ধান কেনার নামে
দুর্নীতিতে গ্রেপ্তার মিল মালিক

ফাঁস করেছিল গণশক্তি

ধান কেনার নামে<br>দুর্নীতিতে গ্রেপ্তার মিল মালিক
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১০ই অক্টোবর— বেপরোয়াভাবে চলছিল ধান কেনার দুর্নীতি। সেই খবর ফাঁস হয়েছিল গণশক্তি পত্রিকায়। মুখরক্ষা করতে মিল মালিককে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হলো সরকার। 
রাইস মিল মালিক গ্রেপ্তার হলেও দুর্নীতির ঘটনায় সরাসরি যুক্ত শাসকদলের সমবায় সমিতির কর্তারা। তারা কেন ছাড় পাবে সেই প্রশ্ন উঠছে। 
অঙ্কিত ইন্ডিয়া লিমিটেড কোম্পানির এম ডি হিতেশ ছন্দককে গ্রেপ্তার করেছে ভবানীপুর থানা। গোটা ঘটনাটি নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে খাদ্য দপ্তর। গ্রেপ্তারি নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, ‘এটা এখনও আমার গোচরে আসেনি। আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখতে পারি।’ 
গ্রেপ্তার করলেও রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন গোটা বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। রাইস মিল মালিকের গ্রেপ্তারির ঘটনায় ধান কেনার দুর্নীতির খবর সরকার কোনোভাবেই প্রকাশ্যে আসতে দিতে রাজি নয়। কারণ, এতদিন লক্ষ লক্ষ কৃষকের কাছ থেকে সরকারি সহায়ক মূল্যে ধান কেনার সাফল্য বলে যে দাবি সরকার করছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই সরকার চায় না এই মিল মালিকের গ্রেপ্তারি নিয়ে খবর চাউর হোক। এছাড়াও একজন মিল মালিক গ্রেপ্তার হওয়া গোটা দুর্নীতির হিমশৈলের চূড়ামাত্র। এরপর বাকি জেলাগুলি থেকে ধান কেনার দুর্নীতিতে যুক্তদের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে তাতে আরও বেসামাল হয়ে যাবে সরকারের ধান কেনার সাফল্য। তাই গোটা ঘটনা নিয়ে মুখ খুলছে না কেউই। 
এদিন খাদ্য দপ্তরের উদ্যোগে রাজ্যের সব জেলাতে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানেও খাদ্য দপ্তর দাবি করেছে, চলতি বছরে (২০১৭-১৮) ৪লক্ষ ৬০হাজার কৃষকের কাছ থেকে সরকার সহায়ক মূল্য দিয়ে ৩৩লক্ষ টন ধান কিনেছে। অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে জেলার সেরা কৃষক, সেরা রাইস মিল, সেরা সমবায় সমিতির হাতে পুরস্কারও তুলে দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানের জন্য প্রতি জেলায় খাদ্য দপ্তরের বরাদ্দ ছিল ৫০হাজার টাকা। ধান কেনার দুর্নীতির জাল যেভাবে রাজ্যে ছড়িয়েছে তাতে সেরা বাছাই কাদের করা হলো তা নিয়ে মুখ খুলছে না খাদ্য দপ্তরের আধিকারিকরা। ৪লক্ষ ৬০হাজার কৃষকের অধিকাংশ যে আসলে ভুয়ো নাম তা এখন প্রকাশ্যে আসছে তদন্তে। 
অঙ্কিত ইন্ডিয়া লিমিটেড কোম্পানির রাইস মিল হাওড়ার কুলগাছিয়াতে। হাওড়া জেলার কৃষকদের কাছ থেকে সহায়ক মূল্যে ধান কিনে তা চাল করে ফেরত দেওয়ার কথা রাইস মিলের। আর সেই ধান কেনাকে ঘিরেই দুর্নীতি। 
কর্পোরেট দুনিয়ায় চালু যে অ্যাকাউন্ট সেই ‘ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট’ তৈরি করেও কেনা হয়েছে ধান। আর সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে নকল কৃষকের নাম। সমবায় সমিতিকে সামনে রেখে হাজার হাজার নকল অ্যাকাউন্ট তৈরি করে লুট করে নেওয়া হয়েছে সহায়ক মূল্যের টাকা। 
