নারী শুধুই ‘শিকার’ নয়

অনিন্দ্য চ্যাটার্জি

১৯ মে, ২০১৩

Image

+

মহিলাদের এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তৃতীয় খসড়া সনদ মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছরের মার্চ মাসে জনসমক্ষে পেশ করা হলে মহিলা আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে এবং প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার শিবির থেকে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় নীতি প্রণয়নের অভিমুখকে কেন্দ্র করে। দারিদ্র্য, পিতৃতান্ত্রিকতা এবং ক্ষমতায়নের প্রশ্নগুলিকে এড়িয়ে রাজ্য সরকার মহিলাদের সম্পর্কে ধারণা ব্যক্ত করেছে তা মূলত সমাজের ‘শিকার’ হিসেবে যা কার্যত প্রগতিশীল পদক্ষেপকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মহিলা সংগঠনগুলি মহিলাদের নীতি প্রণয়নের দলিলে এভাবে চিত্রায়িত রাখার বিরোধিতা করেছে।

সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির নেত্রী কিরণ মোঘে সুনির্দিষ্টভাবে এই নীতির অবাস্তবতা সম্পর্কে মত ব্যক্ত করে বলেছেন— ‘‘এই নীতিতে মহিলা নির্যাতন ও শোষণের ঘটনার উৎস হিসেবে বৃহত্তর সামাজিক পরিকাঠামো ও শাসন ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়নি। এই সরকারী নীতির সনদে সর্বত্র মহিলাদের নির্যাতনের শিকার বা পীড়িত হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা হয়েছে। এই নীতি সংক্রান্ত দলিলে মহিলাদের কল্যাণের মুখাপেক্ষী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অর্থাৎ মহিলারা হলেন নির্যাতিতা এবং উন্নয়নের সুফলের অংশ তাদের প্রাপ্য।’’ মহারাষ্ট্র মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের কাছে নারী মুক্তি আন্দোলন সম্পর্কে সমিতির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুপারিশ জমা করা হয়েছে, যার অন্যতম উদ্যোক্তা হলেন মোঘে। রাজ্যে মহিলাদের জরুরী স্বার্থবাহী বহু বিষয়ে নীতি প্রণেতারা নিশ্চুপ বলে এই মহিলা জোটের অন্যতম নেত্রী মেধা কালে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন— ‘‘উদাহরণস্বরূপ মহিলা কমিশন পুনরায় চালু করা এবং তার গণতান্ত্রিক কার্যকলাপকে সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো অঙ্গীকার বর্তমান খসড়া নীতিতে অনুপস্থিত।’’ প্রসঙ্গত, গত ৪ বছর ধরে এই পদ ফাঁকা পড়ে রয়েছে শাসক এন সি পি এবং কংগ্রেস দলের জোটের মধ্যে বিরোধের কারণে।

খসড়া নীতির বিতর্কিত উদাহরণ পেশ করে মহিলাকর্মী স্নেহা গোলে বলছেন, নতুন মহিলা নীতিতে ‘‘পূর্ণবয়স্ক অবিবাহিত মহিলা’’ বা প্রৌঢ়, কুমারীর বিষয় উল্লেখ করে প্রবীণ মহিলাদের জন্য প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছিল। ‘অর্থাৎ এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে সমস্ত মহিলাকে নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিবাহ করতে হবে এবং যাঁরা সেই বয়স অতিক্রম করবেন তাদেরকে পূর্ণবয়স্ক অবিবাহিত মহিলা হিসেবে ধরা হবে। অর্থাৎ এখানে আমরা মহিলাদের চরম লক্ষ্য হিসেবে পরিবার ও বিবাহের গণ্ডির মধ্যে সীমায়িত করতে চাই। পরিবারের গণ্ডির বাইরে যা কিছু তাকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে পর্যালোচনা করতে হবে বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে সরকারী দলিলে।

নারী মুক্তি আন্দোলন সম্পর্কে সমিতি-র সদস্যা সীমা কুলকার্নি হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন এই নীতি রাজ্যের জন্য কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে ব্যর্থ হবে। তাঁর মতে—‘‘প্রথমত এই নীতি একটি তুলনারহিত দলিল যার কোনো ভবিষ্যত বা পশ্চাতের সঙ্গে কোনোরকম সংযোগ নেই। অতীতের নীতিসমূহের সাফল্যের কোনো পর্যালোচনা যেমন নেই, ঠিক তেমনি লিঙ্গ সমতার কোনো উল্লেখ পর্যন্ত নেই যা এই নীতি প্রণেতারা উন্নতি সাধনের লক্ষ্য স্থির করেছেন।’’ আরও একটি অভিযোগ এই প্রস্তাবিত নীতি সম্পর্কে উঠেছে তাহলো মহিলাদের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বর্তমানের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা সাপেক্ষে এই নীতি রচিত হয়নি। অত্যন্ত সাদামাটা চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। সীমা কুলকার্নি তাঁর পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে বলেছেন—‘‘এই খসড়া প্রস্তাবে কোনো সাম্প্রতিক রাজ্যস্তরীয় পরিসংখ্যান উপস্থাপিত হয়নি মহিলাদের সম্পর্কে। যেমন ক্রমবর্ধমান জাতিগত হিংসার ঘটনাবলী, কৃষিক্ষেত্রসহ অন্য সকল স্তরে শ্রমিকের অসংগঠিতকরণ, নারী-পুরুষ হারের নিম্নগামিতা, সম্মানরক্ষার্থে হত্যা, আবর্জনা সংগ্রহকারীদের পরিস্থিতি, যৌনকর্মী প্রভৃতি সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এইভাবে মহিলাদের সমস্যা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট শ্রেণীগত বোঝাপড়া সকলে থাকলে তবেই শ্রেণীগত সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।’’

মহিলা সংক্রান্ত নীতি রূপায়ণের লক্ষ্যে রাজ্য সরকার প্রণীত খসড়া প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে রাজ্যের মোট আদায়ীকৃত রাজস্বের ১০ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ করা হবে মহিলাদের স্বার্থবাহী নীতিসমূহের লক্ষ্যে। এধরনের বরাদ্দের বিরোধিতা করে শ্রীমতী মোঘে বলেছেন—‘‘লিঙ্গভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ হিসেবে যা বলা হচ্ছে তা আসলে লিঙ্গভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের লক্ষ্যকে সীমিত অর্থে বিবেচনা করার শামিল। এছাড়াও ১০ শতাংশ হলো একটা এককালীন বরাদ্দ। আদতে এই বরাদ্দ হওয়া প্রয়োজন প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। যেহেতু রাজ্যকে তার নীতি সংক্রান্ত প্রস্তাবের উল্লেখ অনুসারে একটা বাজেট প্রস্তুত করতে হবে।’’ তথাপি সংগঠনের পক্ষে মেধা কালে বলেছেন যে মহিলাদের স্বাস্থ্যের অধিকার একজন ব্যক্তি হিসেবে তাঁর নিজস্ব অধিকার এবং তা শুধুমাত্র মা, স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির কোনো উল্লেখ বর্তমানে প্রস্তাবিত নীতিতে নেই। তাঁর অভিযোগ হলো—‘‘বর্তমান নীতিতে মহিলাদের স্বাস্থ্যের গুরুত্ব স্বীকার করা হয়েছে কারণ তা শিশুর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে এবং সার্বিকভাবে সমাজে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।’’ মহিলাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সামাজিক নির্ধারকগুলির উল্লেখ কোনো প্রস্তাবে নেই। কারণ দারিদ্র্য, জাতপাতের সমস্যা, পিতৃতান্ত্রিকতার কবলে পড়ে মহিলারা স্বল্প পুষ্টি, চিকিৎসা পরিষেবার ঘাটতি প্রভৃতির সম্মুখীন হন। এই বিষয়টিও তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

সরকারী নীতিতে বহু ‘ফাঁকা’ প্রতিশ্রুতি দেওয়া রয়েছে বলে মেধা কালে উল্লেখ করেছেন। যেমন প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাউন্সেলিং কেন্দ্র বা প্রতি জেলায় একটি করে মহিলা হাসপাতাল। কারণ সরকার প্রকৃতপক্ষে সাবর্জনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্য থেকেই নিজে দায়িত্ব অব্যাহতি নেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। ‘‘বাস্তবের সঙ্গে এই উল্লেখিত নীতিসমূহের কোনো সামঞ্জস্য নেই, কারণ কোনো যথার্থ সক্রিয় সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র যেমন নেই তেমনি মহিলাদের জন্য আয়রন ও ক্যালসিয়াম ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ পর্যন্ত নেই। মেধা কালে সঠিকভাবেই দাবি জানিয়েছেন প্রচুর প্রচারসর্বস্ব ‘‘মহিলাদের জন্য’’ নীতি প্রণয়ন না করে রাজ্যে আরও প্রসারিত ও সংবেদনশীল স্বাস্থ্য পরিষেবা চালু করা প্রয়োজন। যেখানে মহিলা, দলিত, উপজাতি সম্প্রদায় এবং অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ উপযুক্ত পরিষেবা লাভে সমর্থ হবেন।

দলিত মহিলাদের অধিকার আন্দোলনের আন্তর্জাতিক মঞ্চের সদস্যা স্বাতী কাম্বলে এই নীতির সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন এই নীতির প্রস্তাবনায় বৈচিত্র্য, সামাজিকভাবে নির্যাতিত গোষ্ঠীসমূহের উপর ঐতিহাসিকভাবে অবিচারের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়নি। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন—‘‘ঐতিহাসিকভাবে নির্যাতিন সামাজিক গোষ্ঠীসমূহ, দলিত সম্প্রদায়, ‘পূর্বতন নিচু জাতসমূহ’ এবং সংবিধানে যাদের তফসিলী জাতি, তফসিলী উপজাতি, যাযাবর উপজাতি এবং অ-প্রজ্ঞাপিত উপজাতিসমূহের মহিলারা একেবারে প্রান্তবাসিনী যদি তাদের সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করা হয়েছে বলে না উল্লেখ করি।’’ রাজ্যের মহিলা ও শিশু উন্নয়নমন্ত্রী বর্ষা গায়কোয়াডকে এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন দলিত মহিলাদের সামাজিক অর্থনৈতিক অগ্রসরতার লক্ষ্যে কোনো প্রস্তাবনা এই নীতিতে নেই। তিনি লিখেছেন—‘‘আমরা জোরের সঙ্গে এই সুপারিশ করছি যে বর্তমান নীতির প্রস্তাবনায় একটি আদিবাসী এবং তফসিলী জাতি (আর্থিক) বিকাশ মহামণ্ডল (উপজাতি ও তফসিলী জাতি আর্থিক কল্যাণ পর্ষদ) গঠনের উল্লেখ করা হোক। এর মধ্য উপজাতি ও আদিবাসী মহিলাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে সাফল্য আসবে যা তাদেরকে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে উন্নত মহিলাদের স্তরে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।’’ তাঁর মতে—‘‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই নীতি প্রণেতারা মহিলাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সাংবিধানিক অধিকারকে অস্বীকার করেছে। সুতরাং, আমরা সুপারিশ করছি যে মহিলাদের জন্য রাজনৈতিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। তার মধ্যে এস সি, এস টি, এন টি এবং ডি এন টি মহিলাদের জন্য অংশানুপাতিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক।’’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement