বেলাইন নিউ ফরাক্কা এক্সপ্রেস মৃত ৫

জখম রাজ্যের ৯বাসিন্দা

বেলাইন নিউ ফরাক্কা এক্সপ্রেস মৃত ৫
+

চন্দন রাই: লক্ষ্ণৌ ১০ই অক্টোবর— বুধবার সকালে রায়বেরেলির হরচন্দপুর স্টেশনের কাছে নিউ ফরাক্কা এক্সপ্রেস বেলাইন হয়ে ৫জনের মৃত্যু হয়েছে। জখম হয়েছেন ২৬জন। নিহতরা সকলেই বিহারের মুঙ্গের জেলার বাসিন্দা। আহতদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দারা রয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে মালদহ টাউন স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়ে। নয়াদিল্লিগামী ট্রেনটি এদিন সকাল ৬টা পাঁচ মিনিটে হরচন্দপুর স্টেশনের বাইরে বেলাইন হয়। জানা গেছে, সিগন্যালের ত্রুটির কারণে ট্রেনটি মেন লাইনের বদলে লুপ লাইনে ঢুকে যায়। তার জেরেই ট্রেনটির ইঞ্জিন এবং ৯টি কামরা বেলাইন হয়ে যায়। যদিও রেলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ৫টি কামরা বেলাইন হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা চলছে রায়বেরেলি জেলা হাসপাতাল এবং লক্ষ্ণৌ ট্রমা সেন্টারে। আহতদের মধ্যে ৯জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁরা সকলেই লক্ষ্ণৌয়ের ট্রমা সেন্টারে ভর্তি আছে। আহতদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ এবং মালদহের বেশ কয়েকজন আছেন। মালদহের মানিকচকের নূরপুরের বাসিন্দা তারিফুল শেখ নামে এক যাত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়া বাকি ৮জন মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা। এঁরা হলেন হীরা নন্দনপুরের নসিম বিবি এবং আমিরুদ্দিন ও মন্টু শেখ; নিম খুরকার বাসিন্দা নূরিয়া শেখ, সলমা খাতুন, রসিলা খাতুন, আজাদ শেখ এবং সমীর শেখ। এঁরা সকলেই রায়বেরেলির জেলা হাসপাতালেই ভর্তি আছেন। 

মালদহ টাউন থেকে রওনা হওয়া ট্রেনটি এদিন সকালে হরচন্দপুরের কাছে পৌঁছলে হঠাৎই ইঞ্জিনটি বেলাইন হয়ে যায়। এর জেরে ৯টি কামরা বেলাইন হয়। তার মধ্যে চারটি কামরা উলটে যায় বা একটি অন্যের উপর চড়ে যায়। বাকি কামরাগুলি রেল লাইনের ধারের পাথর বা মাটির কারণে আটকে যায়। নাহলে আরও বড় ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। বেলাইন হলেও উলটে না যাওয়ায় এই কামরাগুলির যাত্রীরা অল্পবিস্তর চোট পেয়েছেন। সিগন্যাল ব্যবস্থা ঠিক করে কাজ না করার জন্যেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। রেলের স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্টেশন মাস্টার মেন লাইনের সিগন্যালই দিয়েছিলেন কিন্তু লাইনের পয়েন্ট হয়নি। তার ফলে ট্রেনটি লুপ লাইনে ঢুকে যাওয়াতেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ে বোর্ড দুর্ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়ে নিহতদের পরিবারপিছু ৫লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের জন্য দেড় লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছে। উত্তর প্রদেশ সরকার নিহতদের পরিবারপিছু ২লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের কথা বলেছেন। ইঞ্জিন এবং অন্য বগিগুলো বেলাইন হওয়ার জেরে বেশ কয়েক জায়গায় রেলের লাইন সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। এমনকি মেন লাইনের সঙ্গে লুপ লাইনও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার পরে এই রুটের সমস্ত আপ এবং ডাউন ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য একটি বিশেষ ট্রেনের বন্দোবস্ত করা হয়। দুপুরের পর তাদের লক্ষ্ণৌ থেকে দিল্লি রওনা করা হয় সেই ট্রেনে। মোট ১৩৬৯জন যাত্রী দিল্লি রওনা হয়েছেন। 
আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক ৯জনকে লক্ষ্ণৌয়ের ট্রমা সেন্টারে ভর্তি করা হয়। বাকিদের রায়বেরেলি জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা করা হচ্ছে। তিনজনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হতাহতদের অধিকাংশই বিহারের বাসিন্দা। যাত্রীদের বেশিরভাগই কাজের জন্য দিল্লি, বরেলি এবং উত্তর প্রদেশের অন্য জেলায় যাচ্ছিলেন। কারো কারো গোটা পরিবারই দুর্ঘটনায় জখম হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর এন ডি আর এফ এবং এস ডি আর এফের টিম উদ্ধার কাজ শুরু করে। তার আগেই যদিও স্থানীয়রা বেশিরভাগ আহতদের স্কুল বাসে এবং অ্যাম্বুল্যান্সে করে রায়বেরেলি জেলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মুঙ্গেরের বাসিন্দা ৪৫বছরের অনিতা মাঝি। তাঁর চার বছরের শিশুকন্যা রীতাও মারা যায়। দুইজনের দেহই এন ডি আর এফ আসার পর উদ্ধার করা সম্ভব হয়। 
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান অশ্বিনী লোহানি ঘটনাস্থলে যান। যথারীতি দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে চাননি। মোদী সরকারের আমলে রেলের দুর্ঘটনার সন্ত্রাসবাদ দমন শাখার তদন্ত শুরু হয়েছে। তাদের তদন্তের পরেই কিছু জানা যাবে বলে জানিয়েছেন রাজ্য পুলিশের এডিজি কুমার। যদিও এই দুর্ঘটনার পর ফের রেলের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দুর্ঘটনার পর ফের একবার এল এইচ বি কোচের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রেলের আধিকারিকরাও এদিন ব্যক্তিগত আলোচনায় স্বীকার করেছেন যদি নিউ ফরাক্কা এক্সপ্রেসের লিঙ্ক হফম্যান বুশ (এল এইচ বি) কোচ থাকতো তাহলে মৃত্যু এবং জখমের ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো যেত। যদিও রেলওয়ে বোর্ডের সদস্যরা এদিন ফের একবার সেই ২০২২সালের মধ্যে সব এল এইচ বি কোচ লাগানোর চর্বিতচর্বন করেছেন। 
নিউ ফরাক্কা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার পরে উত্তর রেলওয়ে লক্ষ্ণৌ, মালদহ টাউন, ভাগলপুর, সাহিবগঞ্জ, নিউ ফরাক্কা, মুরাদাবাদ, বরেলি, বারাণসী, রায়বেরেলি এবং প্রতাপগড় স্টেশনে হেল্পলাইন খোলে। তার নম্বরও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সব নম্বরে ফোন করে কোনও সাড়া না পাওয়ায় মানুষ আরও অসুবিধা এবং আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। ওই ট্রেনে সফরকারী যাত্রীদের পরিজন এবং বন্ধুরা ফোন করেও হেলপ লাইন নম্বর থেকে কোনও সাড়া পাননি। 
মালদহ থেকে গণশক্তির নিজস্ব সংবাদদাতা জানিয়েছেন, নিউ ফরাক্কা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে শুনেই দলে দলে মানুষ এদিন মালদহ টাউন স্টেশনে ভিড় করতে থাকেন। সকলেই পরিজনদের খবর জানতে চান। প্রাথমিকভাবে খবর না মিললেও বেলার দিকে জানা যায় নিহতদের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের কোনও বাসিন্দা নেই। এই খবরে পরিজনদের মধ্যে স্বস্তি আসে। সপ্তাহে দুই দিন মঙ্গলবার ও শনিবার ট্রেনটি নিউ ফরাক্কা স্টেশন থেকে ছাড়ে। মালদহ ছাড়াও দুই দিনাজপুর এবং মুর্শিদাবাদের বহু মানুষ এই ট্রেনে যাতায়াত করেন। অধিকাংশই পরিযায়ী শ্রমিক যাঁরা ভিন রাজ্যে কাজের খোঁজে যান। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement