ফ্যাণ্ডা ফ্যাচাং তরকারি

অশোক দাস

১৮ মে, ২০১৩

Image

+

বিগত শতাব্দীর চারের কিংবা পাঁচের দশকে সেযুগের বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা ও শিল্পী নবদ্বীপ হালদারের দুটি কৌতুকগীতি একটি রেকর্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। ময়ূরের ছবি আঁকা সেনোলা কোম্পানি থেকে প্রকাশিত এই রেকর্ডের একপিঠে ছিল ‘ফ্যাণ্ডা ফ্যাচাং তরকারি’ আর একটা পিঠে ছিল ‘শরীরটা আজ বেজায় খারাপ’। গান দুটিই ভোজন বিষয়ক, শৈশবে শুনেছি বলে গীতিকারের নাম মনে নেই। শরীরটা আজ বেজায় খারাপ, বিশেষ কিছু খাবো না/আমায় মাংস দিও সের দেড়েকের, চপ কাটলেট দু’চারখানা।’ দেড় সের মাংস এবং বেশ কিছু চপ কাটলেট খাওয়ার পরেও বাঙালীর রসনা মিষ্টান্নের জন্য লালয়িত হয়। নবদ্বীপ ধরা গলায় গান ধরেন, ‘বাগবাজারের রসগোল্লা, ভীম নাগের সন্দেশ/বর্ধমানের সীতাভোগ মিহিদানা দরবেশ।’ বাস্তবিক ভোজনরসিক বাঙালীর রসনা তৃপ্তির জন্য যুগে যুগে ময়রা কারিগর কতই না মিষ্টান্ন আর উপাদেয় খাদ্যের আবিষ্কার করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। শুধুমাত্র রাজা-মহারাজা আর লাট‍‌-বেলাটদের মেমসাহেবদের সন্তুষ্ট করার জন্যও নতুন নতুন মিষ্টি আবিষ্কৃত হয়েছে। এইসব কারিগরদের নাম কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অথচ, তাঁরাও তো এক এক জন কেমিস্ট। মিষ্টির রসের রসায়ন তো তাঁদেরই সৃষ্টি।

প্রথমে প্রচলিত ছিল গুড় এবং পরে চিনির মিষ্টি। নাটোরের কাঁচাগোল্লার স্বাদ আমরা কোনোদিন পেলাম না। কৃষ্ণনগরের রাজার সাথে প্রতিযোগিতা করে নাটোরের রানী তাঁর ময়রাদের দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন এই কাঁচাগোল্লা। এই লেখায় ১৯৪৭-এর আগে বা পরে এই বাংলারই খাবার নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। বাগবাজারের রসগোল্লা কখন আবিষ্কার হয়েছে কে জানে। কিন্তু দুই বাংলার এমন কোনো শহর বা গঞ্জ নেই যেখানে রসগোল্লা পাওয়া যায় না। এক এক জায়গার রসগোল্লার স্বাদ এক এক রকম, কিন্তু কোনোটাই কম সুস্বাদু নয়। অবশ্য বাগবাজারের রসগোল্লা-র কথা আলাদা। এপার বাংলার যেখানেই গিয়েছি মালদহ, জলপাইগুড়ি, রায়গঞ্জ, কুশমাণ্ডি, কান্দী, মুর্শিদাবাদ, বহরমপুর, সিউড়ি, রামপুরহাট, সাঁইথিয়া, কাটোয়া, কালনা, বর্ধমান, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া, রঘুনাথপুর, মেদিনীপুর, তমলুক, পুরুলিয়া, পাঁশকুড়া, চুঁচুড়া, তারকেশ্বর, বর্ধমান, বোলপুর, আরামবাগ, রায়না কোথায় না সুস্বাদু রসগোল্লা পাওয়া যায়? বাংলার বাইরেও বাঙালীর বাস। অতএব, সেখানেও চাই রসগোল্লা। দেওঘর, জামতাড়া, নলা— ঝাড়খণ্ডের এইসব জায়গাতেও পাবেন ভালো রসগোল্লা। সুতরাং বাঙালীদের কাছে রসগোল্লারই জয়জয়কার। প্রাক ব্রিটিশ যুগে গুড়ের মিষ্টির কাল অতিক্রম করে এলো চিনির বা খোয়ার মিষ্টির যুগ। তখন গ্রামে-গঞ্জে চিনির বাতাসা, বেসনের বোঁদে দিয়ে চিনির নাডু, চিনির কদমা-র চাহিদা বাড়লো। সে কতকাল আগেকার কথা! বর্ধমান জেলার মানকরের কদমা তো এককালে কুটিরশিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। এ সেই মানকর, রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্পর্শমণি’ কবিতায় যাঁকে অমর করে রেখেছেন। ফুটবলের সাইজের চেয়ে বড় সাইজের থেকে শুরু করে পাতিলেবুর সাইজের হরেক রকম কদমার জন্য মানকর বিখ্যাত ছিল। পশ্চিম বর্ধমানে বিয়ের পর বরের বাড়ি এবং কণের বাড়ি থেকে আষাঢ় মাসে আষাঢ়ে এবং আশ্বিন মাসে পরবির হাঁড়ি পাঠানোর রেওয়াজ ছিল যখন তখন বিভিন্ন মিষ্টির হাঁড়ির সঙ্গে এক হাঁড়ি বড় বাতাসা এবং এক হাঁড়ি বড় কদমা পাঠানো হতো। এছাড়া থাকতো গুড়ের মিঠাই, চিনির মেঠাই, মোয়া এইসব মিষ্টির হাঁড়ি।

আসানসোলের আশ্রম মোড় থেকে যে রাস্তাটা সোজা উত্তরে কাল্লা, পড়িরা, মাজিয়াড়া, ভানোড়া বারাবনী স্টেশন হয়ে জামুড়িয়া-গৌরাংডি রাস্তার সাথে মিশেছে বারাবনীর সেই বাজারের নাম দোমোহানী বাজার। কদমার কথা বলতে গেলে দোমোহানীর কদমার কথাও এসে যাবে। দোমোহানীর মোড় থেকে যে রাস্তাটি চুরুলিয়া-গৌরাংডির দিকে গেছে সেই রাস্তার পাশে সারি দিয়ে পরপর বেশ কয়েকটি কদমার দোকান ছিল, যে কদমার স্বাদ মানকরের কদমারই সমতুল্য। শোনা যায়, চৈতন্যদেব পাতিতোদ্ধার করতে যখন এ অঞ্চলে এসেছিলেন এবং ঝারিখণ্ড দিয়ে পুরী অভিমুখে গমন করেছিলেন, তখন তিনি দোমোহানীর কদমা আস্বাদন করেছিলেন। এ কাহিনীর কোনো পাথুরে প্রমাণ না থাকলেও কদমা যে একটি সুপ্রাচীন মিষ্টান্ন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

ভীম নাগের সন্দেশ ছাড়াও মেমারি, শক্তিগড়, বর্ধমান, বৈঁচি, কালনার মতো গঞ্জে, বাজারে বা ছোটো শহরে যে সন্দেশ পাওয়া যায়, তারও স্বাদ বাঙালীকে আকৃষ্ট করে। যদিও বেসন আর ঘি দিয়ে তৈরি অন্ধ্রের অন্ধ্রপাক, কর্ণাটকের মহীশূর পাকের অপূর্ব স্বাদ ভীম নাগের সন্দেশকেও ছাড়িয়ে যায়, তবুও দক্ষিণবঙ্গের সন্দেশ যে কোনো বাঙালীর কাছেই প্রিয়। খোয়ার সন্দেশের মধ্যে প্যাঁড়ার স্বাদ পেতে গেলে যেতে হবে দেওঘরে। সেখানকার প্যাঁড়াগলিতে ছাড়া অন্যত্র প্যাঁড়া কিনলে ঠকবেন। গোরুর দুধের বাদামি প্যাঁড়ার চেয়েও মোষের দুধের সাদা প্যাঁড়া বেশি মিষ্টি। তবে, দেওঘর ছাড়াও জামতাড়া, করমাটার, মধুপুর, যোশিডি, শিমুলতলা, পাথরোল, এমনকি বাংলা সীমান্তে মিহিজাম যেমন মিষ্টি প্যাঁড়া পাবেন, বাঁকুড়ার ছাতনা, খড়বনা, ঝাঁটিপাহাড়ীতেও সেই স্বাদের না হলেও অন্তত মুখরোচক প্যাঁড়া আপনার জিভ ও মন উভয়কেই তৃপ্তি দেবে। পরবর্তীকালে কলকাতার বাবুরা এবং বিদ্যাসাগর, স্যার আশুতোষ-এর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা এসব অঞ্চলে হাওয়া বদল করতে আসার উদ্দেশ্যে বড় বড় চেঞ্জার বাংলো তৈরি করেছিলেন। তাই এ অঞ্চলে চিঁড়ে-দই, ছাতুর পাশাপাশি রসগোল্লা, জিলিপি, প্যাঁড়ার চাহিদা ছিল। কদরও ছিল কলকাতার বাবুদের কাছে মিহিজাম থেকে শিমুলতলা যোশিডি-দেওঘর অবধি।

ছানার মিষ্টির মধ্যে রাজভোগ আর রসগোল্লার পরই পানতুয়ার স্থান। পানতুয়ার মতোই গোলাপজামুন তৈরি, লেডিকেনি আর ল্যাংচাও প্রায় এক ধরনের তবে একটু রকমফের আছে। ছানাকে ঘিরে (অধুনা সাদা তেলে) ভেজে চিনির রসে ভিজিয়ে পানতুয়া তৈরি হয়। শোনা যায় ঐ একই পদ্ধতি লর্ড ক্যানিং-এর মেমসাহেবকে তুষ্ট করার জন্য কলকাতায় ময়রারা নতুন ধরনের মিষ্টি তৈরি করে নাম দিয়েছিলেন লেডি ক্যানিং। বিকৃত উচ্চারণে যা লেডিকেনিতে পরিণত হলো। গোলাপজামের ভেতরটা ‍গোলাপী বাইরেটা জামের মতো—পাকটা একটু কড়া।

ল্যাংচা বলতে আমরা শক্তিগড়ের ল্যাংচাকেই জানি। আজকাল দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে হওয়াতে ল্যাংচার দোকানগুলো আমড়া গ্রামে চলে গেছে। তবুও এগুলি শক্তিগড়ের ল্যাংচা নামেই প্রসিদ্ধ। কিংবদন্তী এই যে, যে কারিগর ল্যাংচা আবিষ্কার করেছিলেন তিনি নাকি ল্যাংচা মানে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতেন। এখন ল্যাংচা শুধু শক্তিগড়েরই একচেটিয়া নয়, বর্ধমানের আশেপাশের শহরেও শক্তিগড়ের মতো না হলেও সুস্বাদু ল্যাংচা পাওয়া যাচ্ছে বহুদিন ধরে। চৈতন্যযুগের যে দোমোহানীর কদমার কথা বলা হলো, সেই দোমোহানীর দামু ময়রার দোকানের ল্যাংচা বারাবনী থানার সমস্ত মানুষের কাছে একদা জনপ্রিয় ছিল। পানুড়িয়া বাজারের‍‌ গৌর ম‌য়রাও ভালো ল্যাংচা তৈরি করতেন। এগুলি সব খুরজা ঘি-তে ভাজা হতো। লালগঞ্জ-সামডিতেও ছয়ের দশকে ঘি-য়ে ভাজা ল্যাংচা পাওয়া যেত। পানুড়িয়া বাজারের কথা বলতে গেলে দেড়শো বছর আগেকার কথা বলতে হয়। ১৮৪০-৪৫ সালে বরাকর কোল কোম্পানির জমিদারীর আমলে বার্ড অ্যান্ড হিলজার্স-এর বড় কয়লাখনি পত্তনের পর এখানে বেশকিছু অর্মেনিয়ান সাহেব বাংলোয় বসবাস শুরু করলেন। গৌরাংডি স্টেশন থেকে আগাবেগ সাহেবের বাংলো পর্যন্ত মোরাম দেওয়া রাস্তা তৈরি হলো কোম্পানি তার দু’পাশে বাজার বসলো। ইটাপাড়া থেকে যেমন ঘাঁটিরা ব্যবসা করতে, তেমনি বিহার থেকে বেশ কিছু সাও পরিবারও এসে গেল। আর এসে গেল বেশ কয়েকটি ময়রা পরিবার। আমরা যখন পাঁচের দশকে স্কুলের নিচু ক্লাসের ছাত্র তখন পরপর নরহরি ময়রা, বাগাল ময়রা, বন্দু ময়রা, পশু ময়রা, সুধীর ময়রা, লখু ময়রা, গৌর ময়রা, নিতাই ময়রা, বলাই ময়রা, চন্দ্র ময়রার দোকান দেখেছি। তখন সাহেবরা পরিত্যক্ত কয়লাখনি, বাংলো এবং স্টেশন ফেলে চলে গেছে ঝরি‌য়ায়। এইসব ময়রাদের পূর্বপুরুষ নাকি ঊনিশ শতকের শেষে এখানে আসেন। গৌর-নিতাই-বলাই’এর মা-র হাতে তৈরি রসগোল্লা আর রাজভোগের খ্যাতি আসানসোল মহকুমাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। পাঁচের দশকে এক আনা ও দু’আনা দামের রসগোল্লা এবং তিন আনা দামের রাজভোগ খাওয়ার জন্য এলাকার ফুটবল টিমগুলি টুর্নামেন্টে অংশ নিতো। অন্যান্য দোকানের জিলপি, গুড়ের চাকতি, গুড়ের নাডু, গুড়ের বাতাসা, চিনির নাড়ু, বালুসাও, গজা, লবঙ্গলতিকা স্কুলের ছেলেদের প্রিয় ছিল। গৌরাংডি, বাসস্ট্যান্ডে নেমে পাশাপাশি গাঁয়ের এমনকি সাঁওতাল পরগনার কুটুমজনও এখানকার রসগোল্লা, জিলিপি, রাজভোগ নিয়ে যেত। হাটুরেরা নাড়ু বা গুড়ের চাকতি বা বাতাসা সহযোগে মুড়ি খেতো।

এখানে লালগঞ্জের ফটি‍‌কের দোকান এবং সামডির কোনো কোনো দোকানে ভালো জিলিপি পাওয়া যায়, তবে খুরজা ঘি দিয়ে ভাজা না হলে সে স্বাদ পাওয়া যাবে না। উখরা-অণ্ডাল-পণ্ডবেশ্বর থেকে শুরু করে জামুড়িয়া, দোমোহানি, গৌরাংডি, সামডিতে যে জিলিপি পাওয়া যায়, বীরভূমের দুবরাজপুর, চাঁচড়া, কুলুটিয়া, বক্রেশ্বরের জিলিপির স্বাদ আলাদা। সামডি পেরিয়ে রূপনারায়ণপুর, মিহিজাম, জামতারার জিলিপির স্বাদ উখরা-অণ্ডালের জিলিপির মতোই। উখরাতে জিলিপ ছাড়াও দুধের চাঁছি দিয়ে তৈরি কালাকন্দ এবং স্যান্ডউইচ মিষ্টির স্বাদও অপূর্ব।

ছানার মিষ্টির মধ্যে রসোগোল্লার মতো ‘অরেঞ্জ’ কয়লাখনি অঞ্চলে সর্বত্র প্রচলিত ছিল। রসোগোল্লার মতোই, তবে তার সাথে একটু কমলালেবুর সেন্ট এবং রঙ দিয়ে তাকে কমলালেবুর আকার দেওয়া হয় এবং তা থেকে কমলালেবুর স্বাদ পাওয়া যায় বলে এর নাম অরেঞ্জ। দুর্গাপুর স্টিল টাউনশিপ মূল হাসপাতাল থেকে রঘুনাথপুর কমলপুর-পারুলিয়া নাচন-প্রতাপপুর হয়ে লাউদোহা যাওয়ায় পথে মাধাইগঞ্জ গ্রামে রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি দোকানে পাওয়া যায় ‘বোম’ মিষ্টি। রাক্ষুসে সাইজের এই অরেঞ্জ-এর দাম এখন আট টাকা পিস্‌। সাইজের জন্যই এর নাম ‘বোম’। তবে এই মারকুটে নাম না রেখে কমলাভোগ নাম রাখাই উচিত ছিল এই মিষ্টির। অপূর্ব এর স্বাদ। আবার, সালানপুর থানার সামডিতে কমলালেবুর পরিবর্তে আমের সেন্ট এবং রঙ দিয়ে বসন্ত লাহার দোকানে পাওয়া যেত পাতলা রসের ছানার মিষ্টি— আম মিষ্টি। বসন্ত লাহার আম মিষ্টি না খাওয়ালে ফুলবেড়ে — লা’হাট— আলক্যুসা-ডাবর-পাহাড়গোড়া- বোলকুণ্ডা-আছড়া-সামডি-পর্বতপুরের জামাইদের মন পাওয়া যেত না। কয়লাখনি পত্তনের পরই এসব মিষ্টির ব্যাপক বিক্রি বেড়েছে এ অঞ্চলে। এখনো কোনো কেনো দোকানে আম মিষ্টি পাওয়া যায়।

ফিরে যাই সেনোলা রেকর্ডে প্রকাশিত নবদ্বীপ হালদারের গানে, যার অন্তরা অংশে রয়েছে বর্ধমানের সীতাভোগ আর মিহিদানার কথা। শোনা যায় লর্ড কার্জনকে সন্তুষ্ট করার জন্য বর্ধমানের মহারাজা তাঁর কারিগরকে দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন এই অপূর্ব মিষ্টি দুটি, যার কোনো বিকল্প নেই। দুই বাংলার কোনো শহরেই বর্ধমানের মতো সীতাভোগ আর মিহিদানা পাবেন না। আগের মতো সে সীতাভোগ আর নেই বলে আক্ষেপ করে লাভ নেই। বনেদী কারিগররা বলেন খাঁটি গাওয়া ঘি বা ভৈঁসা ঘি না পেলে তাঁরা সেই অপূর্ব স্বাদের সীতাভোগ বানাবেন কী করে!

বেলিয়াতোড়ের যামিনী রায়ের নাম যেমন বিগদ্ধজনের কাছে সুপরিচিত তেমনি আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের কাছে এখানের ম্যাচা সন্দেশ সমান জনপ্রিয়। অদ্ভুত এর প্রিপারেশন। বেলিয়াতোড়ের মতো না হলেও মেজিয়া-গঙ্গাজলঘাটি শালতোড়া-ছাতনা-খড়বনায় ভালো ম্যাচা পাওয়া যায়, দামোদর পেরিয়ে দুর্গাপুর অবধি ম্যাচার আনাগোনা। অনুরূপভাবে, নিগনের চিনির মণ্ডা একটি সুপ্রাচীন মিষ্টান্ন। এর ইতিহাস কদমা-বাতাসার মতোই সুপ্রাচীন। বর্ধমান-কাটোয়া রুটে বলগনার পরেই ছোট্ট এ‍‌ই গঞ্জ নিগনের মণ্ডা খাইয়েছিলেন শহীদ কমল গায়েন এক লোকশিল্প মেলায়। মণ্ডার কথা বললেই কমলদা আর হমান ভাই-এর কথা মনে পড়ে। বেলিয়াতোড়ের ম্যাচা-র মতোই জয়নগরের মোয়া পাওয়া যায় ফিরিওয়ালাদের কাছে। আসল মোয়া তাহলে কতই না সুস্বাদু। আরো কত মিষ্টি কত শহর বা গ্রামের যশ বিকীর্ণ করেছে কী সব অপূর্ব কাব্যিক নাম সে সবের লবঙ্গলতিকা, রসমালাই, ক্ষীরকদম, মালাইচমচম, ক্ষীরমালাই, রসকদম্ব, রসপুলি সেসবের ইতিহাস বলতে গেলে পাতার পর পাতা ফুরিয়ে যাবে। এবার একটু অন্য খাবারের স্বাদ নেওয়া যাক।

জি টি রোড এবং হটন রোডের সংযোগস্থলে অ‌্যাটওয়াল্‌স এয়ার কন্ডিশন্‌ড বার অ্যান্ড হোটেল ছিল আসানসোলের একমাত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেল। একটু পূবে ভ্যালি ভিউ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট-এ পাওয়া যেত অপূর্ব স্বাদের মোগলাই পরোটা এবং চিকেন কারি। বিকেলে কলেজ ছুটির পর কলেজের ছেলেমেয়েরা হোটেলের ব্যালকনিতে বসে মোগলাই পরোটা এবং চা অথবা কফি সহযোগে আড্ড দিতো। তার পাশেই নিচেরতলায় ছিল নাগ মহাশয়ের মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। রসোমালাই, আর কচুরি আর আলু চপের জন্য এখানেও কলেজ স্কুল কলেজের ছেলেরা আসতো। গ্রীষ্মকালে নাগ মহাশয়ের লস্যির স্বাদ ছিল অপূর্ব। এখন যেখানে মোহন ক্লথ স্টোর্স হয়েছে সেখানে পাঁচের দশকের শেষাশেষি একটি মিষ্টির দোকান ছিল, নাম ছিল রশ্মি। ঘাঁটিদের দোকানের পাশাপাশি অন্নপূর্ণা বোর্ডিং-এ মাটিতে আসন পেতে ভাত খাওয়ানো হতো। কিন্তু প্রভাত হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট-এর মাংসভাতের স্বাদ ছিলো আলাদা। প্রভাত হোটেলে পাওয়া যেত ভালো মটন চপ, ভেজিটেবল চপ, পুডিং, ব্রেড ওমলেট। তখন ভালো ব্রেড পাওয়া যেত আবদুল ওয়াহিক এবং গ্রেগরির দোকানে। গ্রেগরি ছিলেন আর্মেনিয়ান তাঁর আনস্লাইসড ব্রেড এর টোস্ট বিখ্যাত। আমরা স্কুল লাইফ থেকেই মোগলাই পরোটা, ভেজিটেবল চপ, মাটনচপ ‍টোস্ট-এ অভ্যস্ত ছিলাম। যখন অন্যান্য অঞ্চলের ছেলেরা এসব চোখে দেখেনি। ক্লাস সিক্স থেকে যেবার সেভেনে উঠি। সেবার বাবার সাথে বই কিনতে গিয়ে জনতা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সিঙাড়া আর জিলিপি খেয়েছিলাম। সকাল আটটা থেকে রাত ন’টা সাড়ে ন’টা পর্যন্ত জনতায় সিঙাড়া ভাজা হতো অবিরাম। খদ্দেরদের দাঁড়িয়ে থাকতে হতো সিটে বসার জন্য। জনতার সিঙাড়ার ঘি-এর গন্ধে ম ম করত রাস্তাটা। পথ চলতি বাজার করতে আসা খদ্দেররা সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়তো সিঙাড়ার লোভে। বাজারে পাঁচের দশকে যখন সিঙাড়ার দাম এক আনা, তখন জনতার সিঙাড়ার দাম ছিল দু’আনা। মুন্সিবাজার ঢুকতে ডান পাশের সিঁড়ি বেয়ে উঠে দোতালায় বম্বে মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে পাওয়া যেত দু’আনা প্লেট পকোড়া, গাটিয়া বা মিক্সচার সঙ্গে অপূর্ব চাটনি। তাছাড়া এখানে পাওয়া যেত দু’টাকার মিল-ঘিমাখা রুটি, গোবিন্দভোগ চালের ভাত, মুগডাল, পনীর অথবা আলুর তরকারি, চাটনি, পাপড়। পরে বোম্বে হোটেলে ‍‌ধোসা, দইবড়া, ইডলি এসব দক্ষিণ ভারতীয় খাবার পাওয়া যেত। সে অনেক পরে। বম্বে হোটেলের মত গাঠিয়া বানাতে জানতেন পাথরঘাটার কস্যনাথ সেন। তিনি গৌরাংডি বাজারে গাঠিয়ার প্রচলন। পরে কানন দাঁ, গৌরের ছেলে রামপদ, লণ্টু, কালো বৈরেগী গাটিয়া বানানোর চেষ্টা করলেও বৈদ্যনাথ যেমন বোম্বে হোটেলের মতো গাটিয়া বানাতেন, তেমন আর কেউ বানাতে পারলো না। ছানার মিষ্টির ভালো পাওয়া যেত বান্ধব মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং বেনারস মিষ্টান্ন ভাণ্ডার-এ। আরেকটি অভিজাত হোটেল ছিল ডাকবাংলোর। পাশে— অবন্ডিকা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। অবন্তিকার পাশাপাশি ছিল তৃপ্তি বোর্ডিং। পরে মাদ্রাজ রেস্টুরেন্ট খুললো, তারও পরে বোম্বে হোটেলে দক্ষিণ ভারতীয় খাবার পাওয়া যেত। পূর্বপ্রান্তে পাঞ্জাবীদের একটা হোটেল খুললো— ‘বাবা হোটেল’ তন্দুরি রুটি-চাপাটি রুমালি রুটি তড়কার জন্য।

নাটোরের রানী এবং কৃষ্ণনগরের মহারাজার প্রতিযোগিতায় নাটোরের কাঁচাগোল্লা জিতলেও কৃষ্ণনগরের সরভাজা সরপুরিয়া কোন অংশে কম ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বা ব্রিটিশরাজ পত্তনেরও আগে রাজা মহারাজাদের মর্জিমাফিক নতুন নতুন মিষ্টি আবিষ্কৃত হয়েছিল, আর আসানসোলে দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়ন হওয়ার ফলে এক মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম নেওয়াতে এবং শ্রমিক শ্রেণীর চাহিদা মেটাতে আরো বিভিন্ন খাবারের রেষ্টুরেন্ট এবং হোটেল গড়ে উঠেছিল। বাবা হোটেল, ভারত কফি হাউস, মাদ্রাজ রেস্টুরেন্ট, বম্বে হোটেল, গ্রেগরির রুটির দোকান, মোগলাই চপ, ওমলেটের দোকান আম জনতার দোকানে পরিণত হলো। পাঞ্জাব-সিন্ধু-গুজরাট-মারাঠা-দ্রা‍‌বিড়-উৎকল-বঙ্গ-এর মানুষ একে অপরের খাবারের স্বাদ পেল। রাজা মহারাজারা নয় খেটে খাওয়া মানুষ জাতপাত ধর্ম সম্প্রদায় ভুলে এক টেবিলে বসে খাওয়ার সংস্কৃতি আমদানি করলো।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement