গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বর্ষবরণ

সুরেন মুখোপাধ্যায়

১৫ এপ্রিল, ২০১৫

চৈত্র অবসানে নববর্ষের সূচনা ঈষৎ পরবর্তীকালের সংযোজন। অতীতে ঋক্‌বেদের কাল থেকে শীত ঋতু তথা উত্তরায়ন আরম্ভের দিন থেকে নববর্ষ পালিত হতো। অর্থাৎ প্রাচীনকালে নববর্ষের দিন ছিল পয়লা মাঘ। পরবর্তীকালে শরৎ ঋতু থেকে বর্ষ গণনা প্রচলিত হয়। বর্তমানে যতদূর তথ্য পাওয়া যায় ২৪১ শকে অর্থাৎ ইংরেজি ৩১৯ সালের পয়লা বৈশাখ থেকে নববর্ষের প্রচলন ঘটে। ‍ এই গ্রামবাংলার প্রাচীন জনপদে এই অজস্র নববর্ষের পরব গড়ে উঠেছে মকর সংক্রান্তিকে ‍‌ঘিরে। যেমন বাঁকুড়া, বীরভূমের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী ও তফসিলী জাতির মানুষজন বিশেষ করে বাউরি বাগদীরা খুব ভোরে তীর ধনুক, জালকাঠি পরবর্তীকালে বন্দুক নিয়েও বেরিয়ে পড়ত জঙ্গলে শিকার করতে। শিকারের মাংস সমানভাগে ভাগ করে নেওয়া হতো নিজেদের মধ্যে, উদ্দেশ্য আগামীদিনগুলিতে সুসম্পর্ক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা। জমিদার, ভূস্বামী রাজন্যবর্গও নববর্ষের প্রথমদিন মৃগয়ায় বেরিয়ে শিকারের ফলাফল দেখে সারা বছরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতেন। এই উৎসব এখন অবলুপ্তির পথে তবু বাউরি, বাগদী, সাঁওতালরা আনুষ্ঠানিক শিকারের মহড়া করে বর্ষবরণ উপলক্ষে। অধিকাংশ জঙ্গলই সরকারী বন-বিভাগের তত্ত্বাবধানে, তাতে নানা বাধা নিষেধ। মাংস দোকান থেকেই কিনে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়, কারণ শিকার করা বেআইনি। অন্তরের তাগিদে অতি কষ্টে এই নিম্নবর্গীয় ‌‌‌মানুষজন কায়ক্লেশে বাঁচিয়ে রেখেছেন বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে।

তুষু উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নববর্ষ। তুষু কোন পুজো নয়। ব্রত নয়, তুষুর কোন মন্ত্র নেই। শুধুই গান তাও লিখিত কোন সংকলন নয়। প্রতিবছর নতুন নতুন গান তৈরি করেন গ্রামের মেয়েরা, সেইসব গান সাধারণ জীবনযাত্রার আশা আকাঙ্ক্ষা দুঃখ হতাশার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। মকর স্নানের সাথে গানকে মেয়েরা ভাসিয়ে দেয় নদীর জলে। স্নান অন্তে পুরানোকে ভাসিয়ে দিয়ে নতুন বছরে নতুনভাবে দিনযাপন করতে চায় তারা। দামোদর, গন্ধেশ্বরী, দ্বারকেশ্বর, শালি, শিলাবতি, জয়পণ্ডা, কংসাবতী সমস্ত নদনদীর পাশে মানুষের মেলা। তুষুর ভাসানের সঙ্গে বিদায় নিক বিগতদিনের গ্লানি, ক্লেদ। প্রার্থনা নবীন ঊষার বরাভয়ে নতুন বছরে জনপদ আনন্দে ভরা থাক। বীরভূমে ব্রহ্মদৈত্যের মেলা জমে ওঠে ১লা মাঘ নববর্ষকে ঘিরে। ব্রহ্মদৈত্যের মেলা ব্রহ্মচারী পুজোর অংশ বিশেষ, এটি একান্তভাবেই গ্রামীণ মেলা। কোন নির্দিষ্ট মূর্তি নেই। তবে এই মেলা দেখতে বিভিন্ন গ্রাম থেকে বহুজাতির স্ত্রী-পুরুষ সমবেত হয়। সারাদিন বিকিকিনি, খাওয়া, আনন্দ। বিকাল হওয়ার সঙ্গে আস্তে আস্তে মেলা ভাঙতে থাকে, পড়ে থাকে শূন্য ব্রহ্মডাঙা।

বৈশাখ মাসে নববর্ষকে ঘিরে বিরজিয়া আর কিষাণ উপজাতিদের মধ্যে পালিত হয় সারহুল পরব, এটি বৈশাখকে ঘিরে আবর্তিত হলেও সরাসরি নববর্ষের উৎসব নয়, বরং কৃষিভিত্তিক পরব। তবে এই পরবের মূল উদ্দেশ্য সারা বছর গ্রামের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল। রোগ-ব্যাধি থেকে জনপদকে মুক্ত রাখা। গোরু বাছুর বা অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণী যাতে হিংস্র জন্তুর আক্রমণে নিহত না হয়। সারহুল পরবের এই বৈশিষ্ট্য ও অভিমুখ ইঙ্গিত করে শুভ বর্ষবরণকে।

গ্রামীণ জীবনে পয়লা বৈশাখ নববর্ষেরও একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। এরসঙ্গে চৈত্র শেষের চড়ক, গাজন, গম্ভীরা, বোলান বিশেষভাবে সম্পর্কিত। চৈত্রের দাবদাহের মধ্যে বছরের শেষে ঝরাপাতা খসে পড়ে। চড়ক, গাজনের নানা কৃচ্ছ্রতা ও দুরূহ শারীরিক নিগ্রহের মধ্যেও রোগ শোকে ভোগা সাধারণ মানুষ মনে করে আগামী দিন নির্বিঘ্নে কাটুক। কথায় আছে ধান ভানতে শিবের গীত। শিব কৃষি দেবতা, গ্রামীণ মানুষের ঘরের লোক। গম্ভীরা উৎসবও পালিত হয় চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষকে একত্র করে, তদুপরি বর্ষশেষ শিবের দিন আর শিবপুত্র গণেশ বন্দিত হন সিদ্ধিদাতা হিসাবে লোকজীবনে। স্বাভাবিকভাবেই চৈত্র সংক্রান্তি এবং নববর্ষ একে অন্যের পরিপূরক। এছাড়াও এর একটি অন্যদিক আছে। জমিদারী আমলে চৈত্র শেষ ছিল বাৎসরিক খাজনা জমা দেওয়ার শেষ দিন। জমিদার তালুকদারের লোক অনবরত তাগাদা দিয়ে যেত। অত্যাচার উপদ্রব করত, বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরানীতে এর উল্লেখ আছে, আর এইসব আপদ-বালাই অতিক্রম করেই গ্রামীণ জনপদে বর্ষবরণ। এছাড়াও বীরভূম জেলার নানা স্থানে এবং মুর্শিদাবাদে বোলান গানের আসরের শেষে বর্ষবরণে হাফু গানের আসর বসে।

পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলার নানাস্থানেই চৈত্র সংক্রান্তি ঘিরে গাজন ও চড়কের মেলা বসে। সপ্তাহ বা পক্ষকাল ধরে এইসব মেলা চলে। এছাড়া নববর্ষ বা বর্ষবরণ উপলক্ষেও বেশকিছু মেলার খবর পাই যেমন অধুনা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাসন্তী থানার আমকাড়া গ্রামে প্রতি বছর নববর্ষ উপলক্ষে মেলা বসে। পুতুলনাচ, যাত্রা, লোকগানে জমজমাট সেই মেলা। হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়ায় জগৎপুর গ্রামে প্রতিবছরে বর্ষবরণ উপলক্ষে মেলা বসে। এই মেলা দশদিন ধরে চলে। হাওড়া ও মেদিনীপুর থেকে অজস্র মানুষ এই মেলায় উপস্থিত হন। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ জেলায় কুলিক নদীর ধারে সুভাষগঞ্জে নববর্ষের দিন থেকে ছয়দিনব্যাপী শুরু হয় বাউল মেলা। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে চারশো থেকে পাঁচশো বাউল এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লোক সংস্কৃতিবিদরা এই মেলায় অংশ নেন। প্রতিদিন পনেরো থেকে কুড়ি হাজার মানুষ এই মেলায় উপস্থিত হন। জয়দেব মেলার মতো সমস্ত ধর্মের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির সূত্র স্থাপিত হয় এই মেলাকে ঘিরে। বছরের প্রথম দিন উদ্‌যাপনে সমন্বয়ের চেয়ে সেরা ঐশ্বর্য আর কি হতে পারে।

Featured Posts

Advertisement