যৌন আক্রমনের সামনে
আরো বেশি অসহায় প্রতিবন্ধী মহিলা

ভার্মা কমিশন

৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

Image

+

মহিলা কমিশন তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল নারীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, নজরদারি করা, আইন সংশোধন করা। কিন্তু সংগঠনগুলির কাজ করার পরিকাঠামো অপ্রতুল, তাদের সুপারিশ কার্যকর করার সময় নির্দিষ্ট বিধি তৈরি হয়নি। মহিলাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার অঙ্গ হিসেবে মহিলা থানা গঠন করা হলেও, তা সক্রিয় নয়। সাক্ষ্য সংগ্রহে গাফিলতি, পুলিস-প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে বলার মতো মানসিকতা, এমনকি বিধায়ক পর্যন্ত বলেন ধর্ষককে বিয়ে করতে। এ ধরনের উদ্যোগ সমস্যার সমাধান করে না। রাষ্ট্রের অভিমুখ ঠিক না হওয়ার কারণে নির্যাতিতা মহিলাদের সুবিচার লাভের আশা থাকে না। সেক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মহিলাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত যৌন হেনস্তার কোনো বিচার প্রায় হয়ই না।

রাষ্ট্রসঙ্ঘ ১৯৭৩ সালে নারী দশক পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে দেশে মহিলাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সম্পর্কে পরিসংখ্যান দাবি করে। পরবর্তী সময়কালে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে বেজিঙ আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে মহিলাদের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গটি জোরালো হয়। কিন্তু একদিকে নারী নির্যাতন ও কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা পাশাপাশি চলতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে দিল্লির বুকে ২৩ বছরের প্যারা মেডিকেল ছাত্রীর ওপর বর্বর আক্রমণ এবং ২৮শে ডিসেম্বর তাঁর অকালমৃত্যু ভারতীয় গণতন্ত্রের লজ্জাজনক ‍ ক্ষেত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রতিবন্ধী বালিকা ও মহিলারা সহজেই নির্যাতনের শিকার হন। অপরাধীরা মনে করে, সহজেই অপরাধ আড়াল করা যাবে। বহুক্ষেত্রে এ ধরনের মহিলারা আন্দাজ করতে ব্যর্থ হন যৌন হেনস্তার। অন্য মহিলাদের তুলনায় তাঁরা তিনগুণ পর্যন্ত অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। বহুক্ষেত্রে পুলিস বা বিচারব্যবস্থায় এ ধরনের অপরাধে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করে না। ভারত রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার (ইউ এন সি আর পি ডি) সংক্রান্ত সনদে স্বাক্ষর করেছে। যার ৬নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, দেশের সরকারকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে প্রতিবন্ধী মহিলাদের ওপর বৈষম্য ও হিংসা প্রতিরোধ করতে। এছাড়াও ইউ এন সি আর পি ডি-র ‘‘নির্যাতন, হিংসা ও হেনস্তা থেকে মুক্তি’’ শীর্ষক ১৬ নম্বর ধারায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—রাষ্ট্র উদ্যোগ গ্রহণ করে যথাযথ আইনী, প্রশাসনিক, সামাজিক, শিক্ষাগত ও অন্যান্য ভাবে যাতে প্রতিবন্ধকতা যুক্ত ব্যক্তি বাড়িতে ও বাড়ির বাইরে সকল প্রকার নির্যাতন, হিংসা ও হেনস্তার হাত থেকে মুক্ত থাকেন, তাঁদের লিঙ্গভিত্তিক প্রেক্ষিতকে বিচার করে। এই সনদের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন খুবই জরুরী।

প্রতিবন্ধী মহিলাদের ওপর হিংসার ঘটনার তথ্য পরিসংখ্যান যথাযথ রক্ষিত হয় না। কিন্তু এই আশঙ্কা গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন শুধুমাত্র ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সংবাদমাধ্যমে অনেকগুলি ঘটনা উল্লেখিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। তাসত্ত্বেও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি সমস্যার গভীরতা বিচার করে। এছাড়াও জাতীয় অপরাধ, রেকর্ড ব্যুরো (এন সি আর বি) বা অন্য সূত্রে সঠিক পরিসংখ্যান উপলব্ধ হয় না। জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্যরা গত ৩-৪ঠা এপ্রিল, ২০১২, পশ্চিমবঙ্গে সভা করে প্রতিবন্ধী মহিলাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ দমনে সুপারিশ করে বলেছিলেন— সকল থানা ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলিকে প্রতিবন্ধী মানুষদের বিশেষ প্রয়োজনের বিষয়টিকে স্মরণে রাখতে হবে। তাঁদেরকে সহায়তা হিসেবে দোভাষী, পাঠ-সহায়ক, পেশাজীবী, মনোচিকিৎসক এমনকি প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার বন্দোবস্ত করে দিতে হবে। এজন্য বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী তৈরি করে প্রতি জেলায় প্রতিবন্ধী কমিশনের ও নারী ও শিশুবিকাশ দপ্তরের সঙ্গে সংযোগ রাখতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে বিচারপতি ভার্মা কমিটি গঠিত হয় বিভিন্ন অংশের মতামত বিচার-বিশ্লেষণ করার লক্ষ্যে। প্রতিবন্ধী অধিকার রক্ষা জাতীয় মঞ্চ (এন পি আর ডি)-র সঙ্গে প্রতিবন্ধীদের মধ্যে সক্রিয় আরও ২৪টি সংগঠন এই কমিটির কাছে লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করে গত ৪ঠা জানুয়ারি। এই সাক্ষাৎকারে মহিলাদের সমস্যার গভীর উদ্বেগপ্রকাশ করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার সমস্যা পৃথক পৃথক। সুতরাং, সেক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ জরুরী। যেমন একজন অন্ধ তরুণী তাঁর উপর আক্রমণকারীকে দেখতে পান না। আবার মূক ও বধির তরুণীর পক্ষে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি বিচারব্যবস্থাও তাঁদের পাশে সবসময় দাঁড়ায় না। বহু মামলায় প্রতিবন্ধী অভিযোগকারিণীর বয়ান গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বহুক্ষেত্রে তা নথিভুক্ত পর্যন্ত করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বয়ান নথিভুক্ত করা হলেও, যথাযথ আইনী পদ্ধতি অনুসৃত হয় না। ফলে আদৌ তা মামলায় গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে না। সর্বোপরি, মানসিক সুস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে মামলা খারিজ হয়ে যাও। নথিভুক্ত অপরাধের বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, হয় তারা পরিবারের সদস্য, নিকটবর্তীয় বা পরিচিত, এমনকি পুনর্বাসন কেন্দ্রের কর্মীদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে বহুক্ষেত্রে। এজন্য যথাযথ নজরদারির প্রয়োজন। এন পি আর ডি ভার্মা কমিটির সঙ্গে মোট তিনবার সাক্ষাৎ করে প্রচুর তথ্য উত্থাপন করে প্রতিবন্ধী মহিলাদের ওপর শারীরিক আক্রমণের বিষয়ে।

ভার্মা কমিটি সমস্ত বিষয়টি পর্যালোচনা করে তার সুপারিশ করার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রতিবন্ধী মানুষদের বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। প্রতিবন্ধী মহিলাদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিষেবা প্রদানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিটি পরিবারের দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে উল্লেখ করেছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সন্তানের মতামত স্বীকার করে না। যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির স্বার্থবিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা সম্পর্কে সজাগ থাকা জরুরী। প্রতিবন্ধী মহিলাদের ওপর ধর্ষণের ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীকে সাজা দেওয়া সম্ভব হয় না, উপযুক্তভাবে ধর্ষিতার বয়ান পুলিস বা আদালতে নথিবদ্ধ না হওয়ার কারণে। ভার্মা কমিটি সুপারিশ করেছে ৩৭৬ নম্বর ধারায় ধর্ষণের অভিযোগ এলে মহিলা পুলিস অফিসার তাঁর বাড়িতে বা স্বাচ্ছন্দ্যমূলক স্থানে বয়ান নথিভুক্ত করবেন। যেখানে বিশেষ শিক্ষক বা দোভাষী উপস্থিত থাকবেন প্রয়োজন অনুসারে। যার ভিডিও তুলে রাখতে হবে ১৫৪ ধারা অনুসারে। অপরাধী শনক্তকরণ প্রক্রিয়ার ভিডিও তুলে রাখতে হবে (৫৪-এ ধারা)। এছাড়াও তার ভিডিও চিত্র প্রামাণ্য হিসেবে গৃহীত হবে। পুনরায় অভিযোগকারিণীকে প্রশ্ন করা যাবে না বিচার প্রক্রিয়ায়। ‘‘বধির সাক্ষী’’ শব্দের পরিবর্তন করে যারা মৌখিকভাবে সংযোগ করতে অক্ষম ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

নির্যাতিতার চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর চিকিৎসা সহায়তা ও বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ উভয়ত। ভার্মা কমিটি সুপারিশ করেছে, সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালসমূহে যৌন হেনস্তা সঙ্কটকেন্দ্র গঠন করে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ সমস্ত কেন্দ্রে উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদারদের রাখতে হবে প্রতিবন্ধী মহিলাদের সহায়তার উদ্দেশ্যে। আদালতে তাঁদের রিপোর্টকে আইনী প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিশুদের যৌন হেনস্তার হাত থেকে রক্ষা করতে তাদের আবাসগুলিকে সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের অধীন নথিভুক্ত করতে হবে এবং আদালতকে তাদের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। হাইকোর্টকে সারা রাজ্যের আশ্রয়স্থানগুলির সাপ্তাহিক রিপোর্ট নিতে হবে। কেয়ারটেকার ও সুপারিনটেন্ডেন্টদের উপযুক্ত যোগ্যতা সুনিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিয়েছে ভার্মা কমিটি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদেরকে লিঙ্গ, প্রতিবন্ধকতা, জাতপাত সম্পর্কে বৈষম্যমূলক আচরণ বিষয়ে শিক্ষাদান ও বিরূপ মনোভাব সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে বলে বিচারপতি ভার্মা তাঁর সুপারিশে জানিয়েছেন। প্রতিবন্ধী শিশু এবং যুবক-যুবতীদের যৌন শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন পেশাদার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দ্বারা বলেও তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

সংসদে পেশ হওয়া ফৌজদারি আইন সংশোধন বিল, ২০১২-এ শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী মহিলাদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ঘটনাকে ‘উত্ত্যক্তকর যৌন হয়রানি’ শীর্ষে শ্রেণীবদ্ধ করে ন্যূনতম সাজা ১০ বছর জেল হিসেবে পেশ করা হয়েছে। এই বিলকে আসন্ন বাজেট অধিবেশনে সংসদে পাস করাতে হবে। এন পি আর ডি এটাও দাবি জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তুলে উপযুক্ত কর্মী নিয়োগ করার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করতে হবে অবিলম্বে, যাতে ভার্মা কমিটির সুপারিশসমূহ লাগু করা সম্ভব হয়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement