‘আশা’-র ছলনা

গার্গী চট্টোপাধ্যায়

১৮ মার্চ, ২০১৩

হাসনাবাদ থেকে হঠাৎ দূরভাষে ভেসে এলো একটি চেনা মেয়ের কণ্ঠস্বর। ‘‘অ দিদি একটু খবরের চ্যানেলটা দেখুন। আমাদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কী বলতাসেন।’’ টিভিটা অন করেই চ্যানেলে কর্ডলেস মাইক্রোফোন হাতে মাননীয়ার ভাষণ। প্রায় সাড়ে বারো মিনিট। আশা দিদিদের জন্য হরেকরকম প্রতিশ্রুতি। বললেন, ১লা এপ্রিল থেকে আশা দিদিরা মাসে ১৩০০ টাকা করে স্থায়ী বেতন পাবে। স্বল্প পরিসরে নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামজুড়ে বইয়ে দিলেন প্রতিশ্রুতির বন্যা। প্রতি মাসের ১লা তারিখ আশা দিদিদের নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঐ টাকা জমা পড়ে যাবে। রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে এই বরাদ্দ অর্থ দেওয়া হবে। আচমকা পাশ থেকে আমার মা বলে উঠলেন ‘‘মমতা হঠাৎ আশা নিয়ে পড়লো কেন?’’ মা’র এই ভাবনার কারণটা অযৌক্তিক নয়। কিছুদিন আগে পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারী অনুষ্ঠানে ‘আশা’-দের দেখলেই মাননীয়া বলে উঠতেন, ‘‘এই বেগুনি শাড়ি পরা মেয়েগুলো এখানে কী করছে? এরা আমার কর্মী নয়। এরা কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী।’’ অথচ ২৭শে ফেব্রুয়ারি রাজ্যের বাছাই করা কয়েকটি ব্লক থেকে গাড়ি করে নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে নিয়ে আসা হলো আশা কর্মীদের। তাদের সামনে মুখ্যমন্ত্রী দরাজ প্রতিশ্রুতির বন্যা। শুধু স্থায়ী বেতন নয়, স্বাস্থ্য কর্তাদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ ‘‘আশা কর্মীরা স্বাস্থ্য বিষয়ক কাজ করেন। এরা যদি নার্সিং-এ আগ্রহী হয় তাহলে প্রশিক্ষণ দিয়ে নার্স নিয়োগে এদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।’’

কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মোড়কেই শুরু হয়েছিল মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে আই সি ডি এস, আশা, মিড ডে মিল, সর্বশিক্ষা অভিযানের মতো প্রকল্পগুলি। এই প্রকল্পগুলির সঙ্গে যুক্ত বেশিরভাগই সমাজের সব চাইতে পিছিয়ে পড়া অংশের মহিলা। যারা সমাজের মূলত মহিলা ও শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টির, উন্নতি সাধনে নিরন্তর প্রয়াসে রত তারাই কেন্দ্রীয় সরকারের অমানবিক শোষণের শিকার। তাদের পরিচয় ‘সমাজ সেবক/সেবিকা’, ‘স্বেচ্ছাসেবক’, ‘শিক্ষা বন্ধু’, ‘অতিথি’। এরা কেউই শ্রমিক-কর্মচারী নয়। এক কোটির বেশি এই বিপুল কর্মীবাহিনীর ‘কর্মী’ সত্তাকে অস্বীকার করে চলেছে দেশের সরকার। এইসব প্রকল্পগুলির সঙ্গে শ্রম ও মজুরি সম্পর্ক কিন্তু এরা প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হয়ে চলেছে ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা থেকে। যারা দেশের মানব উন্নয়ন সূচককে উপরের দিকে নিয়ে যাবার লড়াই-এ, তাদের ঘরেই জমে রয়েছে দুঃসহ অন্ধকার। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে দারিদ্র্য দূরীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসাবে বিবেচিত হয়। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত মহিলারা সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ। অথচ এই মানুষগুলোকে কর্মী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবার যে লক্ষ্যের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ।

কিছু ক্ষেত্রে যেমন আশা কর্মীরা ন্যূনতম সম্মানজনক ভাতা থেকেও বঞ্চিত। দেশজুড়ে আশা প্রকল্পের কর্মী সংখ্যা প্রায় সাড়ে আট লক্ষ। আমাদের রাজ্যে প্রায় সত্তর হাজারের বেশি আশা কর্মী আছেন। ২০০৫ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের রাষ্ট্রীয় গ্রামীণ মিশন (এন আর এইচ এম) এই প্রকল্প শুরু করে। শিশু মৃত্যুর হার কমানো, প্রসূতি মায়ের প্রসবকালীন সময়ে মা ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো, শিশুর যাতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রাতিষ্ঠানিক জায়গায় জন্ম হয় — মূলত এই উদ্দেশ্য নিয়ে আশা প্রকল্প শুরু হয়। বিভিন্ন রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরগুলির পরিচালনায় ব্লকে ব্লকে। প্রত্যেক রাজ্যে রাজ্য কো-অর্ডিনেটর, প্রত্যেক জেলায় জেলা কো-অর্ডিনেটর, প্রত্যেক ব্লকে ব্লক কো-অর্ডিনেটর, গ্রাম পঞ্চায়েতে কো-ফেসিলিটেটর এবং প্রত্যেক গ্রাম পঞ্চায়েতের সংসদগুলিতে প্রতি হাজার জনসংখ্যা পিছু একজন করে আশা কর্মী। আমাদের রাজ্যের সব ব্লকে এখনো এই প্রকল্প শুরু না হলেও কর্মী সংখ্যা প্রায় সত্তর হাজার।

এন আর এইচ এম মূলত কেন্দ্রীয় প্রকল্প হলেও এই খাতে কেন্দ্রীয় সরকার ৭৫ শতাংশ রাজ্য সরকার ২৫ শতাংশ খরচ বহন করে। এই কর্মীদের গ্রাম অঞ্চলে ২৪ ঘণ্টাই সজাগ থাকতে হয়। সকাল, দুপুর বা মাঝরাতে রোগীর ডাক পড়লেই হলো। আশা দিদির ছুটি নেই। গর্ভবতী মা থেকে প্রসূতি মা — প্রতিদিনই যেতে হয় রোগীর কাছে। এরপর সময়মতো সরকারী হাসপাতালে গর্ভবতী মা-কে প্রসবের জন্য নিয়ে যাওয়া। কোন জায়গায় দূরত্বের কারণে সরকারী হাসপাতালে গর্ভবতীকে না নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে প্রশিক্ষিত দাই নিয়ে আসার কাজও করতে হয়। জনসমীক্ষা, টিকাকরণ, জাতীয় কুষ্ঠ নিবারণ কর্মসূচী ও ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর সংক্রান্ত কাজেও যুক্ত আশা দিদিরা। এলাকার জ্বর, ডায়েরিয়া এবং অন্যান্য যে কোন অস্বাভাবিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা বা রোগের প্রাদুর্ভাবের খবর মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান ‘আশা’-রাই।

একেবারে শুরুতে আশাদের উৎসাহ ভাতা হিসাবে ১০০ টাকা দেওয়া হতো। রাজ্যের বামফ্রন্ট আমলে এই প্রকল্প কর্মীদের কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়াও রাজ্য সরকার তার সীমাবদ্ধ আর্থিক ক্ষমতায় এদের অতিরিক্ত টাকা দেবার ব্যবস্থা করেছিল। কতগুলি নির্দিষ্ট কাজের জন্য টাকা দেওয়া হলেও ৮০০ টাকা ভাতা প্রতিটি আশার নিশ্চিত ছিল। সব আশারাই এই টাকাটা পেতেন। বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন এই ব্যবস্থা চালু ছিল। বর্তমানে ফুরনে অনিয়মিতভাবে (পিস রেট) এই টাকা দেওয়া হয়। আগে এ এন এম ও সুপারভাইজার আশার কাজের রেজিস্ট্রার দেখেই কাজের বিবরণ পেতেন। এর জন্য ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা ছিল না। বর্তমানে প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করবে এ এন এম ও সুপারভাইজাররা। এদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে আশা কর্মীর টাকা পাওয়া না পাওয়া। ফলে কেউ পায় ১০০ টাকা, আবার কেউ পায় ১০০০ টাকা, কেউ কিছুই পায় না। আশা-র আয় কেস ভিত্তিক করে দেওয়ার ফলে সম্পূর্ণ দেখভাল করার পরেও কোন আশা কোন কারণে প্রসবের সময় হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকলে তিনি কোন অর্থ পাবেন না। আমাদের রাজ্যের এখনো বহু ব্লকে ৫/৬ মাস ধরে আশা-রা তাদের প্রাপ্য কোন টাকাই পাচ্ছেন না।

অন্যান্য প্রকল্প কর্মীদের মতই আশা-রাও শুরু থেকেই লড়াইয়ের ময়দানে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই অমানবিক, বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে শামিল সংগঠিত প্রতিবাদে। দিল্লিতে অবস্থান, আসমুদ্র হিমাচল কচ্ছ থেকে কন্যাকুমারিকা সি আই টি ইউ-র উদ্যোগে রাজ্যে রাজ্যে জেলায় জেলায় ব্লক স্তরে গড়ে উঠেছে সংগঠন। গড়ে উঠেছে সর্বভারতীয় আশা কর্মী সমন্বয় সমিতি। স্থায়ীকরণ, ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষার দাবিতে লড়াই চলছে সর্বত্র। প্রতিটি কর্মীকে মাসিক দশ হাজার টাকা মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, পেনশন, স্থায়ীকরণ এই দাবিগুলো নিয়ে দিল্লিতে মহাপরব বা মহা অবস্থান কর্মসূচী পালন করলেন ২৬ ও ২৭শে নভেম্বর ২০১২ দেশের ২৫টি রাজ্যের প্রায় ৫০,০০০ কর্মী। ২০ ও ২১শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ধর্মঘটের ও অন্যতম দাবি ছিল এই প্রকল্প কর্মীদের স্থায়ীকরণ, ন্যূনতম ১০০০০ টাকা বেতন। ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ কলকাতা রানী রাসমণি রোডের আই সি ডি এস আশা কর্মীদের যৌথ সমাবেশের দাবি ছিল — সাম্মানিক ভাতা বা ইনসেনটিভ নয় চাই ন্যূনতম বেতন। চাই সামাজিক সুরক্ষা।

দিল্লির মহাঅবস্থান থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যের সমাবেশ থেকে রাজ্যপালের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ২২ মাস অতিক্রান্ত রাজ্যের নতুন সরকারের। ২২ মাসে ৫/৬ মাস ধরে বন্ধ আশাদের প্রাপ্য টাকা। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে চালু ভাতাও বন্ধ। বি ও এম এইচ, সি ও এম এইচদের দরজায় বারবার কড়া নাড়া। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দেখা করার জন্য উপস্থিত হওয়া ২বছর ধরে চেষ্টা করে গেছেন আশা দিদিরা। বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এই বলে যে, এই ব্যাপারে রাজ্য সরকারের করবার কিছুই নেই।

হঠাৎ নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে আশা কর্মী জমায়েত করলো রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। বেছে বেছে ব্লক থেকে কর্মীদের নিয়ে যাওয়া হলো যাদের প্রাপ্য পাওনা কম টাকার। মুখ্যমন্ত্রীর সামনে উপস্থিত করবার আগে মিটিয়ে দেওয়া হলো পাওনা টাকা। খুব মন দিয়ে শুনলাম মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ, একটা কথা কানে লাগলো। মুখ্যমন্ত্রী আ‍‌বেদন করলেন প্রার্থনা করুন যাতে আমার সরকার ভাল থাকে। ‘আশা’ দিদিরা রয়েছেন গোটা রাজ্যের সিংহভাগ গ্রাম জুড়েই। সামনে পঞ্চায়েত ভোট এই ২১ মাসেই সাধারণ খেটে খাওয়া গরিব মানুষের মোহভঙ্গ ঘটেছে এই সরকারের থেকে। মিডিয়ার ফোলানো বেলুন চুপসে গেছে। মুখোশটা সরে গিয়ে মুখের আসল চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে। এই ২১ মাসেই কলেজ, স্কুল পরিচালন সমিতির ভোট গায়ের জোরে করতে হচ্ছে। ভয় পেয়ে গেছেন নেত্রী। আশা দিদিরা ছড়িয়ে আছেন প্রত্যন্ত গ্রামগুলো যদি পঞ্চায়েত ভোটে আশা দিদিদের পরিবারের আশীর্বাদ পাওয়া যায় তাই নেতাজী ইন্ডোরের ঘোষণায় বলেছেন — ১৩০০ টাকা করে দেওয়া হবে কিন্তু তা পাওয়া যাবে মে মাস থেকে, কেন? পঞ্চায়েত নির্বাচন এপ্রিল মাসে তাই?

দূরভাষের ওপারে এক আশা কর্মী — ওকে বললাম ‘আর কি দিদি তো মাস পয়লায় তোমাদের বেতন দেবেন? ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো ‘আপনি একটু খোঁজ নেন তো রেলের জন্য পোঁতা শিলাগুলোর কি হলো। মাননীয়া বলেছেন, এরকম উনি কতই বলেন। লিখিত অর্ডার কোথায়? রেলের শিলাগুলিতে শেওলা জমেছে, জঙ্গলমহল কাঁদছে, পাহাড় দাঁত কিড়মিড় করছে। এখন পঞ্চায়েত ভোট, উনি অনেক কিছুই বলবেন, আবার ভোট হয়ে গেলে ভুলে যাবেন। আশা কর্মীদের নার্সিং ট্রেনিং দিয়ে নার্স করে দেবেন বলেছেন। রাজ্যে অসংখ্য মহিলা নার্সিং ট্রেনিং নিচ্ছেন তাদের কি হবে? রাজ্যের অসংখ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক, নার্স, প্যাথলজিস্টদের অভাব রয়েছে। আশা কর্মীদের কাজ দেখে এইসব কাজে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আশ্বাস দেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বল্প প্রশিক্ষিত আশা কর্মীরা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রাথমিক কিছু কাজ করেন। স্বাস্থ্য দপ্তরের শূন্য পদগুলিতে কিভাবে এদের নিয়োগ করা হবে — এই ব্যাপারটাও ধোঁয়াশার মধ্যে থেকে গেল।

এতদিন মনে ছিল না আশা কর্মীদের কথা। আমরা যে দাবি করে আসছি প্রথম থেকে তারই কয়েকটিকে সামনে এনে আশা কর্মীদের জন্য এই ছলনা। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি আপনার মৌখিক প্রতিশ্রুতির লিখিত আদেশ হিসাবে পৌঁছাক প্রশাসনিক স্তরে। ন্যূনতম ১০০০০ টাকা বেতন সুনিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করুন। আশা কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, চিকিৎসা বীমা, পেনশনের দায়িত্ব গ্রহণ করুক রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার।

এই দাবি নিয়ে রাজ্যের প্রায় ৭০০০০ আশা কর্মী মুখর হয়েছেন। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী জবাব দিতে প্রস্তুত আছেন তো!

Featured Posts

Advertisement