আঙুল কাটার পর শাসিয়ে
গেছিল তৃণমূলের নেতা

‘দেখিস মামলা-টামলা করিস না’

আঙুল কাটার পর শাসিয়ে<br>গেছিল তৃণমূলের নেতা
+

নিজস্ব সংবাদদাতা: পাড়ুই, ১১ই অক্টোবর— ব্যতিক্রম নয় রাধাকৃষ্ণপুর। পাড়ুইয়ের এই গ্রামেও একচ্ছত্র দাপট ‘উন্নয়ন’ বাহিনীরই। এই সেই গ্রাম যেখানে কুসংস্কারের ফতোয়ায় ছেলেকে দিয়ে কাটানো হয়েছে বাবার দশটা আঙুল। গ্রামে গেলেই শোনা যাচ্ছে গোটা ঘটনায় ‘উন্নয়ন’ বাহিনীর উপস্থিতির সত্যতা। এমন ঘটনা আটকানোর থেকে এই ‘উন্নয়ন’ বাহিনী বরং প্ররোচনাই দিয়েছে। 
অসুর সর্দার, বলরাম সর্দার, মুক্তি সর্দার, রাজীব, রাজেশসহ একাধিক নাম উঠে এসেছে গ্রামের নানা মানুষের সাথে কথা বলে। গ্রামের একমাত্র ক্লাবের মাতব্বর এরা। এদের মধ্যে আবার অসুর সর্দার বর্তমানে শাসকদলের পক্ষ থেকে গ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা। শুধু তাইই নয়, গতবারের তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্যও বটে। ফন্দি সর্দারের এক আত্মীয় জানালেন, ‘‘মারধর, আঙুল কাটার পর সেই অসুর সর্দারই আমাকে বলেছে, ‘দেখিস মামলা-টামলা করিস না। সব মিটমাট হয়ে যাবে।’’ সেই আত্মীয়ের কথায়, যদিও তখন ক্লাবের লোকজনের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না অসুরের। বেগতিক বুঝে আজ অসুরসহ তার স্যাঙাতরা গা ঢাকা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এমন ভয়ানক ঘটনা ঘটতে চলেছে দেখেও পাঁচ বছর পঞ্চায়েত সদস্য থাকা শাসক দলের মাতব্বর কেন পুলিশ ডাকলো না।
পাশাপাশি ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে পুলিশি নজরদারির খামতির কথা। কারণ রাধাকৃষ্ণপুরের ঘটনা আচমকা উত্তেজনা থেকে ঘটেনি। ফন্দি সর্দারের পরিবার এবং ‘ভর’ পড়া সুমি সর্দারের পরিবার ও গ্রামবাসীদের ‘ডাইন’ নিয়ে বিবাদ চলছিল চার-পাঁচদিন ধরে। থেকে থেকেই ঝগড়া, ঝামেলা, যজ্ঞ, তান্ত্রিকের শরণাপন্ন হতে ভিন গাঁয়ে যাওয়া, দলবল নিয়ে তান্ত্রিকের গ্রামে আসা সব মিলে টানা চার-পাঁচদিনের ঝঞ্ঝাট শেষে তবেই চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে সোমবার গভীর রাতে। প্রশ্ন এখানেই, এত কিছুর পরেও নূন্যতম খবরটুকু সংগ্রহ করতে পারেনি পুলিশ। কোথায় গেল পুলিশের ‘নেটওয়ার্ক’? আরও প্রশ্ন, এতকিছুর পরেও কোথায় সেই তান্ত্রিক যার বুজরুকিতেই ঘটেছে এই কাণ্ড। 
ফন্দি সর্দারের নাতনি রুমা সর্দার উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। পড়াশোনা করে কেন্দ্রডাঙা হাই মাদ্রাসায়। গোটা ঘটনা জানিয়েছে সে। তার কথা মতো, শুরু গত বৃহস্পতিবার। সুমি সর্দার নামে একটি মেয়ে দাবি করে তার উপর ‘ভর’ হয়েছে। ফন্দি সরেনের পুজো করা ডাইনই তার উপর ভর করেছে। সেই গ্রামের শান্তি বিঘ্নিত করছে। এবার গ্রামের লোকের সঙ্গে ক্লাবের মাতব্বররাও জুড়ে যায় ‘ডাইন’ দূর করতে। দুই পরিবারসহ গ্রামবাসীরা সবাই মিলে হাজির হয় রায়পুরের সেই তান্ত্রিক যাকে গ্রামের লোক ‘দেবাংশী’ বলে ডাকে তার কাছে। ঠিক হয় পরদিন গ্রামে সালিশি হবে। সেই সভা থেকে সেই তান্ত্রিককে গাঁয়ে এনে যজ্ঞ করানোর নিদান দেওয়া হয়। গত শনিবার হয় সেই যজ্ঞ। সেখান থেকেই আওয়াজ ওঠে ফন্দি সরেনের কাছে একটি ঘটি আছে সেটি বের করতে হবে। সেই সঙ্গে তান্ত্রিক নিদান দেয়, তিনটি পাঁঠা, তিনটি ঢোল, চাঁদমালা লাগবে। অশান্তির হাত থেকে বাঁচতে ফন্দি সর্দার সাড়ে ছয় হাজার টাকা খরচ করে আপাতত দুটি পাঁঠা কেনেন। যা এখনও বাঁধা উঠোনে। ফন্দির নাতনি রুমা জানালো, ‘যজ্ঞের সময় ঠিক হয় সোমবার আমাদের বাড়ি থেকে ঘটি খোঁজা হবে। সেই মতো শুরু হয় উঠোন খোঁড়ার কাজ। এক হাঁটু খুঁড়েও কিছু মেলেনি। এরপরই গাঁয়ের লোক চেঁচামেচি শুরু করেন যে দাদু নাকি ঘটি সরিয়ে দিয়েছে। এরপর দাদুকে সোমবার রাত্রে গাঁয়ের মনসা তলায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। চার চাকা গাড়ি করে রায়পুরের দেবাংশী চার পাঁচজনকে নিয়ে হাজির হয়। দাদুকে নিয়ে আমরা মনসাতলা পৌঁছাতেই শুরু হয় বেধড়ক মার। সবাই মিলে দাদুকে মারধর করতে শুরু করে। এত মার মারে যে দাদু আধমরা হয়ে যায়। একটা চোখ দারুণভাবে জখম হয়। দাদু হাত জোড় করে বলেন, ‘আমাকে বলি দিলেও তোমরা ঘটি পাবে না। কারণ তেমন কিছু নেই আমার কাছে।’ সেই সময় ফন্দি সর্দারের জন্ডিসে আক্রান্ত ছেলে হরিশচন্দ্র বাড়িতেই শুয়েছিল। তাকেও অসুস্থ শরীরে নিয়ে যাওয়া হয় মনসাতলায়। সেখানেই গোটা পরিবারকে শপথ করানো হয়, ফন্দির আঙুল কাটার। না হলে বাড়ির যে কোনও তিনজন অচিরেই মারা যাবে। এই ‘শপথ’ গ্রাস করে অন্ধ বিশ্বাস আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ফন্দি সর্দারের পরিবারকে। সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত চলে এই দক্ষযজ্ঞ। শেষ পর্যন্ত হরিশচন্দ্রের দা মঙ্গলবার ভোরে উঠোনের উপর পাতা পাটাতনে রাখা বাবা ফন্দির আঙুল দশটাই শরীর থেকে আলাদা করে দেয়। ফন্দি সর্দারের এক বৌমা জানান, ‘‘কী করব। এমন শপথ করালো। তিন জন মারা যাওয়ার থেকে তো দশটা আঙুল যাওয়া ভালো।’’ অপরদিকে এদিনও সেই সুমি সর্দার দাবি করে চলেছে যে তার মাথায় ‘ভর’ আছে। ফন্দি সর্দারই এর জন্য দায়ী। ব্লক প্রশাসন ও পুলিশ আধিকারিকদের সামনেও এদিনও সেই একই কথা বলেছে। ব্লক প্রশাসনের এক কর্তা জানান, ‘‘মানসিক রোগগ্রস্ত এই সুমির অবিলম্বে চিকিৎসা প্রয়োজন।’’ এই ঘটনায় খরচও হয়েছে বেশ মোটা টাকা। রায়পুরের সেই দেবাংশী গ্রামকে ‘শাপমু্ক্ত’ করার বিনিময়ে পরিবার পিছু একশো ধার্য করেছে যজ্ঞের জন্য। আর সেই দেবাংশীকে নিরুপদ্রবে বুজরুকির কারবার চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে গাঁয়ের মাতব্বররা, ‘উন্নয়ন’ বাহিনীর সদস্য। 
এদিন গ্রামে গিয়েছিলেন বিজ্ঞান মঞ্চের প্রতিনিধি সুশীল ঘোষ, দেবাশিস পাল, সন্তোষ চ্যাটার্জি, সিফাত জামিল, শেখ সেলিম, শুভাশিস গঁড়াইরা। গ্রামের মানুষ, আক্রান্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। পাড়ুই থানাতেও দেখা করেন মঞ্চের প্রতিনিধিরা। বিজ্ঞান মঞ্চের পক্ষ থেকে অবিলম্বে গ্রামে একটি সচেতনতা শিবির করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এদিকে গ্রেপ্তার হওয়া ফন্দি সর্দারের ছেলেসহ পাঁচ আত্মীয় এবং সুমি সর্দারের বাবা বলরাম সর্দারকে এদিন আদালতে তোলা হলে তাদের মধ্যে চারজনকে সাত দিনের পুলিশ হেপাজত এবং দুজনকে চোদ্দ দিনের জেল হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement