে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছিলেন, ‘চক্রান্ত।’ ২০১৬-র ১৮ই জুন নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে মমতা ব্যানার্জি আরও বললেন, ‘‘তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে, টেবিলে টাকা রেখে ছবি তুলে বলছো ঘুষ নিয়েছে। তাহলে কী কারও সঙ্গে দেখা করা যাবে না? এই ভাবে ব্ল্যাকমেলের চেষ্টা চলছে।’’

মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদরা টাকা নিচ্ছেন — ভি ডি ও ফুটেজে দেখা যাচ্ছিল। মমতা ব্যানার্জি বলে দিলেন ‘ব্ল্যাকমেল’, ‘চক্রান্ত’। বি জে পি সরকার কেন্দ্রে থাকলেও, সি বি আই তদন্ত হলেও যদিও এখনও সেই ঘটনার বিচার আজও হয়নি।

এমনভাবেই কোনও ঘটনাকে ‘ছোট’ বলে অভিহিত করে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। কোনওটা আবার ‘সাজানো’ তকমা পেয়েছে। কোনওটা ‘মাওবাদীদের’ কাজ।

কামদুনিতে মমতা ব্যানার্জি গেছিলেন ২০১৩-র ১৭ই জুন। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের আশ্রিত দুষ্কৃতীরা এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে খুন করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী মৃতার বাড়ি গেছিলেন চাকরির প্রতিশ্রুতি জানাতে। তখন গ্রামবাসীরা তাঁর সঙ্গে এলাকার দুষ্কৃতী এবং পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে কথা বলতে চাওয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘‘চোপ। সব সি পি এম, সব সি পি এম’’। পরে ১৯শে জুন দত্তপুকুরের সভায় বলেছিলেন যে, কামদুনিতে সি পি আই(এম) আর মাওবাদীরা ছিল। তাঁকে খুন করার চক্রান্ত হয়েছিল। সেবার প্রতিবাদী গ্রামবাসীরা হয়েছিলেন ‘সি পি এম’ এবং ‘মাওবাদী’।

২০১২-র ২৫শে ফেব্রুয়ারি কাটোয়ায় চলন্ত ট্রেনে কিশোরী মেয়ের সামনে এক মহিলাকে ধর্ষণের ঘটনাকে ‘ছোট ঘটনা’ বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। যদিও সেই ঘটনায় বীরভূমের লাভপুর থেকে দুই শাসক দলের কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিল। আবার সেই মমতা ব্যানার্জিই ১৯৯৮-র মে-তে যিনি ধর্ষিতাই হননি(পরে প্রমাণিত) সেই চম্পলা সর্দারকে ‘ধর্ষিতা’ বলে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন।

২০১২-র ৮ই আগস্ট বেলপাহাড়িতে মমতা ব্যানার্জির সভা ছিল। সেই সভায় যোগ দিয়েছিলেন শিলাদিত্য চৌধুরি। ফসলের দাম নিয়ে নিজের অভিযোগ জানানোয় তাঁকে ‘মাওবাদী’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কত সহজে তিনি মাওবাদীদের চিনতে পারেন জেনেছিল রাজ্য সেদিন। অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র ফেসবুকে একটি কার্টুন পোস্ট করায়, তা ‘খুনের চক্রান্ত’ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

তাঁর এই ‘তদন্তকারী’-র ভূমিকা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগেও ছিল। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে গণহত্যার কথা মনে পড়াও স্বাভাবিক। ২০১০-র ২৮শে মে-র ওই গণহত্যায় ১৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন ২০০। তার ঠিক দুদিন পরেই রাজ্যের ৮১টি পৌরসভার নির্বাচন ছিল। সেদিন কী বলেছিলেন মমতা ব্যানার্জি ?ওই বর্বরোচিত হামলায় তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি সি পি আই(এম)-র হাত আছে বলে ইঙ্গিত করেন। ৩০শে মে প্রকাশিত প্রবল ‘বর্তমান’ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল এই ভাষায় —‘‘ সরডিহায় জ্ঞানেশ্বরী নাশকতার পিছনে সি পি এমের হাত আছে বলে অভিযোগ করলেন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।.........তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি রাজনৈতিক দল ঘটনার পর এত তাড়াতাড়ি মাঠে নেমে পড়ল কী করে ? .......মমতার অভিযোগ, জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে এতজন নিরীহ যাত্রীর প্রাণহানির ঘটনা একটা গভীর ষড়যন্ত্র।’’

সেই ‘ষড়যন্ত্রের’ সি বি আই তদন্ত করিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। চার্জশিটে মমতা ব্যানার্জির ‘সাবোতোজ’, ‘সি পি এম-র চক্রান্ত’-র তত্ত্বকে আমল দিতে পারেনি সি বি আই। নৃশংস সেই ঘটনার পান্ডা বলে যারা চিহ্নিত হয়েছিল, তাদের বেশ কয়েকজন ছিল পরিচিত তৃণমূল কংগ্রেসী। যেমন উমাকান্ত মাহাতো।

মমতা ব্যানার্জি নিশ্চই ভুলে যাননি।

 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement