আজই শতবর্ষে পা দিলেন কবি দিনেশ দাস
সেই আপসহীন, সংগ্রামী কবিকে স্মরণ
‘কাস্তে’ কবি

বিশ্বনাথ কয়াল

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

Image

+

লেখক সমবায় (১৯৫৯) এবং ভারবী (১৯৭২) প্রকাশিত দুটি শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলনের প্রত্যেকটির ভূমিকায় কবি দীনেশ দাস কবির ব্যক্তি বা সামাজিক জীবনের সঙ্গে তাঁর কাব্যজীবনের গভীর সম্পর্কের উল্লেখ করে বলেছেন— ‘প্রতিটি কবিকর্মকে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেখাই যুক্তিসংগত। তবে কবির জীবন যেমন তাঁর কাব্যে প্রকাশিত তেমনই তাঁর কাব্যও অনেক সময় তার জীবনের মধ্যে রূপায়িত।’ একই প্রসঙ্গ এ‍‌সেছে তাঁর ‘কাচের মানুষ’ কাব্যগ্রন্থে ‘কাব্যচিন্তা; কবিতাগুচ্ছের ‘জীবন ও সাহিত্য’ শিরোনামে লেখা লাইনে—

জানতাম, জীবনের প্রতিবিম্ব/ উপন্যাস কবিতা সম্ভার।/ সাহিত্যের প্রতিবিম্ব এ জীবন কিনা/ মনে মনে ভাবি ‘বারবার’। কবির শততম জন্মবর্ষে তাঁকে বুঝতে তাই প্রথমে তাঁর কাব্যময় জীবনের রূপরেখা পেশ করা জরুরী।

আদি গঙ্গার তীরে আলিপুরে চেতলা অঞ্চলে (৬৫ এফ জয়নুদ্দি মিস্ত্রি লেন, কলি-২৭) তাঁর মাতুলালয়ে ১৯১৩সালে ১৬ই সেপ্টেম্বর কবির জন্ম। পিতা হৃষিকেশ দাস, মাতা কাত্যায়নী দেবী। কবির দুটি ভাই শৈলেন ও মনোজ এবং এক বোন জয়শ্রী দাস। বারো বছর বয়সে ৭ম শ্রেণীতে পড়ার সময় কবি ছড়া মেলাতে শুরু করেন। কিন্তু নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় জনৈক বর্মনদার নেতৃত্বে গোপন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। অন্যদিকে গান্ধীজীর লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে, তথাপি ১৯৩০সালে সসম্মানে ম্যাট্রিক ও ১৯৩২সালে আই-এ পাস করেন, ১৯৩৩-৩৪ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজে বি এ ক্লাসে ভর্তি হন। এই সময়ে ১৯৩৪সালে তাঁর প্রথম কবিতা ‘শ্রাবণে’ দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

এদিকে পুরনো বিপ্লবী সমিতির কাজ ও কাব্যসাহিত্য চর্চার চাপে বি এ পরীক্ষা দেওয়া হলো না। বাবা সরকারী চাকরি নিতে বলায় দ্বিমত হয়ে কবি ১৯৩৫সালে কলকাতা ছেড়ে কার্শিয়াং-এর খয়াবাড়ি চা বাগানে চাকরি নিয়ে চলে যান। সেখানে চা বাগানের নিপীড়িত কুলিদের বঞ্চনা ও দারিদ্র্য মোচনে গান্ধীবাদী অহিংস পথের কার্যকারিতা সম্পর্কে সংশয়াপন্ন হয়ে উঠেন। পরের বছর ১৯৩৬কবি কলকাতায় ফিরে আসেন।

কলকাতায় ফিরে অন্যান্য কবিদের মতো তিনি গদ্যরীতিতে কাব্যরচনায় যুক্ত হয়ে লিখলেন ‘প্রথমবৃষ্টির ফোঁটা’, ‘মৌমাছি’, ‘নখ’, ‘হাই’, ‘চায়ের কাপে’- সহ নানা কবিতা, তখনও কবির কোন সংকলন প্রকাশিত না হওয়া সত্বেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’ সংকলন গ্রন্থে ‘মৌমাছি’ অন্তর্ভুক্ত করেন। একই সময়ে তখনকার কলকাতার সর্বত্র সাম্যবাদ ও কমিউনিজমের আলোচনার পরিবেশে কবিও মার্কস, এঙ্গেলসের পাশাপাশি র‌্যালফ্‌ ফকস্‌ প্রমুখ সাম্যবাদী ব্যক্তিদের দর্শন ও সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন। স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। এরই ফলে কাব্যজগতে তিনিও রোমান্টিসিজমের নদী পেরিয়ে ধীরে ধীরে বাস্তবতার ডাঙায় উঠে এলেন। এই সময় ফ্যাসিবাদের গুরু মুসোলিনি ইথিওপিয়ায় বোমা ফেলে হাজার মানুষকে মেরে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরু করেন। আর হিটলারের উত্থানের শুরু। দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধের আগাম পদধ্বনি। এই পরিপ্রেক্ষিতে কেবলমাত্র শ্রমিক কৃষক সকল মেহনতী জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ একে পরাস্ত করতে পারে এই বিশ্বাসে স্থিত হয়ে লিখলেন ১৯৩৭সালে ‘কাস্তে’, (কবিতা ১৯৪২)। আহ্বান করলেন সকল শ্রমজীবীদের হাতিয়ারের প্রতীক হিসাবে কাস্তে শান দিতে। এই কবিতা মুহূর্তে ইতিহাস রচনা করল, যেন সমাজমানসের অন্তঃস্থলের একান্ত চাহিদা পূরণ হলো। প্রভাবিত হলেন পাঠকসহ কবি সাহিত্যিকবৃন্দ। অগ্রজ বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ‘কাস্তে’র লাইনকে ‍‌শিরোনাম করে কাব্য রচনা করলেন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ‘অলকা’ পত্রিকায় ওই নামে গল্প লিখলেন। ছোট বড় আরও অনেকে কবিতা রচনা করলেন।

কিন্তু ব্রিটিশ সরকারকে ধোঁকা দিতে পরিকল্পিতভাবে হাতুড়ি বর্জিত করা সত্ত্বেও রাজরোষের ভয়ে এক বছর ‘কাস্তে’ ছাপার মুখ দেখেনি। ১৯৩৮এ অবশেষে কবিবন্ধু অরুণ মিত্রের সৌজন্যে তা আনন্দবাজার শারদীয়ায় প্রকাশিত হয়। কবিও নতুন করে কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৩৮ এ বি এ পাস করেন। কিন্তু ব্রিটিশরাজের পুলিস তাঁর বাসস্থানে তল্লাশি করে এবং তাকে লর্ড সিন্‌হা রোডে আটকে রাখে।

১৯৩৯সালে ঢাকা নিবাসী উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মচারী যামিনী বিশ্বাসের তৃতীয়া কন্যা শ্রীমতি মণিকা বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ঐ সময়েই তিনি ক্যালকাটা ন্যাশনাল ব্যা‍‌ঙ্কে (পরে নাম হয় এল আই সি) কাজে যোগ দেন। ১৯৪০-৪১সালে বাংলায় বোমাতঙ্ক, ১৯৪২-এ মন্বন্তর, একটু ফ্যানের জন্য মৃত্যুমিছিল কবির হৃদয় বিদীর্ণ করলো। তিনি লিখলেন ‘গ্লানি’, ‘ডাস্টবিন’, ‘ভুখ মিছিল’, ‘বামপন্থী’। অন্যদিকে ‘মজুতদারী’, পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে লিখলেন ‘ক্লাইভ স্ট্রিট’। ‘ভুখ মিছিলের’ (১৯৪৪) থেকে ‘পঞ্চাশের মন্নন্তর’ কবিতাটি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আকাল’ কাব্যসংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়।

চাকরি জীবনের সাত বছর পর ১৯৪৬সালে কর্মস্থলে ইউনিয়ন গড়তে গিয়ে তিনি বাধা পেয়ে কাজে ইস্তফা দিয়ে চলে আসেন। এই সময় প্রথমে দৈনিক কৃষক ও মাতৃভূমি কাগজে কিছুদিন কাজ করেন। চলচিত্রে গীতিকার ও সহ পরিচালকের কাজেও যুক্ত হন। কিন্তু কোন কাজই তাঁর মনঃপুত হয়নি। অর্থাভাব, দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সৎ, দৃঢ়চিত্ত আত্মসম্মানবোধে অবিচল বলে কখনও কারুর অযাচিত অনুগ্রহ লাভের জন্য মাথা নোয়াননি।

ইতোমধ্যে খণ্ডিত স্বাধীনতা, ভ্রাতৃদাঙ্গা, সর্বশেষে গান্ধীজীর গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। তিনি কলকাতা ছেড়ে হাওড়া জেলার গ্রামে দেউলপুর বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের কাজ নিয়ে ১৯৪৮সালে চলে যান। সেখানে তিনি এক বছর ছিলেন, কিন্তু বিদ্যালয় ও গ্রামের মানুষ তাঁকে অপরিসীম শ্রদ্ধায় আজও স্মরণে রেখেছেন। এই সময় নতুন ভাবনা বোধের কবিতা লেখেন, উল্লেখযোগ্য হলো ‘দেউলপুর’, ‘ঘুঘু ডাকে’, ‘শেষ ক্ষমা’, ‘স্বর্ণভস্ম’ (দীনেশ দাসের কবিতা ১৯৫১)। এক বছর পর কলকাতায় ফিরে এসে স্থায়ীভাবে চেতলা বয়েজ স্কুলে বাংলার শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। তাঁর লেখায় নতুন অনুভাবনার সঙ্গে প্রতীক ও ব্যঞ্জনার চরিত্রে গভীরতা ও মগ্নতার লক্ষণ ধরা পড়ে। এই সময়ের (অহল্যা ১৯৫৪) তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘অহল্যা’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘প্রণমি’। সাথে সাথে গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের বেদনা ও আন্দোলনের সমব্যথী হয়ে লিখলেন ‘শিক্ষক আন্দোলন ১৯৫৩’, ‘শিক্ষক ধর্মঘট ১৯৫৪’। ইতিমধ্যে মাতুলালয় ছেড়ে অন্যত্র কিছুকাল বাস করেন। পরে গোপালনগরে ৪/১ আফতাব মস্ক লেন ঠিকানায় পিতৃগৃহে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কবির দুই পুত্র শান্তনু ও ভারবী এবং এক কন্যা জোনাকি।

১৯৫৯সালে প্রকাশিত প্রথম শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন ‘উল্টোরথ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়। ১৯৬১ ও ১৯৭৪সালে দিল্লিতে জাতীয় কবি সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধি কবি রূপে আমন্ত্রিত হন। ১৯৬১-তে আর্থারাইটিস রোগে অসুস্থ অবস্থায় তাঁর ‘কাচের মানুষ’ প্রকাশিত হয়। তাছাড়া ১৯৭২-এ ‘অসংগতি’ এবং একই বছরে শ্রেষ্ঠ কবিতা দ্বিতীয় পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ইতিমধ্যে ১৯৭৫-এ নতুন করে ‘কাস্তে’ নামে এক‍‌টি আলাদা সংকলন প্রকাশ করে নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার শপথ নেন। ১৯৮০সালে কবিকে নজরুল আকাদেমি প্রথম নজরুল পুরস্কারে ভূষিত করেছিল। আর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘রাম গেছে বনবাসে’ ১৯৮২সালেই রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়।

১৯৮৪তে কবির ‘কাব্যসমগ্র’ প্রকাশের পর তাঁর স্বাস্থের ক্রমাবনতি ঘটে, সে অবস্থায় লিখলেন ‘হার্ট অ্যাটাক’, ‘জার্নাল’, ‘হাসপাতাল’ এবং ‘এবার ঘুম’। ১৯৮৫সালে ১৩ই মার্চ কবি গোপালনগরের বাসভবনে চিরঘুমে বিদায় নিলেন।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কাস্তে’ কবিতায় ‘হাতুড়ি’ রাখা হয়নি ব্রিটিশকে ধোঁকা দিতে, কবি একথা বার বার বলেছেন, ফ্যাসিবাদকে তখনও অনেক বৃদ্ধিজীবী না বুঝে প্রশংসা করেছেন, কেউ কেউ মুসোলিনি, পরে হিটলারকে ভগবানের অবতার বলছেন, কবির ভাষায় ‘সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মনে সংশয়, — It is difficult to choose between, communism and fascism. সেই ভীত ত্রস্ত সংশায়িত যুগে স্থিরবিশ্বাসের কবিতা ‘কাস্তে’। বলতে চেয়েছিলুম ফ্যাসিস্তদের বেয়োনেট যত তীক্ষ্ম হ’ক না কেন, কাস্তে হাতুড়ি অর্থাৎ জনগণের শক্তির সঙ্গে তারা কিছুতেই পারবে না।’ (কাস্তে ১৯৭৫ সংস্করণের ভূমিকা থেকে।)

কালযুগের ফসল, ধ্রুপদী উপাদানের অভাব বা মার্কসবাদের ধারণায় শিল্প সাহিত্যের প্রসঙ্গে তল উপরিতলের সরলীকৃত বিতর্ক যাঁরা হাজির করেন, তাঁরাও কেউ অস্বীকার করেননি এই কবিতার অসাধারণ শব্দ চয়ন, ছন্দ, স্তবক, বিন্যাস এবং অপূর্ব ব্যাঞ্জনাসমৃদ্ধ গীতিমুখর গঠনশৈলী, কালের আহ্বানে লিখিত হলেও এই কবিতা কালজয়ী তার কাব্য সুষমায়। এ যেন মাও জে দঙ তাঁর ইয়েনান বক্তৃতামালায় ঠিক যেমনটি আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন— রাজনৈতিক উপাদান নিয়ে গড়া শিল্পরূপের সর্বোত্তম সম্ভব বিকাশ। (the unity of revolutionary political content and the highest possible perfection of artistic form).

কবির কাব্য জীবনের দ্বিতীয় পর্বে দেখি চল্লিশের দশকের শুরুতে মন্বন্তর, কলকাতায় একটু ফ্যানের জন্য গ্রাম থেকে ছিন্নমূল ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকারে সমব্যথী হয়ে প্রকাশিত হলো ‘ভুখ মিছিলে’র সেইসব হৃদয় বিদারক কবিতার স্তবকগুলি— ‘এই দারুণ ক্রন্দনেই/যুদ্ধ নেই? যুদ্ধ নেই?/তবু আকাশ স্তব্ধ নীল/নিম্নে ভিড় ভ্রষ্ট নীড় মৌন মুখ ভুখা মিছিল।’ বা ‘বেঁচে আছি আমি/ এর চেয়ে নেই লজ্জা, নেই বড় গ্লানি।’ (গ্লানি) আর ‘ডাস্টবিন’ কবিতায় লিখলেন, ‘এই যে খুনে সভ্যতা/অনেক জনের অন্ন মেরে কয়েক জনের ভব্যতা।’

কবির দেউলপুর ও পরবর্তী পর্যায়ে নানা অভিজ্ঞতার ভিন্নধর্মী কবিতা স্বাভাবিকভাবেই এসেছে, একথা আগেই বলা হয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটির কিছু স্মরণযোগ্য লাইন উল্লেখ করি— ‘যে প্রাণ দেউলপুরে সে প্রাণই আমার’ (দেউলপুর)। আর সবচাইতে স্মরণীয় বোধহয় এযাবৎ রবীন্দ্রস্মরণে লেখা ‘প্রণমি’ (২৫শে বৈশাখ) এর সর্বোৎকৃষ্ট চারটি লাইন— ‘আকাশে বরুণে দূরে স্ফটিক ফেনায়/ ছড়ানো তোমার প্রিয় নাম/ তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা/ কোনখানে রাখব প্রণাম।’

ষাটের দশকে সমাজের অবক্ষয়, সত্তরের দশকে সন্ত্রাস জরুরী অবস্থা তাঁকে পীড়া দেয়। এইসব অবস্থানে জীবনের নানা বোধের সঞ্চারের মধ্যেও কবি সর্বহারা, গরিব নিম্নবিত্তের বেদনা ও লড়াই ও পরিচয়কে ভোলেননি। মানুষের মহাকাশ যাত্রার পরিপ্রেক্ষিতে লিখলেন, ‘এতে কি দূর হবে পৃথিবীর দুঃখ/ মানুষের ভাত রুটির কান্না।’ ‘লেলিন শতবর্ষে কোন চাষি’ কবিতায় নিজেকে হাওড়া জেলার কোনে কাষ্ঠস্যাংড়া গ্রামের চাষিপাড়ার চূড়ামণি দলুই পরিচয় দিয়ে লিখেছেন— ‘কেটে যাবে এই অমাবস্যার ঘোর/ দেখা যাবে ঠিক/ কাকের মুখেতে বটফল যেন/ টকটকে রাঙা ভোর।’ আর ‘গান, স্লোগান, মেশিনগান’ কবিতায় সদর্প ঘোষণা ‘আমি কবি চিরদিনই সর্বহারা।’

প্রথমেই বলেছিলাম দীনেশ দাসের জীবন যেমন তাঁর কাব্যে, তেমনি তাঁর কাব্য, তাঁর জীবনে প্রতিপদে প্রতিফলিত। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য বস্তির নিতান্ত বাস্তব জীবনে ভর করে ‘কবি লেখেন’ কবিতায় টিনের চালের নিচে একফালি তক্তপোষের উপর লুঙ্গি আর ফুটো গেঞ্জি পরে বিদ্যুৎবিহীন ঘরে মোমবাতির সামনে কবি অপেক্ষায় রত কখন ‘হঠাৎ জ্বলে ওঠে কবির মন একটি শুচিশুভ্র শিখায়।’

জীবন পরিক্রমায় সব মানুষের মতো কবিও নানা বাঁক ও মোড়ের সম্মুখীন হয়েছেন। এমনকি যৌবনের স্বপ্ন সাম্যবাদ শোষণমুক্ত দুনিয়ার ছবি যত দূরে সরে যাচ্ছে মনে হচ্ছে কবি বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, কিন্তু উলটোপথে হাঁটেননি, বা সমাজমানসকে বর্জন করে একান্ত ব্যক্তিমানসের মগ্নতায় তথাকথিত পবিত্র কবিতায় অথবা কোন অজ্ঞেয়বাদী নিয়তিসর্বস্ব দর্শনে আত্মসমর্পন করেননি। বরং তিনি মনে করেন ‘কবির কাজ শুধু সময়কে প্রভাবিত করা/তার যুগচেতনাকে আলোয় উদ্ভাসিত করা।’ (কবির কাজ)। জীবনের শেষ লগ্নে ১৯৮৪সালে ‘কাব্যসমগ্র’ প্রকাশকালে ভূমিকায় শেষ পরিচ্ছেদে এই মহাদুর্যোগের দিনে কবিদের অন্যান্য শিল্পীদের মতো কর্তব্য স্থির করে দিয়েছেন, কবির বিশ্বাস শব্দ কবির হাতে নবজন্মান্তর লাভ করে সমাজ মানসের মগ্ন চৈতন্যে অনুপ্রবেশ করে অন্তর্লোককে পরিবর্তিত করতে সক্ষম। আর তা পারাটাই হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্প ও সংস্কৃতি।

এই সমাজবোধে অনিষ্ট, সর্বাংশে সার্থক কালজয়ী কবি দীনেশ দাস ও তাঁর কাব্যকে নতুন করে চর্চা করা আজকের দিনে তাই আমাদের চেতনার দিগন্তকে প্রসারিত করার স্বার্থেই একান্ত জরুরী। জন্মশতবর্ষে তাঁর জন্য রইলো পরম শ্রদ্ধা ও আপনজনের প্রতি স্মৃতিমেদুর ভালোবাসা।