তবে উলুবেড়িয়া থানার ময়না কৃষি সমবায় সমিতির সঙ্গে অবৈধ বোঝাপড়া করে এই অঙ্কিত রাইস মিল। ময়নাপুর ও আশেপাশের গ্রামের ৪০০গরিব খেতমজুরের নামে প্রথমে জিরো ব্যালান্স অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। তারপর সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সরকারী সহায়ক মূল্যে কেনা হয় কোটি কোটি টাকার ধান। অথচ ভূমিহীন ওই খেতমজুররা জানতেই পারেননি কীভাবে তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে এই কোটি কোটি টাকার লেনদেন করা হয়েছে। ৯৭হাজার টাকা ঢুকেছে গরিবের অ্যাকাউন্টে। আবার নিমেষে সেই টাকা লোপাট হয়ে গেছে। জিরো ব্যালান্স অ্যাকাউন্ট করে খেতমজুরদের কাছ থেকে আগে থেকেই পাশবই, পিন সহ এ টি এম কার্ড নিয়ে রেখেছিল তৃণমূল পরিচালিত ময়নাপুর সমবায় সমিতি। গোটা ঘটনার খবর সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছিল গণশক্তি পত্রিকায়। ঘটনার প্রতিবাদ করে সারা ভারত কৃষকসভার পক্ষ থেকে এলাকায় দুর্নীতি বিরোধী গণকনভেনশন আয়োজিত হয়েছিল। 
সহায়ক মূল্যের টাকা দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্যের হাতে সেই টাকার এই বিপুল দুর্নীতির খবর ফাঁস হতেই কিছুটা নড়েচড়ে বসে নবান্ন। খাদ্য দপ্তরকে এড়িয়ে নবান্নের নির্দেশেই কলকাতার ভবানীপুর থানায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করে পুলিশ। কারণ, ভবানীপুর থানা এলাকারই ‘এফ এম সি ফরচুনা’ বহুতলে অঙ্কিত ইন্ডিয়া লিমিটেডের কর্পোরেট দপ্তর। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমে খাদ্য ভবন থেকে অঙ্কিত রাইস মিলের ধান কেনার সব নথি চেয়ে পাঠায়। এমনকি যে সমস্ত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছে তার মাস্টার রোল নিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। উলুবেড়িয়ার গ্রামে গিয়ে কৃষকদের নাম খুঁজে বের করে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। খাদ্য দপ্তরের আধিকারিকদের কাছ থেকে পাওয়া নথির ভিত্তিতেই পুলিশ তদন্ত চালাতে গিয়ে তদন্তকারীদের চোখ কপালে উঠে গেছে। লালবাজার সূত্রের খবর, কয়েক শো কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তদন্তের ভাষায় ধান কেনার এই দুর্নীতিকে ‘স্পেশাল রিপোর্ট কেস’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধৃত এম ডি হিতেশ ছন্দককে লালবাজারের সেন্ট্রাল লক আপে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছে তদন্তকারীরা। 
রাইস মিলের বিরুদ্ধে খাদ্য দপ্তরের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু সেই অভিযোগ মূলত ধান নিয়ে চাল তৈরি করে ফেরত না পাওয়ার। তার জন্য রাইসমিলের বিরুদ্ধে তদন্ত, সাসপেন্ড এমনকি মিল মালিকের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এই ঘটনা আগে ঘটেনি। এবার ধান কেনার দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হতে হলো রাইস মিল মালিককে।
ফি বছর রাজ্যে ধান কেনা নিয়ে চরম দুর্নীতি চলছে। নকশালবাড়িতে চা শ্রমিকদের জিরো ব্যালান্স অ্যাকাউন্ট তৈরি করে দু বছর আগে ঠিক উলুবেড়িয়ার কায়দায় রাইসমিল কোটি টাকা তুলে নিয়ে যায়। রাইস মিল, শাসকদলের দখলে থাকা সমবায় সমিতি ও খাদ্য দপ্তরের একাংশকে সঙ্গে নিয়ে সহায়ক মূল্যের টাকা লুটের আখড়া হয়ে উঠেছে গ্রাম। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement