মে দিবস ও গণ প্রতিরোধ

দীপক দাশগুপ্ত

১ মে, ২০১৫

প্রতিবারের ন্যায় এবছরেও মে দিবস আমাদের কাছে আরও ব্যাপক, আরও মসৃণ শ্রেণি সংগ্রামের বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। মে দিবস আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে দেশ-বিদেশের লক্ষ-কোটি শ্রমিকশ্রেণির নিজ দেশের শ্রেণিসংগ্রাম আর অন্য দেশের‍‌ শ্রেণিসংগ্রামের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করে এগিয়ে চলার পথ অব্যাহত। সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী নয়া উদারনীতি প্রয়োগের বিষক্রিয়ায় আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বের শ্রমিক ও সাধারণ জনগণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কিন্তু, এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী গণপ্রতিরোধ সংগ্রামও এগিয়ে চলেছে দুর্দমনীয়ভাবে।

পুঁজিবাদী নয়া উদারনীতি ও শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ

পৃথিবীতে পুঁজিবাদের সৃষ্টির সাথে সাথে পুঁজিবাদের কবর খননকারী শ্রমিকশ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছে শ্রমিকশ্রেণি নিজ শ্রেণি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রমিক শ্রেণির প্রতিরোধ সংগ্রামের যে অসংগঠিত রূপ ছিল ক্রমশ তা পরিবর্তিত হয়। শ্রেমিক শ্রেণির চেতনার মান যত উন্নত হয়েছে, তাদের প্রতিরোধেরও শক্তিও সেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রমিকশ্রেণি সংগঠিত হয় এবং ঐক্যবদ্ধ হয় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে। পুঁজির শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকের সংগ্রাম গড়ে ওঠে ও ছড়িয়ে পড়ে দেশ দেশান্তরে; আমাদের দেশেও এখানে সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠেছিল শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম।

কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবিতে সংগ্রাম ছিল প্রকৃতপক্ষে পুঁজির শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি ধারা। সেই ধারার সংগ্রাম গড়ে ওঠে ইউরোপে ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে। ইংল্যান্ডের শ্রমিকশ্রেণির কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবির সংগ্রামের ব্যাপকতা এবং গভীরতাতে বাধ্য হয়ে ইংল্যান্ডের বুর্জোয়া শ্রেণি দশ ঘণ্টা কাজের সময় স্থির করে আইন করতে। তার জন্য কার্ল মার্কস উচ্ছ্বসিত ভাষায় প্রশংসা করেন ব্রিটিশ শ্রমিকশ্রেণির। মার্কস ইংল্যান্ডের শ্রমিকশ্রেণির প্রশংসা করে বলেছিলেন ওদের ‘‘কাজের ঘণ্টা কমানোর সংগ্রাম ছিল রাজনৈতিক’’ কারণ এর মাধ্যমে ইংল্যান্ডের বুর্জোয়া গভর্নমেন্ট বাধ্য হয় ১০ ঘণ্টা কাজের সময়সীমা স্থির করে আইন করতে। পুঁজির বিরুদ্ধে আঘাত করার সংগ্রামের ধারায় ১৮৬৪ সালে কার্ল মার্কসের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে প্রথম আন্তর্জাতিক। যা আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতি হিসাবে খ্যাত। বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে ওঠার ফলে দেশে দেশে শ্রমিক সংগ্রামের জোয়ার সৃষ্টি হয়। ফ্রান্সের শ্রমিকশ্রেণি সংগ্রামের উচ্চপর্যায়ে ১৮৭১ সালে বুর্জোয়া শ্রেণির উচ্ছেদ ও শ্রমিকশ্রেণি প্যারিসে ক্ষমতা দখল করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘‘প্যারী কমিউন’’। প্যারী কমিউন ছিল প্রথম শ্রমিক রাষ্ট্র।

কিন্তু প্যারী কমিউন মাত্র ৭২দিন টিকে ছিল। বুর্জোয়া শ্রেণির সশস্ত্র আক্রমণের সামনে টিকতে পারেনি প্রথম শ্রমিক রাষ্ট্র। প্যারী কমিউন পতনের পর মার্কস বলেছিলেন কমিউনের মৃত্যু নেই। কমিউনের আদর্শ চিরভাস্বর।

পরবর্তী সময়ে বিংশ শতকের প্রথম দশকের শেষার্ধে মহান অক্টোবর বিপ্লব কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে রুশ দেশের শ্রমিকশ্রেণিকে সংগঠিত করেছিল। প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন বৈষম্যের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে এবং পৃথিবীতে এক নতুন সমাজব্যবস্থা-সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ৭৪ বছর সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সারা বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণিকে পথ দেখালেও ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতন ঘটে এক শান্তিপূর্ণ প্রতি বিপ্লবের দ্বারা। এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ তার শোষণ আরও তীব্র করতে এবং মুষ্টিমেয় ধন কুবেরের হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটাতে প্রবর্তন করে নয়া উদারনীতি যার নাম বাজার অর্থনীতি। সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদ সারা বিশ্বে দোর্দন্ডপ্রতাপ নিয়ে পুঁজি ও সম্পদ বাড়ানোর কাজে অত্যন্ত তৎপর। সাম্রাজ্যবাদের শোষণ এবং আগ্রাসন ক্রমবর্ধমান। সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের পাণ্ডা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সারা বিশ্বকে নিজেদের কুক্ষিগত করবার বাসনায় মত্ত। উন্নয়নশীল দেশগুলিকে শোষণের মৃগয়া ক্ষেত্র করতে চাইছে তারা। চাইছে বিশ্বের অন্যতম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র চীনকে অবরোধ করতে। সেজন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার বাহু প্রসারিত করছে এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। আমাদের দেশের ওপরেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার থাবা বিস্তার করতে প্রয়াসী। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তার যুদ্ধ জোট ন্যাটো ক্রমশ শক্তিবৃদ্ধি করে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে তার থাবা প্রসারিত করছে। ইউক্রেন হচ্ছে জ্বলন্ত উদাহরণ। ঐ যুদ্ধবাজ শক্তি ইসরায়েলকে মদত দিয়ে প্যালেস্তিনীয়দের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। পৃথিবীকে এক মেরু বিশ্ব হিসাবে গড়ে তুলতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রচেষ্টা অন্তহীন। যদিও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সফল হয়নি। এক মেরু বিশ্বের পরিবর্তে বহু মেরু বিশ্ব গড়ে ওঠার উপাদানগুলি সুস্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ।

বৈষম্যের বিস্তার

সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতন্ত্রের পতন ও বিপর্যয়ের পরে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের প্রবক্তাদের দ্বারা উচ্চ-কণ্ঠে ঘোষিত হয়েছে যে এখন আর শ্রেণির অস্তিত্ব নেই; শ্রেণিসংগ্রামের অস্তিত্ব নেই, নেই কোনো ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কর্মসূচী। সংগ্রামের যে ইতিহাস ছিল সে ইতিহাস আজ সমাপ্ত। (End of the History)

যে বিপ্লবের বাণী শোনা যেতো — পরাক্রান্ত সোভি‌য়েত ইউনিয়নের নাম, সমাজতন্ত্রের কথা বা শ্রমিকশ্রেণি উচ্চারণ করতো গর্বভরে — তা আজ বিলুপ্ত। অতএব শ্রেণি দ্বন্দ্ব, শ্রেণি সংগ্রাম, শ্রেণি বিরোধ আজ অতীত। বুর্জোয়ারা উল্লসিতভাবে বলে চলেছে বর্তমান সময়ে পুঁজিপতি ও শ্রমিক ভাই ভাই। বর্তমান যুগে মালিক শ্রমিকের সহযোগিতাই প্রধান বিষয়। বর্তমানে বিশ্বে কোনো শোষণ নেই; বিগত বিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী এজেন্টরা একথাগুলি আমাদের শোনাবার জন্য বারবার তাদের রেকর্ড বাজিয়ে চলেছে।

কিন্তু বাস্তব কী সে কথা বলে? বাস্তব হলো সারা পৃথিবীব্যাপী ১৯৯১ সাল থেকে পুঁজিবাদ উন্মত্তভাবে তাদের আক্রমণ ক্রমাগত শাণিত করে চলেছে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের ওপর। তাই আমরা দেখি, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী শাসকবর্গের হাসিমুখে, খুশি মনে ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রূঢ় বাস্তব দেখিয়ে দিচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের অনাহার, অর্ধাহার, বেকারী, ছাঁটাই ও মৃত্যু মিছিলের ক্রমবর্ধমানতা। নয়া উদারনীতির অবাধ প্রয়োগের ফলে একদিকে পৃথিবীর সম্পদের বেশিরভাগ জমা হচ্ছে মুষ্টিমেয় ধনকুবেরের হাতে — অপরদিকে উৎপাদক যারা শ্রমিক-কৃষক, তারা তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অর্ধেকের বেশি সম্পদ এক শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রিভূত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বিশ্বের এক শতাংশ সর্বোচ্চ ধনী ১১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক। Organisation for Economic Co-operation and Development (OECD) রিপোর্টে বলা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গড় ১০ শতাংশ সবচেয়ে বেশি ধনীদের সম্পদ ১০ শতাংশ দরিদ্রতম মানুষের সম্পদের থেকে ১৬ গুণ বেশি। উক্ত OECD Countries Report-এ বলা হয়েছে ধনী এবং গরিবের মধ্যেকার বৈষম্য ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে।

বেকারীর প্রশ্নেও দেখা যাচ্ছে উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশে বেকারী সর্বোচ্চ ৮.৪ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে বেকারী ১১ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকারি এই হিসাবে কম করে দেখানো আছে। আই এল ও হিসাব অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে বেকার যুবদের সংখ্যা দ্বিগুণ দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশেও কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নয়া উদারনীতির ব্যাপক প্রয়োগের ফলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র আর্থিক সঙ্কট। অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে বিদেশি পুঁজির সাহায্য নিতে কেন্দ্রীয় সরকার চেষ্টা চালাচ্ছে। বারে বারে কর ছাড় দিয়েছে পূর্বতন ইউ পি এ সরকার। পূর্বতন ইউ পি এ সরকার খুচরো ব্যবসায় ৫১ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করেছে এবং শিল্পপতিদের কাছে প্রাইভেট ব্যাঙ্ক খোলবার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পেনশন বিল পাস করিয়ে প্রাইভেট পেনশন ফান্ড গঠন করেছে। এই ফান্ডের ২৬ শতাংশ বিদেশিদের কাছে দেবার ব্যবস্থা হয়েছে। বর্তমান মোদী নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতাসীন, মোদী সরকার দেশি-বিদেশি বৃহৎ ও একচেটিয়া পুঁজি ও কর্পোরেটের বিশ্বস্ত আজ্ঞাবহ সরকার। এ সরকারের ‘ওয়ান পয়েন্ট’ প্রোগ্রাম হিসাবে শ্রমিক, কৃষক, গরিব সাধারণ মানুষের ওপর শোষণের স্টিম রোলার চালানো, ক্ষমতায় আসার ১১ মাসের মাথায় মোদী সরকার প্রমাণ করেছে যে ‘আচ্ছে দিন’ গরিব মানুষের জন্য নয়, ‘আচ্ছে দিন’ বৃহৎ পুঁজি ও কর্পোরেটদের জন্য। মোদীর শাসনে আম্বানি, আদানি, টাটা, গোয়েঙ্কা ও বিড়লা ও বিদেশি পুঁজির স্বার্থরক্ষা করার প্রশ্নে মোদী সরকার যারপরনাই তৎপর। মোদী সরকার আক্রমণাত্মকভাবে নয়া উদারবাদী অর্থনীতিকে কার্যকর করছে। বি জে পি সরকার রেলওয়েতে বিদেশি বিনিয়োগের পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, রাজ্যসভায় বিমা বিল পাশ করানোর ব্যর্থতা সুনিশ্চিত জেনে লোকসভা-রাজ্যসভাকে এড়িয়ে স্বৈরাচারী পথে অর্ডিন্যান্স জারি করে তাকে আইনিরূপ দিয়েছে। মোদী সরকার যোজনা কমিশনকে ভেঙে দিয়ে ‘‘নীতি আয়োগ’’ নামে তথাকথিত সংস্থা গঠন করে কাজ করতে চাইছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে ২০১৪-২০১৫ সালের কেন্দ্রিয় বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণ করে ৪৩,৪২৫ কোটি টাকা বাজেটে নিয়ে এসেছে। মোদী সরকার এখানেই থেমে থাকেনি তাদের নীতির কারণে আমাদের দেশে বেকারী ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছরের যে যুব আছে, তাদের সংখ্যা হচ্ছে ৩৩০ মিলিয়ন (৩৩ কোটি)। এর মধ্যে বেকারের হার ১৩.৩ শতাংশ।

শিল্পের অধগতির কারণে কর্মহীনতা (Joblessness) প্রযুক্তিবিদ এবং কারিগরিবিদদের মধ্যে বাড়ছে। শ্রমজীবী মহিলাদের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। কেবলমাত্র খুব কম মজুরিতে কিছু কাজের সুযোগ থাকলেও, সেখানে তাদের কাজের কোনো নিরাপত্তা নেই। বি জে পি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার অগণতান্ত্রিকভাবে অর্ডিন্যান্স জারি করে জমি অধিগ্রহণের আইন পাশ করেছে। শ্রম আইন শিথিল করার নামে কেন্দ্রীয় সরকার শ্রমিক কর্মচারীদের অধিকার কার্যত কেড়ে নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার আক্রমণাত্মকভাবে শ্রম আইন বৃহৎ পুঁজি ও কর্পোরেটদের স্বার্থে পরিবর্তন করছে। ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট, কনট্রাক্ট লেবার অ্যাক্ট (রেগুলেশন অ্যান্ড অ্যাবোলিশন অ্যাক্ট) সহ সমস্ত মজুরি সংক্রান্ত অ্যাক্ট পরিবর্তন করতে তৎপর। বৃহৎ পুঁজি ও কর্পোরেটের এই পরিবর্তনের প্রধান লক্ষ্য হল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমশক্তিকে শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে নিয়ে যাওয়া এবং শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে সমগ্র আইন কার্যকর করার ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা। নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই।

ব্যাপক ভিত্তিতে গণ প্রতিরোধ ও বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণি

পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের সংকট, মন্দার কারণে শ্রমিকশ্রেণির ওপরে সমস্ত বোঝা চাপিয়ে দিয়ে নিজস্ব মুনাফার মাত্রা ঠিক রাখা ও বাড়িয়ে চলা, এর ফলস্বরূপ শ্রমিক শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি, শ্রমজীবী মানুষকে করেছে তীব্র যন্ত্রণাক্লিষ্ট।

কিন্তু, শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ অবনত মস্তকে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের এই অর্থনৈতিক আক্রমণ, আগ্রাসন কখনও মেনে নেবে না। এর বিরুদ্ধে গড়ে তুলছে তীব্রতম সংগ্রাম। আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, জাপান, কোরিয়া এবং ভারতের শ্রমজীবী মানুষ গড়ে তুলেছেন প্রতিবাদ প্রতিরোধ সংগ্রাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক, কর্মচারী, ছাত্র, যুব, প্রযুক্তিবিদ সহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবীরা দলমত নির্বিশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র ‘‘ওয়াল স্ট্রিটের’’ সামনে দাঁড়িয়ে সোচ্চারে বলেছে ‘আমরা নিরানব্বই, তোমরা এক’। শ্রমজীবী মানুষের ধর্মঘট লড়াই আছড়ে পড়েছে গ্রিস, পর্তুগাল, ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড সহ সর্বত্র। অস্ট্রেলিয়ায় নয়ানীতির বিরুদ্ধে শ্রমজীবীদের ধর্মঘটের ঢেউ নয়া নজির গড়েছে। ল্যাটিন আমেরিকার বুকে দীর্ঘদিনের মার্কিন শোষণের যন্ত্রকে উৎপাটন করে ল্যাটিন আমেরিকায় দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণির বিশ্বস্ত প্রতিনিধি বামপন্থী, মধ্য বামপন্থীরা সাম্রাজ্যবাদী শোষণের জাল ছিন্ন-ভিন্ন করে বিকল্প জনপ্রিয় নীতি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধে জনপ্রিয় বিকল্পনীতির প্রতীক। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলির জনগণ সমাজতান্ত্রিক কিউবার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের ঘটনায় উজ্জীবিত হয়ে তাদের সংগ্রামের ব্যাপ্তি ঘটিয়ে চলেছে।

তাই প্রতিরোধ চলছে বিশ্বব্যাপী। যে শ্রেণি সংগ্রাম অবলুপ্ত বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করে সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদীরা সোচ্চার হয়েছিল, সেই শ্রেণি সংগ্রামের তরঙ্গাঘাতে বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণি তার শোষণমুক্তির ঝান্ডা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। তারা প্রমাণ করেছে যতদিন দুনিয়াতে শোষণ থাকবে, ততদিন শোষক বুর্জোয়া ও শোষিত শ্রেণির মধ্যেকর শ্রেণি সংগ্রামও অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলবে।

নয়া উদারনীতিকে প্রতিরোধ করতে ৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ১৫টি সাধারণ ধর্মঘট করেছে আমাদের দেশের শ্রমিকশ্রেণি এবং সাধারণ মেহনতি মানুষ। কিন্তু আমাদের দেশের বৃহৎ বুর্জোয়া ও দেশি-বিদেশি কর্পোরেটদের কানে এখনও জল ঢোকানো যায়নি। তাই শ্রমিকশ্রেণি আরও বড় প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছে দৃঢ়বদ্ধভাবে এগিয়ে চলেছে। পুনরায় শ্রমিকশ্রেণির কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন ও ফেডারেশনগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে ধর্মঘটের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

লাল ঝান্ডা থেকে তেরঙ্গা এবং গেরুয়া ঝান্ডা সবাই আজ প্রতিরোধ সংগ্রামের ময়দানে শামিল; এই প্রতিরোধ সংগ্রামের কর্মসূ‍‌চি সারা দেশে এবং রাজ্যে পালন করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। আমাদের সারা রাজ্যে ১৩ই মে হবে গণআইন অমান্য সংগ্রাম; ২৬শে মে হবে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ। আর ৩০শে মে সি আই টি ইউর প্রতিষ্ঠা দিবসে সংগঠিত হবে গণ সমাবেশ এবং গণ অবস্থান। সারা মে মাস এবং জুন মাস চলবে এই সংগ্রামের ধারা। হবে সভা, সমাবেশ, অবস্থান, বিক্ষোভ, জাঠা, বিভিন্ন কর্মসূচিতে উত্তাল হবে এরাজ্য এবং সারা দেশ। দূরে থাকবে না কেউ। মে দিবসে ব্যাপক সংগ্রামের অঙ্গীকার হোক আমাদের আগামী দিনের সংগ্রামের প্রেরণা।

তীব্র সংগ্রামের তরঙ্গাঘাতে মোদী সরকারের জনস্বার্থবিরোধী কর্মসূচিকে থামিয়ে দিতে শ্রমিকশ্রেণি দৃঢ়বদ্ধ। নরেন্দ্র মোদীর সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনকে দমন করতে সাম্প্রদায়িকতা কাজে লাগিয়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টির কাজে ব্যস্ত। বি জে পি-আর এস এসর উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার কাজের জন্যই সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িক শক্তিও তৎপর; এই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তি শ্রমজীবী মানুষ তথা সমগ্র সাধারণ মানুষের চরমতম শত্রু। তাই তীব্রতম শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমেই সর্বস্তরে শ্রেণি ও সাধারণ মানুষের ঐক্য গড়ে তুলে এর মোকাবিলা করতে হবে।

আমাদের করণীয়

শ্রেণি ও গণ সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গে চিরকাল সংগ্রাম আন্দোলন এগিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এ রাজ্যে টি এম সির নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার রাজ্যের গণতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে রাজ্যের গণ আন্দোলন দমন করে মার্কিন প্রভু ও দেশী বৃহৎ ধনীদের স্বার্থরক্ষার কাজ চালাতে সচেষ্ট। শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের ওপর এরাজ্যে ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ত ধরনের আক্রমণ পরিচালিত করা হচ্ছে। এ আক্রমণের দ্বারা বিগত ৪ বছরে ১৬৫ জন লড়াকু বামপন্থী কর্মী ও নেতারা নিহত হয়েছেন। হাজার হাজার গণ আন্দোলনের কর্মী, সংগঠক নিজ বাসস্থান এলাকায় বসবাস করতে পারছে না; হাজার হাজার কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রুজু করা হয়েছে।

প্রতিটি আন্দোলন ভেঙে দিতে টি এম সি দুষ্কৃতী ও সমাজবিরোধী এবং পুলিশ প্রশাসনের যৌথ আক্রমণ পরিচালিত হচ্ছে।

কিন্তু, এরাজ্যে শ্রমজীবী ও গণতান্ত্রিক মানুষ গণতন্ত্র ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মঘট সহ সংগ্রামের অধিকার পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে ও দৃঢ়বদ্ধভাবে অগ্রসর হচ্ছেন। এরাজ্যের বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তি আক্রান্ত ও রক্তাক্ত হলেও তারা সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে রাজ্যের ফ্যাসিস্ত ধরনের সন্ত্রাস মোকাবিলা করছেন। জয় তাদের অনিবার্য। মোদী থেকে মমতা সরকারের আক্রমণ মোকাবিলা করতে অগ্রসর হওয়া - এই হোক এবারের মে দিবসের অঙ্গীকার।