দাড়িভিটে তদন্তে জাতীয়
মানবাধিকার কমিশন

দাড়িভিটে তদন্তে জাতীয়<br>মানবাধিকার কমিশন
+

 নিজস্ব সংবাদদাতা: রায়গঞ্জ, ১১ই অক্টোবর— পুলিশের গুলিতে দুই ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় এবার দাড়িভিটে এল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল। বৃহস্পতিবার দুপুরে দাড়িভিট গ্রামে পৌঁছালো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পাঁচ সদস্যর প্রতিনিধি। এই তদন্তের দায়িত্বে দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের তদন্তকারী আধিকারিক ডি আই জি ছায়া শর্মা। যদিও পুলিশ বাহিনীর গুলিতে দাড়িভিট স্কুলের দুই প্রাক্তন ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় এখনও নিপাট দর্শকের ভূমিকায় রাজ্য মানবাধিকার কমিশন।

গত ২০শে সেপ্টেম্বর দুপুরে ইসলামপুরে দাড়িভিট স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্কে বিক্ষোভে শামিল হয় স্কুলেরই সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। সেই ঘটনাতেই স্কুলের ছাত্রদের বিক্ষোভ সামলাতে পুলিশ গুলি চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। গুলিতে মৃত্যু হয় দাড়িভিট হাইস্কুলের দুই প্রাক্তন ছাত্র রাজেশ সরকার ও তাপস বর্মনের। এরপরেই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় পুলিশ প্রশাসনকে। নিহতে বাড়িতে দেখা করতে আসলে কার্যত তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে গ্রাম ছাড়তে হয় তৃণমূলের মন্ত্রী গোলাম রব্বানি, স্থানীয় তৃণমূলী বিধায়ক কানাইলাল আগরওয়ালকে। এমনকি গ্রামবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, অবরোধের মুখে পড়ে গ্রামেও ঢুকতে পারেননি তৃণমূলের দাপুটে মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারিও। 
পরিস্থিতি এমনই যে, ২১দিন পেরনোর পরেও এখনও পর্যন্ত দাড়িভিট স্কুল খোলেনি। নিহত দুই ছাত্রের নিথর দেহ এখনও স্কুল লাগোয়া দলঞ্চা নদীর ধারে মাটিতে পুঁতে রেখেছে গ্রামবাসীরা। যাতে পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় কোনও তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করে তখন ফের ময়নাতদন্ত করা যাবে দুই দেহের। মমতা ব্যানার্জি সি আই ডি তদন্তের ঘোষণা করেছেন। গ্রামবাসীরা মানেননি। নিহত দুই ছাত্রের পরিবারের তরফেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পুলিশের গুলিতে তাঁদের সন্তান খুন হয়েছে, তাই রাজ্য পুলিশ বা রাজ্যের কোনও তদন্তকারী সংস্থা দিয়ে তদন্ত তারা মানবেন না। সি আই ডি-র তদন্তে অসহযোগিতা করা হবে বলেও জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা।
এই পরিস্থিতিতেই ঘটনা প্রায় তিন সপ্তাহ পরে গ্রামে সেদিনের ঘটনার তদন্তে এল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল, যার মাথায় রয়েছেন দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের তদন্তকারী আধিকারিক ছায়া শর্মা। বুধবার দিল্লি থেকে ইসলামপুরে এসেই বিকাল থেকেই  তিনি ওই দলের অন্যান্যদের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করেন। ইসলামপুর সার্কিট হাউসে বসে গ্রামের অনেকের সাথে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আন্দোলনকারী একাধিক গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তারপর এদিন ছায়া শর্মার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের দল দাড়িভিট গ্রামে আসে। প্রথমেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত তাপস বর্মণের বাড়িতে যান তাঁরা। দাড়িভিট হাইস্কুলের ঠিল উলটো দিকেই তাপস বর্মণের বাড়ি। বাড়ির সামনে নিজেদের মিষ্টির দোকানে কাজের সময়তেই গুলি লাগে তাঁর। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে তাঁর মৃত্যু হয়। চিকিৎসা নিয়েও অভিযোগ ওঠে। ছায়া শর্মা এদিন তাপস বর্মণের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একপ্রস্থ আলোচনা করেন। তাপস বর্মণের মা মঞ্জু বর্মণ, বোন ডলি বর্মণ ও তাঁর বাবা বাদল বর্মণের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিদল। তাঁদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনেন। 
এরপর তাঁরা পৌঁছান দাড়িভিট হাইস্কুলে। বন্ধ স্কুল থেকে দাড়িভিট বাজার ঘুরে দেখেন তাঁরা। ছবি তোলেন, স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলেন। সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নেয় প্রতিনিধিদল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এই তদন্তের মূল দায়িত্বে থাকা ডি আই জি ছায়া শর্মা এদিন কোনও মন্তব্য করতে না চাইলেও শুধু জানান, "ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। শেষ হতে দিন। এখনই কিছু বলা যাবে না"। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত এলাকায় থেকেই তদন্তের কাজ করবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এই প্রতিনিধিদল। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, মানবাধিকার কমিশন তাদের তদন্তের ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাইলে সব রকম সাহায্য করবেন।
এদিকে তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও দাড়িভিট স্কুলের দরজার তালা খুলল না। দাড়িভিট, সুখানিভিটার মতো একাধিক গ্রাম জুড়ে এখনও শোক, যন্ত্রণা, ক্ষোভের পরিবেশ। সন্তানহারা মায়েদের কান্নার মাঝে প্রশাসন আর শাসক দলের চাপে পড়ে পাঁচ শিক্ষক স্কুলে ঢুকতে এলে ফের বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রশাসন আর শাসক দলের নির্দেশ মেনেই স্কুলে এসেছিলেন পাঁচ শিক্ষক-শিক্ষিকা। ২১ দিন কেটে গেলেও নিরুদ্দেশ প্রধান শিক্ষক, স্কুল পরিচালন সমিতির সভাপতি, সম্পাদকরা। যাঁদের বিরুদ্ধে গোটা ঘটনাকে জটিল করে তোলার অভিযোগ রয়েছে। বুধবার স্কুলে আসছেন শিক্ষক শিক্ষিকাদের কয়েকজন, এই খবর পৌঁছাতেই পুলিশের গুলিতে নিহত দুই প্রাক্তন ছাত্র রাজেশ সরকার, তাপস বর্মণের পরিবার এবং গ্রামবাসীরা স্কুল মাঠে পৌঁছে যান। শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছে ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে ষ্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন গ্রামের মানুষের দাবিকে অমর্যাদা করে কেন স্কুলে এসেছেন? মহকুমা শাসক জানান, স্কুলের শিক্ষকদের ভয় দেখানো হচ্ছে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই মন্তব্যে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়েছে। এদিন যদিও কোনও শিক্ষক আর স্কুল চত্বরে আসেননি। ছাত্রছাত্রীরাও স্কুলের পোশাকেই প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement