অথ কুস্তি-কথা

অনন্ত মণ্ডল

১৮ আগস্ট, ২০১২

Image

+

সদ্য সমাপ্ত ওলিম্পিক্সে ভারতের চার-চারটে ব্রোঞ্জ আর দুটো রুপোর মেডেল জয়ের দৌলতে, বিশেষ করে সুশীলকুমারের বেজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিগত ওলিম্পিক্সে আর এবারের ওলিম্পিক্সে কুস্তিতে মেডেল পাওয়ায় একেবারে হৈ-হৈ রৈ-রৈ পড়ে গেছে সারা দেশে। আজ পর্যন্ত কোনো ভারতীয় ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতায় দুটি ওলিম্পিক্সে সুশীলকুমারের মতো দুটো মেডেল অর্জন করতে পারেননি। অসাধারণ কৃতিত্ব। তবে হ্যাঁ , এই ব্যাপারটি নিয়ে এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কাণ্ডকারখানা রীতিমতো দেখবার মতো। মনে হবে এদেশে ‍‌খেলাধুলোর জন্যে কত কিছুই-না করেছে। ২০০৮সালে বেজিংয়ে ওলিম্পিক্স হওয়ার সময় ভারতের ক্রীড়ামন্ত্রী ছিলেন নির্বাচন কমিশনের একদা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কে পি এস গিল। সুশীলকুমার বেজিং থেকে কুস্তিতে ব্রোঞ্জ মডেল নিয়ে ফেরার পর মন্ত্রীমশাই সুশীলকুমারকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন। সুশীলকুমার একটা অটো ভাড়া করে মন্ত্রীমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। গণ্ডা গণ্ডা টিভি চ্যানেলে সে দৃশ্য দেখানো হয়েছিল তখন। একটা গাড়ি পাঠিয়ে সুশীলকুমারকে নিয়ে আসার মতো সৌজন্যটুকু সেদিন দেখানো হয়নি ভারত সরকারের এক মন্ত্রীর পক্ষে। এত অনীহা, এত ঔদাসীন্য সত্ত্বেও গগন নারাঙ,সুশীলকুমার, যোগেশ্বর, বিজয়কুমার, সাইনা, মেরি কমরা যা করেছেন, তাতে সারা ভারতের সাধারণ মানুষ গর্ববোধ করছেন, অজস্র সাধুবাদ জানাচ্ছেন। আরেকটি বিষয় প্রচারমাধ্যমগুলি প্রচার করছে যে, কুস্তি খেলাটা নাকি দু-একটা রাজ্যেরই ঐতিহ্য। বলাই বাহুল্য, এই রাজ্যগুলির মধ্যে বাংলার কথা কেউ ভুলেও উচ্চারণ করেন না। ভারতের প্রথম বিশ্ব মল্লযুদ্ধ বা কুস্তির আসর এই কলকাতার বুকে বসেছিল কিংবা উনিশ শতকের একসময় বাংলার মেয়েরাও কুস্তি করতো সেকথা আমরা ভুলে গেছি। ভুলে গেছি রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরও কুস্তির আখড়ার মাটি মেখেছেন। ভুলে গেছি কুস্তি, দেহচর্চা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা অংশ।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র উনিশ শতকের কলকাতার বাবুদের গুণপনার (?), তাঁদের রুচির, তাদের সংস্কৃতির বর্ণনা করেছেন ‘বাবু’ নামের রম্যরচনায়। বলেছিলেন, ‘যিনি উৎসবার্থ দুর্গাপূজা করিবেন, গৃহিণীর অনুরোধে লক্ষ্মীপূজা করিবেন, উপগৃহিণীর অনুরোধে সরস্বতী পূজা করিবেন, এবং পাঁঠার লোভে গঙ্গাপূজা করিবেন, তিনিই বাবু।’

অবক্ষয়ী এই বাবু-সংস্কৃতির মধ্যে থেকেও কেউ কেউ একটু অন্যরকম সংস্কৃতির পথেও পা বাড়াতেন বই কি। আখেরে জমিদার হলেও রবীন্দ্রনাথ তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

এই অন্যরকম সংস্কৃতির হাত ধরেই উনিশ শতকের বিশেষ দশকে কলকাতায় আমোদ-প্রমোদের মাধ্যম হিসেবে শুরু হয় কুস্তি প্রতিযোগিতা। কুস্তিকে ভালো কথায় বলে মল্লযুদ্ধ। কুস্তি বা মল্লযুদ্ধ এদেশের এক প্রাচীন খেলা। রামায়ণ, মহাভারতেও এই মল্লযুদ্ধের উল্লেখ আছে। তখন অবশ্য এটা খেলা ছিল না, ছিল যুদ্ধ। রামায়ণে বালি ও সুগ্রীবের মধ্যে, মহাভারতে ভীম ও জরাসন্ধের মধ্যে মল্লযুদ্ধের কথা অনেকেরই জানা।

ভারতে বড় বড় কুস্তিগির জন্মেছেন, যাদের সমকক্ষ ইউরোপ, আমেরিকায় জন্মায়নি। ভারতীয় কুস্তিগিরদের মধ্যে সর্বকালের সেরা হলেন গামা পালোয়ান। এর আগে ছিলেন গুলাম পালোয়ান, যাঁকে ভারতের কুস্তিগিররা তাঁদের দেবতা বলে মনে করেন।

কলকাতায় কুস্তিকে খেলা হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলেন রাজা বৈদ্যনাথ রায়। তিনি ছিলেন রীতিমতো কুস্তিপ্রেমিক। কুস্তি খেলার জন্যে নিজের বাগানে একটা বড়োসড়ো আখড়াও তৈরি করিয়েছিলেন তিনি বহু অর্থব্যয় করে। সেখানে প্রতিবছর ভারতের নানা জায়গা থেকে কুস্তিগিররা কুস্তিতে অংশগ্রহণ করতেন। কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা, এমনকি সাহেবসুবরাও আমন্ত্রিত হয়ে কুস্তি দেখতে আসতেন সাগ্রহে। এছাড়াও দর্শক হিসেবে ভিড় জমাতেন অগণিত সাধারণ মানুষ।

সেকালের বিখ্যাত সংবাদ-সাময়িকী ‘সমাচার দর্পণ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ১৮২৫সালে রাজা বৈদ্যনাথের বাগানের আখড়ায় একটা বড় কুস্তির আসর বসে। তখনকার বেশ কয়েকজন নামকরা কুস্তিগির বা মল্লবীর যোগ দেন। এই কুস্তির লড়াইয়ের বিবরণ দিতে গিয়ে ‘সমাচার দর্পণ’ লিখছে, ‘দুই ২ জন এক ২ বার মল্লযুদ্ধ করে প্রথমে হাতাহাতি পরে মাতামাতি মাকামাকি ঝাঁকাঝাঁকি হুড়াহুড়ি দুড়াদুড়ি ঠাসাঠাসি কষাকষি ফেলাফেলি ঠেলাঠেলি শেষে গড়াগড়ি বাড়াবাড়ি উলটাপালটি লপটালপটি করিয়ে বড় শক্তাশক্তির পর একজন জয়ী হয় তাবত লোক তাহাকে সাবাস ২বলিয়া উঠে।’

সেইসময় কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভৃত্যদের মধ্যে কুস্তিচর্চার রেওয়াজ ছিল। একবার রাজা বৈদ্যনাথের বাগানের আখড়ায় পাথুরিয়াঘাটার নন্দলাল ঠাকুরের ভৃত্য বৈদ্যনাথ মিস্টার পামারের ভৃত্যকে কুস্তির প্যাঁ চে পরাস্ত করে পুরস্কার লাভ করেন। বৈদ্যনাথ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে আকারে ছোট থাকা সত্ত্বেও মনের জোর, দেহের প্রবল শক্তি আর কুস্তির উন্নত প্যাঁ চের জোরে তাঁকে ধরাশায়ী করে উপস্থিত দর্শকদের বিপুল প্রশংসা লাভ করেছিলেন।

সেইসময় অর্থাৎ উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতার বেশ কিছু ধনী ব্যক্তির বাড়িতে কুস্তির আখড়া ছিল, এমন কি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও যেখানে রবীন্দ্রনাথকে অবধি ছোটোবেলায় কুস্তি করতে হয়েছে ব্যায়ামচর্চার অঙ্গ হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’-তে লিখছেন — ‘‘ভোরে অন্ধকার থাকিতে উঠিয়া লংটি পরিয়া প্রথমেই এক কানা পালোয়ানের সঙ্গে কুস্তি করিতে হইত।’’ বলা হয়ে থাকে সংস্কৃত কলেজে একটা কুস্তির আড্ডা করেছিলেন বিদ্যাসাগর। হরিশ্চন্দ্র কবিরত্ন লিখেছেন, ‘‘সংস্কৃত কলেজের ঈশান কোণে একটি প্রকাণ্ড ঘণ্টা ঝুলানো ছিল। ঐ ঘণ্টা বাজিলে বিদ্যালয়ের কার্য আরম্ভ হইত। ঐ ঘণ্টা-গৃহের পূর্বদিকে একটি মালির ঘর ছিল। ঐ ঘরে অধ্যাপক মহাশয়গণ বিশ্রাম করিতেন ও কেহ-কেহ তামাক খাইতেন। ঐ গৃহের পূর্বদিকে আর একটি বৃহৎ ‘হল্‌’ ঘর ছিল। ঐটিতে ‘পণ্ডিতগণ’ কুস্তি প্রভৃতি ব্যায়াম করিতেন। আমি ‘পণ্ডিতগণ’ বলিলাম, তাহার কারণ, ঊর্ধ্বতন অধ্যাপক-মহাশয়-চতুষ্টয় অর্থাৎ জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন, ভরতচন্দ্র শিরোমণি, প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশ ও তারানাথ তর্কবাচস্পতি মহাশয় ঐ কুস্তির আড্ডায় যোগ দিতেন না। অপেক্ষাকৃত বয়ঃকনিষ্ঠ পণ্ডিতগণ অর্থাৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন, গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, এবং তারাশঙ্কর তর্করত্ন—এই কয়েকজন কুস্তির আড্ডায় যোগ দিতেন...। এই ব্যায়াম-কার্য্য বিদ্যাসাগর-মহাশয় স্থাপিত করেন এবং এ কার্যে তাঁহার খুব উৎসাহ ছিল। এই ব্যায়াম করাতেও পণ্ডিতমহাশয়গণ সকলেই খুব সুস্থ শরীর ছিলেন এবং প্রায় রোগে পড়িতেন না। ...বিদ্যাসাগর মহাশয় খুব সুস্থ শরীর ছিলেন।’’

কলকাতায় কুস্তির ইতিহাস থেকে জানা যায় যে রাজা বৈদ্যনাথের সমসাময়িক জমিদার শ্রীনাথবাবুর বাগানের আখড়ায় প্রতিবছর শীতের আগে বিশালাকারে কুস্তির আসর বসত। এই আসরে বাঙালী কুস্তিগির ছাড়াও অন্যান্য রাজ্য থেকে অবাঙালী কুস্তিগিররা আসতেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটা বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৮২৫সালের ৯ই আগস্ট শ্রীনাথবাবুর বাগানে একটা বড় কুস্তির আসর বসেছিল যাতে নানা জায়গা থেকে আসা বাঙালী-অবাঙালী সকল অংশের কুস্তিগির অংশগ্রহণ করেন। কুস্তিগিরের জাত বা ধর্ম নয়, তাঁর খেলার দক্ষতাটাই ছিল সব থেকে বড় কথা, সেরা পরিচয়।

অবাক করে দেবার মতো খবর যেটা, সেটা হলো সেকালে মেয়েরাও কুস্তি লড়তেন। পাথুরিয়াঘাটার দেওয়ান নন্দলাল ঠাকুরের বাড়ির সামনের আখড়ায় বিকেলবেলায় বালিকাদের মল্লযুদ্ধ হতো। ‘‘বিশেষত বালিকাদিগের যুদ্ধ সন্দর্শনে কে না আহ্লাদিত হন।’’ — এমন মন্তব্যও প্রকাশিত হলো সংবাদপত্রে। বালিকাদের এই কুস্তি দেখার জন্যে মাঝেমধ্যেই দর্শকদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেঁধে যেত। তবে দেওয়ান নন্দলাল ঠাকুর ছিলেন কড়া ধাতের মানুষ। কঠোর হাতে দমন করতেন এই রকম হৈ-হুজ্জুতি। বহুকাল আগেই অবশ্য মেয়েদের কুস্তি লড়া বন্ধ হয়ে গেছে।

সেই সময় কলকাতা ছাড়াও বাংলাদেশের সর্বত্র দেহচর্চার প্রতি আগ্রহ জন্মায় রাজা মহারাজা জমিদারদের অনুগ্রহে। কুস্তির জয়-পরাজয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্মান বৃদ্ধি ও হ্রাসের প্রশ্নটি জড়িয়ে ফেলেছিলেন তারা। আর সেই জন্যে কুস্তির পিছনে প্রচুর অর্থব্যয় করতে পিছুপা হতেন না ওরা। এই কারণে ধনী লোকেরা নিজের বাড়িতে ভোজপুরী পালোয়ান রাখতে শুরু করেন। এদের দারোয়ান, প্রহরীরাও নিয়মিত ব্যায়ামচর্চায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। কলকাতায় এদের সংখ্যা ছিল ভূরিভূরি। মধ্য কলকাতার কিছু থানাতে এবং আশেপাশে আখড়া ছিল যেখানে হিন্দিভাষী কনস্টেবলরা কুস্তিচর্চা করতেন। পরবর্তীকালে কলকাতায় স্বাধীনতা-সংগ্রাম বিশেষত সশস্ত্র মুক্তি-সংগ্রাম জোরদার হয়ে ওঠার সময় কুস্তিসহ দৈহিক ব্যায়ামচর্চার ব্যপ্তি ঘটে।

১৮৯২সালে বা তার কাছাকাছি সময়ে কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের উদ্যোগে ও উৎসাহে কলকাতায় বিশ্ব মল্লযুদ্ধ প্রতিযোগিতার আসর বসে। এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বখ্যাত মল্লবীর টম ক্যাননকে পরাজিত করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন ভারতীয় মল্লবীর করিমবক্স। তবে কুস্তি বা মল্লযুদ্ধকে যাঁরা বিশ্বের দরবারে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করেন তারা হলেন কলকাতার গুহ পরিবারের অম্বু গুহ ও তার উত্তরপুরুষ ক্ষেত্র (যিনি বিবেকানন্দকে কুস্তি করতে শিখিয়েছিলেন), পঞ্চানন এবং সর্বোপরি যতীন্দ্রচরণ গিনি গোবর গোহ নামেই সমধিক পরিচিত। শিক্ষিত, রুচিবান গোবরবাবু বিশ শতকের দুই ও তিনের দশকে কলকাতার ভদ্রসমাজে শরীর-চর্চার উপায় হিসেবে কুস্তিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৯২১সালে সানফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব মল্লযুদ্ধের প্রতিযোগিতায় লাইট-হেভিওয়েট বিভাগে বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন হয়ে কলকাতা তথা ভারতের মুখোজ্জ্বল করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পর্যন্ত কলকাতার বাঙালী ভদ্রসমাজে কুস্তি বা মল্লযুদ্ধের প্রতি যে আকর্ষণ ছিল, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নানা কারণে সে আকর্ষণ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে। কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গ মল্লযুদ্ধ চর্চার একটি সাংগঠনিক কেন্দ্র থাকলেও তার কার্যকলাপ সম্পর্কে জনগণ তেমন অবহিত নন। এই দেশজ খেলাটি তার হারানো গৌরব পুনরায় ফিরে পেতে পারে যদি সাধারণ মানুষের মধ্যে এই খেলাটি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। তার জন্যে দরকার এই খেলার জন্যে রাজ্যস্তরে একটি শক্তিশালী সংগঠন। চাই কেন্দ্রীয় আর রাজ্য সরকারের এই ধরনের খেলার বিষয়ে সঠিক নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতা। আর তাহলেই কলকাতাসহ পশ্চিমবাংলায় দেখা মিলবে অনেক গোবর গোহের। ওলিম্পিক্সের মেডেলও মিলতে পারে কোনো একদিন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement