ডাইন অপবাদে বৃদ্ধের
দশ আঙুল কাটা হলো

বীরভূমের গ্রামে

ডাইন অপবাদে বৃদ্ধের<br>দশ আঙুল কাটা হলো
+

 নিজস্ব সংবাদদাতা: পাড়ুই, ১০ই অক্টোবর— ডাইন অপবাদ দিয়ে এক বৃদ্ধের দশটা আঙুলই কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠল বীরভূমের পাড়ুইয়ে। রীতিমত সালিশি সভা বসিয়ে সোমবার সকালে পাড়ুইয়ের কসবা অঞ্চলের রাধাকেষ্টপুরে। গ্রামে ‘শান্তি’ ফিরিয়ে আনতে বৃদ্ধের ছেলেকে দিয়েই এই ‘মহৎ কর্ম’ সম্পন্ন করিয়েছে গ্রামের মাতব্বররা। আঙুল কাটা হাত নিয়ে সেই বৃদ্ধ ফন্দি সর্দার এখন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তদন্ত শুরু হলেও দুদিনেও বিশেষ কিছু এগয়নি। আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে ফন্দি সর্দারের পরিবার। সালিশিতে প্রথমে ওই বৃদ্ধকে বলি দেওয়ারই নিদান হয়েছিল। পরে অবশ্য ছেলের কাকুতি-মিনতিতে আঙুল কাটার শাস্তি ধার্য হয়। 

সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যে যে ফের কুসংস্কার, বুজরুকির কাজকর্ম বেড়ে গেছে, পাড়ুইয়ের ঘটনা তারই প্রমাণ। ঘটনার সূত্রপাত বেশ কয়েক দিন আগে। কিছুদিন ধরেই রাধাকেষ্টপুর গ্রামে নাকি শান্তি থাকছে না। সেজন্য ওই গ্রামের মহিলারা বোলপুরের রায়পুর গ্রামে এক তান্ত্রিকের কাছে যান। তান্ত্রিক পরামর্শ দেন, গ্রামেই আছে এক ডাইন, যার কারণে এমন ঘটছে। তার কাছে পুজোর ঘটি আছে। সেটা খুঁজে বের করতে হবে। 
সুমি সর্দার নামে গ্রামের এক কিশোরীর মাথা থেকে নাকি ডাইনির ‘ভর’ নামছে না। সেই সুমির দাবি, ফন্দি সর্দারের জন্য তার ঘাড় থেকে ভর ছাড়ছে না। ওর বাড়িতে ভূত আছে। অদ্ভুত দেখতে সেই ভূতের মাথায় কোঁকড়া চুল, মুখ দিয়ে লালা ঝড়ে। সেই কিশোরী নাকি থেকেই থেকেই ফন্দির নাম করছে।
তারপর, গ্রামের মোড়ল অনিল সর্দারকে নিয়ে গ্রামবাসীরা সালিশি সভা বসায়। সেখানেই ঠিক হয় ফন্দি সরকারের ঘরেই ডাইন রয়েছে, তাই তাকে বলি দিতে হবে। মাটি খুঁড়ে খোঁজা হয় পুজোর ঘটি। তা অবশ্য পাওয়া যায়নি। সন্দেহ গিয়ে পড়ে ফন্দির উপরেই, সেই নাকি লুকিয়ে রেখেছে সেই ঘটি। সেই আসলে ডাইন বিদ্যার চর্চা করে। 
এরপর সালিশি সভায় ডেকে আনা হয় ফন্দি সর্দারের বছর তেত্রিশের ছেলে হরিশচন্দ্র সর্দারকে। প্রথমে আওয়াজ উঠেছিল ওই বৃদ্ধকে জীবন্ত বলি দিতে হবে! শেষ পর্যন্ত অবশ্য ছেলের কাকুতি-মিনতিতে প্রাণ বাঁচে বৃদ্ধের। কিন্তু নিদান দেওয়া হয়, যাতে সে পূজা না করতে পারে তার জন্য তাঁর দুই হাতের দশটি আঙুল কেটে নেওয়া হোক। আর ‘গ্রামের স্বার্থে’ সেই ‘মহৎ’ কাজটি সম্পন্ন করতে হবে তাঁর ছেলেকেই। সেই নিদান মত সোমবার সকালে নিজের বাড়ির উঠোনে কাঠের পাটাতনের উপর বৃদ্ধ বাবার দু-হাত রেখে দা দিয়ে ছেলে কেটে ফেলে দুই হাতের দশটি আঙুলই। সেই দশটি আঙুল ও দা পাশের পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। ফন্দি সর্দারের নাতনি রমা সর্দার জানায়, ‘‘তাদের বাড়িতে ডাইন, ভূত আছে এমন অভিযোগ করে গ্রামবাসীরা আমাদের একঘরে করতে চেয়েছিল। অনেকেই আমাদের বাড়ি চড়াও হয়। মারতে আসে। কিন্তু বাড়িতে ভায়েরা থাকায় পারেনি। তারা আমাদের বাড়ি ছাড়া করতে চায়। এরপর গ্রামবাসীদের চাপেই গোটা পরিবার ও গ্রামবাসীদের সামনে দাদুর আঙুল কেটে নেওয়া হয়েছে। দাদুকে বর্ধমান নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেমন আছে জানি না।’’
এমন ঘটনার পর দুদিন কেটেছে। বীরভূমে রাজ্যের দু-দুজন মন্ত্রী। পঞ্চায়েতের তিনটি পর্যায়েই একচ্ছত্র আধিপত্য। শাসক দলের কোনও নেতাকে ঘটনাস্থলে যেতে দেখা যায়নি। বোলপুরের বিধায়ক, রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিন্‌হা এদিন বলেছেন, ‘‘বীরভূমের কসবায় হয়েছে? না, আমি জানি না এমন ঘটনা।’’ সভাধিপতি বিকাশ রায়চৌধুরিকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন, ‘‘পুলিশকে বলেছি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে।’’ 
গ্রামের মোড়ল অনিল সর্দার স্বীকার করে নিয়েছেন তার সামনেই গ্রামবাসীদের চাপে ছেলেকে দিয়ে বৃদ্ধর আঙুল কাটানো হয়েছে। তবে এতে তার সায় ছিল বলে জানিয়েছেন মোড়ল। মোড়ল অনিল সর্দার বলেন, ‘‘গ্রামবাসীরা খেপে উঠেছিল। আমি বলেছিলাম মারধর করা যাবে না। আলাপ আলোচনায় মিটমাট করতে হবে। তাতে গ্রামবাসীরা আমার উপরই চড়াও হয়। আমার কিছু করার ছিল না। আমার কথা শুনলে এমন ঘটনা ঘটতই না।’’
ঘটনায় রীতিমত স্তম্ভিত সকলেই। এই ধরনের কুসংস্কারের প্রভাব ফের নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে চতুর্দিকে ভেবেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে সব মহলেই। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের বীরভূম জেলার অন্যতম সংগঠন শুভাশিস গড়াই জানিয়েছেন, ‘‘চরম উদ্বেগজনক ঘটনা। ইদানিং জেলায় এই ধরনের ঘটনা বাড়ছে। আমরা অবিলম্বে গ্রামে যাব। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলব। পাশাপাশি পুলিশ-প্রশাসনের কাছে আরজি রাখব কঠোর হাতে এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার।’’ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনায় বৃদ্ধের ছেলে সহ মোট ছয় জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement