রক্তস্নাত ১৪২১ পেরিয়ে
চাই এক প্রকাণ্ড ঝড়

পাপিয়া অধিকারী

১৫ এপ্রিল, ২০১৫

Image

+

রক্তাক্ত, আক্রান্ত, আতঙ্কে-ভরা ১৪২১ যেভাবে চলে গেলো তা রাজ্যের মানুষ ভালোভাবেই টের পেয়েছেন। আমি, আপনি সক্কলেই হাড়ে-হাড়ে বুঝছি রাজ্যের হাল কেমন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মহিলা হয়েও মহিলারা আজ দুষ্কৃতীদের লালসার শিকার। তারা নারীদের সম্ভ্রম লুট করে, খুন করেও প্রশাসনের মদতে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। এর শেষ কোথায় ?

বাংলা নতুন বছরের লেখা শুরুর আগে এ-রকম ভূমিকার প্রয়োজন ছিল না। তবুও কেন জানি না, মনের ভেতর কুরে-কুরে খাওয়া একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা থেকেই এসব কথা লিখতে বাধ্য হচ্ছি। শুধু সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, আজ সংস্কৃতি মহলও নোংরা রাজনীতির শিকার! চলছে মাফিয়া-রাজ। সে কথায় পরে আসছি।

আমি তো সংস্কৃতি-জগতের মানুষ। সংস্কৃতি আমার রক্তে। সেই ছোট্টবেলা থেকেই নাচ-গান-অভিনয়ের আবহে বড় হয়েছি। গত শতাব্দীর আটের দশকে টলিউডে প্রথম পা রাখি। সেই সময় টলিউডে বাংলা নববর্ষ বরণ, অক্ষয় তৃতীয়া দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। নববর্ষ কিংবা অক্ষয় তৃতীয়ার আগেই মহরতের চিঠি পেতাম। হই হই ব্যাপার। তবে নববর্ষের মহরতের আমন্ত্রণপত্র হাতে পেতাম দিন পনেরো আগেই। যেমন গৃহপ্রবেশের সময় বাড়ির দরজায়-দরজায় নানা ফুলের, পাতার সমাহার হতো তেমনি স্টুডিওর ফ্লোরগুলোও আমপাতা-জামপাতায় সেজে উঠতো। বলতে কী, সেদিন স্টুডিওতে ঢোকামাত্র ফুলের গন্ধে মনটা কেমন যেন চনমনে হয়ে উঠতো। ফুরফুরে মেজাজ। মনটাও সতেজ। যদিও ক্যালেন্ডারের পাতায় নববর্ষ মানে গ্রীষ্মের প্রথমস্য দিবস, তবুও বাসন্তিক বাতাসে অন্য একটা শিহরণ অনুভব করতাম। প্রতিটি স্টুডিও যেন মিলনক্ষেত্র। তখন তো এখনকার মতো মোবাইল ফোনের চল ছিল না। ছিল ঘরে রাখা ফোন। তাও সকলের বাড়িতে থাকতো না, পাশের বাড়ি থেকে ফোনের ডাক পড়তো। ফোনে তেমন কথাবার্তার সুযোগ ছিল না। দেখা হতো মহরতের সময়। কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, প্রযোজক, গীতিকার, সুরকার, শিল্প নির্দেশক, মেকআপ ম্যান-সহ শিল্পী-কলাকুশলীদের দেখা মিলতো। এই মিলনক্ষেত্র যাঁর কল্যাণে হতো তিনি প্রচার সচিব। তিনিই তো অনুষ্ঠানের কত্তামশাই। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ধীরেন মল্লিক, শ্রীপঞ্চানন, চঞ্চল ব্রহ্মের মতো প্রচার সচিবদের কথা। আন্তরিকভাবে তাঁরা মহরতের কাজ সুসম্পন্ন করতেন। উদ্যোগটা তাঁদের থাকতো বলেই সেইদিনটাতে সাংবাদিকদের হুড়োহুড়ি দেখার মতো। আপ্যায়নের ত্রুটি নেই। পাত পেতে খাওয়া-দাওয়া। কত স্মৃতি,কত কথা,ফুরোতে আর চায় না।

মনে পড়ছে অনেক স্মৃতিকথা। আজ এই অস্থির সময়ে দমকা বাতাসে খুলে যায় সেই জানলা। উড়ো চোখ মেলে স্পষ্ট দেখতে পাই ‘পুরানো ছবি’। মনটা ব্যথায় ভরে যায়। সেই ছবি হারিয়ে গেছে। তবুও ব্যথা-ভরা মন নিয়ে স্টুডিওতে যেতেই হয়। গিয়ে দেখি সেই সংস্কৃতি, সেই কাছে টেনে-নেওয়া, আন্তরিকতা সব....।

টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় এখন সুস্থ সংস্কৃতি উধাও! চলছে এক মাফিয়ারাজ। আমি বেশ ‘সচেতনভাবেই’ শব্দটা প্রয়োগ করলাম। নোংরা রাজনীতি ঢুকে স্টুডিওপাড়া খান-খান হয়ে যাচ্ছে। আগেকার দিনে প্রযোজনার ক্ষেত্রে পরিচালকদের তেমন বেগ পেতে হতো না। অন্তত আমার চলচ্চিত্র-জীবনে এসব দেখা। এখন রাজনীতির জাঁতাকলে পড়ে ওখানে ‘দাদাগিরি’ চলছে। ওরাই ঠিক করে দেবেন ‘প্রযোজক’কে। আচমকা প্রযোজকরা এখন আর ছবি করতে আসেন না। ‘আচমকা’ বলতে বোঝাতে চাইছি যাঁরা নিজেদের ব্যবসা ছাড়াও মাঝে-মধ্যে ছবি প্রযোজনা করতে ইচ্ছুক, তাঁরা। যদিও কেউ করে থাকেন তাঁরা মাঝপথে দাদাগিরির চাপে পড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। নষ্ট হচ্ছে তাঁদের টাকা। এভাবে বিগত বছরগুলিতে অনেক প্রযোজক লাখ-লাখ টাকা খুইয়ে চোখের জল ফেলে স্টুডিওর ফ্লোর থেকে বিদায় নিয়েছেন। সম্প্রতি আমার এক অভিনেত্রী-বন্ধু স্টুডিও সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমের কাছে যেসব মন্তব্য করেছেন তা সমর্থনযোগ্য। তাঁর সঙ্গে আমার রাজনৈতিক মতাদর্শগত মিল না থাকলেও ওই বক্তব্যটি অনেকাংশে ঠিক। তবুও তিনি সাহস দেখিয়ে স্রোতের বিরুদ্ধে লড়তে তো চাইছেন।

‘ওদের’ ছাতায় তলায় দাঁড়াতে হবে। ওদেরই ঠিক করে দেওয়া লাইটম্যান, চিত্রগ্রাহক, ক্যামেরা নিতে হবে। শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটানো হচ্ছে। পরিচালক, প্রযোজকরা প্রায় ঠুঁটো জগন্নাথ। তাঁদের ভাবনায় কাঁচি।

প্রসঙ্গক্রমে অন্য কথায় আসি। সমাজে ঘটে-যাওয়া ঘটনাই তো সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নানাভাবে ফিরে আসে। আশ্চর্যের বিষয়, বিগত কয়েক বছরে এসব ঘটনা নিয়ে কি কোনো বাংলা ছবি হয়েছে? হয়নি। তাহলে কি কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাও না। তবে ? সত্যি কথাটা হলো : কোনো কাহিনীকার, পরিচালক ছবি করতে সাহস পাননি। পিছিয়ে পড়েছেন প্রযোজকরাও। কারণ, তাঁদের বুকের পাটা নেই। তাঁদের মাথার ওপর থেকে রাজনীতির ছাতা সরে যাবে যে....!

সেই রাম-রাবণের যুগ যেন ফিরে এসেছে। পুঁজিপতরা আজও সমানে রাজত্ব করছে। আসলে বর্ণাশ্রম রয়েই গেছে। শোষিতদের ওপর শোষণ চলছেই। ধর্মকে আশ্রয় করে অনেকে বৈতরণী পার হতে চাইছেন, এখনও। এখন রামকে আশ্রয় করে রাজনীতি চলছে। প্রজারঞ্জক রামচন্দ্রও নারীজাতিকে অপমান করেছিলেন। অপহৃতা সীতাকে ‘কুকুরে চাটা ঘি’ পর্যন্ত বলতে রেয়াত করেননি। একথা এখন ভুলে গেলে তো চলবে না।

নববর্ষের লেখার বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে চলে যাচ্ছি। এটাই তো স্বাভাবিক। কেন জানেন ? আমাদের চেতনার আগুন নিভে গেছে। সেই আগুন জ্বালাতে হবে। রবীন্দ্রনাথের গানের সেই লাইনটা মনে পড়ছে ‘ওরে ঝড় নেমে আয়, আয়রে আমার শুকনো পাতার ডালে’। এখন একটা প্রচণ্ড ঝড় দরকার। এই ঝড়টা উঠুক এ বৈশাখ থেকেই। টলিউডে আবার ফিরে আসুক মুছে-যাওয়া সেই সোনালী দিনের ছবি। এবার মাউসে নয়, নারকেল ফাটিয়ে হোক মহরত। ফের সেই আম পাতা-জাম পাতা দিয়ে সেজে উঠুক প্রতিটি ফ্লোর। আবার আমরা সবাই মিলন প্রাঙ্গণে মিলিত হই। ভুলে যাই রক্তস্নাত ১৪২১-এর ভয়ঙ্কর সব শিউরে-ওঠা ঘটনা। স্বাগত জানাই নতুন বছর ১৪২২-কে। নতুন বাতাস, নতুন আলো, আমাদের নতুন করে নিশ্চয় পথ দেখাবে। সেই পথের দিকেই এখন সকলের চোখ মিশে যাক। পরিশেষে একটু সংযোজন করতে চাই— ১৪২২-এর প্রতিশ্রুতি হোক সততা। ছবির নিচে স্লোগান নয়, কাজের মধ্যে ‘সততা’র স্লোগান বইয়ে দিতে হবে। আমরা সৎ সমাজের ছবি দেখতে চাই।