ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেন
রামলীলার রাবণও

ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেন<br>রামলীলার রাবণও
+

সন্দীপন দত্ত: অমৃতসর,২০শে অক্টোবর- রামলীলার রাবণ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেন। বাজি-ভরা খড়ের পুতুলের রাবণ নন, রামলীলায় অভিনয় করা রক্তমাংসের দলবীর সিং। 
জোড়া ফটকের কাছেই ধোবি ঘাটের রামলীলা প্রাঙ্গণে একটু আগেই হয়েছে রামলীলার পালা। যেমন প্রতিবছরই হয়। রাবণের ভূমিকায় অভিনয় করেন দলবীর। যেমন গত পাঁচ বছর ধরেই করে থাকেন। বছর পঁচিশেকের দলবীর অভিনয় শেষে নেমে এসে মিশে গিয়েছিলেন ভিড়েই। রেলওয়ে লাইনের পাশেই দাঁড়িয়ে আরো কয়েকশত লোকের সঙ্গে দেখছিলেন বাজি পোড়ানো। জলন্ধর থেকে আসা ট্রেনের শব্দ সম্ভবত চাপা পড়ে যায় বাজির প্রবল শব্দে। ততক্ষণে ট্রেনের চাকার তলায় চাপা পড়ছেন মানুষ। দলবীরের বন্ধুরা জানিয়েছেন, দলবীর অন্যদের বাঁচাতে গিয়েছিলেন। ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলেন ছ’-সাত জনকে। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। 
কেঁদেই চলেছেন দলবীরের মা। রাবণ ছাড়াও অন্য ভূমিকায় অভিনয় করত দলবীর, বারবার বলে চলেছেন সে-কথাই। 
মৃতদের বড় অংশই পরিযায়ী শ্রমিক। অমৃতসরের শিল্পাঞ্চল এলাকায় কাজ করেন উত্তর প্রদেশ, বিহারের পরিযায়ীরা। এই উৎসবে বাড়ি ফেরা হয় না, ছুটি মেলে না। রামলীলার দিন হাজির হন ধোবিঘাটে। কে যে কোথায় প্রাণ হারিয়েছেন, কে ভর্তি রয়েছেন হাসপাতালে চব্বিশ ঘন্টা পরেও তা স্পষ্ট নয়। দুর্ঘটনার পরই রেললাইনে আত্মীয়-পরিচিতদের খুঁজে বেড়িয়েছেন মানুষ। কেউ ছুটেছেন হাসপাতালে। উত্তর প্রদেশের হরদোইয়ের বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিক রুদাল খুঁজে চলেছেন ভাই ব্রিজ ভানকে। ‘আমরা মাজিথা রোডে থাকি। ভাই এসেছিল চার বন্ধুকে নিয়ে। বন্ধুদের একজন অল্প চোট পেয়েছে। কিন্তু ভাইকে কোথাও পাচ্ছি না’— কাতর আর্তি তাঁর। 
বিহারের গোপালগঞ্জ থেকে আসা শ্রমিক মতিলাল আঘাত পেয়েছেন বুকে। তাঁর বিবরণ, লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎই লোকে দৌড়াতে শুরু করলে পড়ে যাই। ‘এক সেকেন্ডের মধ্যে যা ঘটার ঘটে যায়’, সিভিল হাসপাতালে ভর্তি মতিলাল বলেছেন। গুরু নানক হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অধিকাংশই বিহার, উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা। 
রাবণের কুশপুতুলের বাজির প্রবল শব্দ, আতশবাজির আকাশে উঠে ফেটে যাওয়ার শব্দ এবং সমবেত মানুষের চিৎকারেই যে ট্রেন আসার শব্দ চাপা পড়েছিল, তা জানাচ্ছেন প্রায় সব প্রত্যক্ষদর্শীই। ধোবি ঘাটের পাঁচিলে দাঁড়িয়ে রাবণ-দহন দেখছিল কিশোর সন্দীপ সিং। কুশপুতুলে আগুন ধরানোর পরেই বাজির শব্দে কানে হাত দিয়েছিল। হঠাৎ আর্তনাদ শুনে পিছন ফিরতেই দেখে ট্রেন চলে যাচ্ছে মানুষের ওপর দিয়ে। ‘ট্রেনের লাইনে পড়ে আছে শরীরের অংশ, দেহ, রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সকলে দৌড়ে গিয়ে উদ্ধার করার চেষ্টা করে। হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সরকার যা বলছে তার থেকে অনেক বেশি লোক মারা গেছে’— বিবরণ সন্দীপের। 
কয়েক মিনিট আগেই পাশ দিয়ে গেছে হাওড়ামুখী অমৃতসর মেল। ট্রেনের লাইন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন মানুষ। ধীরে ধীরে চলে যায় ওই ট্রেন। অথচ জলন্ধর থেকে আসা ডি এম ইউ-র গতিও কমেনি, লাইনে দাঁড়ানো মানুষ টেরও পাননি। বেসরকারি ভাষ্যে রেল সূত্রে জানানো হচ্ছে, ওখানে একটি বাঁক রয়েছে। রামলীলার কুশপুতুলের বাজির ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়েছিল চারদিক। চালকের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না লাইনে এত লোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী সুখপাল বলেছেন, লাইনে কোনও আলো ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ট্রেন এত মানুষের দেহের ওপরে দিয়ে চলে যাবার সময়ে বিস্ফোরণের মতো চিৎকার শোনা যায়। 
অনেকেই দায়ী করেছেন দশেরার সংগঠকদের। ঘটনাস্থলে উপস্থিত যশবিন্দার বলেছেন, এত ছোট জায়গায় রামলীলা হচ্ছিল যে মাঠ উপচে লোকে ট্রেনের লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। রেললাইনের পাশে কোনও বাঁশের ব্যারিকেডও দেওয়া হয়নি। 
শুক্রবার সারারাত নিখোঁজদের সন্ধানে ছুটে বেরিয়েছেন মানুষ। বিজয় কুমারের দুই পুত্রই গিয়েছিলেন উৎসবে। ছোট ছেলে আশিস নিরাপদে ফিরে এলেও রাতভর খোঁজ মেলেনি বড় ছেলে মনীশের। ভোর তিনটেয় বিজয় কুমারের হোয়াটসঅ্যাপে ভেসে ওঠে মনীশের দেহবিচ্ছিন্ন মাথার ছবি। সর্বনাশা আশঙ্কাই সত্যি হয়। তারপর থেকে সন্তানের দেহখণ্ডই খুঁজছেন পিতা। 
ট্রেন আসছে, শেষ মুহূর্তে বুঝে পালানোর সময়ে পদপিষ্ট হয়েও মারা গেছেন অনেকে। মাথায় আঘাত নিয়ে চিকিৎসাধীন স্বপ্না জানিয়েছেন, লাইন থেকে এধার-ওধার সরতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে মারা গিয়েছেন তাঁর এক বোন। বোনের কোলে থাকা এক বছরের সন্তান ছিটকে পড়ে পাথরে আঘাত পেয়ে মারা গেছে। 
শনিবারও সারাদিন অমৃতসরের হাসপাতালে উপচে পড়েছে ভিড়। সিভিল হাসপাতাল থেকে গুরু গোবিন্দ হাসপাতালে ছুটে এসেছেন আত্মীয়স্বজন। শনিবার সকাল পর্যন্তও সুশীলা খুঁজে পাননি তাঁর হারানো ছেলে জুগুকে। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে দৌড়েও মেলেনি সন্ধান। আহতরা কে কোথায় ভর্তি রয়েছেন, তা জানতেই স্বজনদের দিন গড়িয়ে গেছে। 
অমৃতসর শহরও শোকস্তব্ধ। বাজার, দোকানপাট বন্ধ। অমৃতসরমুখী বহু ট্রেন বাতিল। পর্যটকরাও আসতে পারেননি। স্বর্ণমন্দিরে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের অনেকেই ফিরতে পারেননি। মন্দির প্রাঙ্গণেই থেকে গেছেন বহু মানুষ। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মনীশ পুরী, অভিষেক সুদ বলছিলেন, এত বড় দুর্ঘটনার পরে বাতিল হয়েছে বহু বুকিং। 

 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement