স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে
নেতৃত্ব দিতে হবে শ্রমিক শ্রেণিকেই

১ মে, ২০১৫

Image

+

১লা মে আর্ন্তজাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস। আজ সারা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণির শোষণ ও বঞ্চনা শৃঙ্খল ভাঙার শপথ গ্রহণের দিন। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির স্বার্থে দুনিয়া জুড়ে বর্তমানে যে বাজার অর্থনীতি চালু করা হচ্ছে সেখানে পুঁজির মুনাফা ছাড়া শ্রমিক শ্রেণির প্রতি কর্তব্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক ন্যায় বলে কিছু নেই। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে এক সময় চালু হওয়া সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা শাসক দলগুলি নস্যাৎ করে দিচ্ছে। ফলে ঐ দেশগুলিতে শ্রমিক শ্রেণি সমাজের দুর্বল অংশের সাধারণ মানুষ, বেকার যুবক, পেনশনার্সরা আজ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও অবহেলিত। ওকুপাই ওয়ালস্ট্রিটের আন্দোলন তাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, ‘তোমরা এক শতাংশ, আমরা নিরানব্বই।’

আমাদের দেশ: ২০১৫ সাল। এখানে এখন নরেন্দ্র মোদীর সরকার চলছে। নমঃ নমঃ ওবামা নমঃ। সংকীর্ণ সাম্রাজ্যবাদের তোষণ করাই যেন এই সরকারের এখন প্রধান কাজ। প্রায় এক বছর হলো এন ডি এ জোট সরকার (দশ বছর পর) আবার দিল্লিতে ফিরে এসেছে। কংগ্রেসের দুর্নীতি ভ্রষ্টাচার ও জন‍‌বিরোধী উদার অর্থনীতির কারণে দেশের মানুষ ওদের প্রত্যাখ্যান করেছে। সারা দেশজুড়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বর্ষ পূর্তির প্রস্তুতি শুরু করেছে অথচ আচ্ছে‍‌ দিন লানেওয়ালা সরকারের নাকের ডগায় এখন রাজস্থানের কৃষকের টাটকা লাশ ঝুলছে। নির্বাচনে মোদির সুদিনের প্রতিশ্রুতি ছিল স্রেফ বড়লোকদের জন্য। গরিবরা যেই অন্ধকারে ছিল সেই অন্ধকারেই আছে। ওদের জন্যে উজ্জ্বল ভারতের প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচনী চমক। মনমোহনের আম আদমির সরকারের মতো। বি জে পি সরকারের দু দুটো বাজেট হয়ে গেল অথচ জিনিস-পত্রের দাম কমলো না। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন, কৃষি, সেচ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা সব ক্ষেত্রেই বাজেটে অর্থ বরাদ্দ কমেছে। বিপরীত দিকে সার, বীজ ধান, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কৃষক তার ফসলের লাভজনক দাম পেলো না। বাজেটে বড় বড় কোম্পানি ও পুঁজিপতিদের অঢেল ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হয়েছে, যেন ধনওয়াপসি চলছে। নরেন্দ্র মোদির জন্যে কর্পোরেট হাউসগুলি যে নির্বাচনী ব্যয় করেছিল এখন তা ফেরত দেওয়ার পালা। লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত‍‌ ক্ষেত্র, নবরত্ন সংস্থা, বন্দর, কয়লা, খনিজ, তেল, গ্যাস, রেল, প্রতিরক্ষা সব আজ লুটের জন্যে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মচ্যুত হবে। দেশে নতুন বিনিয়োগ নামে কেন্দ্রীয় সরকার শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে সংগঠিত শিল্প ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় বর্বর ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চাইছে। লক্ষ্য পুঁজিপতিদের মুনাফা আরও বৃদ্ধি করা। দেশের মানুষের সাথে এতো বড় বিশ্বাস ঘাতকতা নরেন্দ্র মোদির সরকারের ক্ষেত্রেই সম্ভব। স্বাধীনতার ৬৮ বছর পরেও দেশে অসংগঠিত ক্ষেত্রের ৯৪ শতাংশ শ্রমজীবীদের জন্যে না আছে ন্যূনতম মজুরি আইন না আছে কোন সামাজিক সুরক্ষা এন ডি এ বা ইউ পি এ কোন সরকারই কিছু করেনি। প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ। প্রথম ইউ পি এ সরকারের সময় বামপন্থীদের চাপে গঠিত অর্জুন সেনগুপ্ত কমিশনের সুপারিশ কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারগুলির প্রায় কেউই কার্যকরী করেনি। একমাত্র ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও কেরালায় বামপন্থী ফ্রন্ট সরকারগুলি নিজস্ব তাগিতেই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেক আগে থেকেই গড়ে তুলতে কাজ শুরু করেছিল।

আমাদের রাজ্য: আমাদের রাজ্যে বর্তমানে ১‍‌কোটি ৮০ লক্ষের বেশি অসংগঠিত শ্রমিক, ১ কোটি খেতমজুর। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার প্রায় সমস্ত ধরনের অসংগঠিত শ্রমিক, বন্ধ কলকারখানার শ্রমিক, খেতমজুরদের জন্যে সামাজিক সুরক্ষা চালু করেছিল যা ওরা সবটা এখনো বন্ধ করতে পারেনি। রাজ্য সরকারের মদতে তৃণমূলের দালালচক্র ও আমলাদের একাংশ ওয়েল ফেয়ার বোর্ডের দপ্তরগুলিকে গরিবের টাকা লুটের ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ওয়েল ফেয়ার বোর্ডগুলির হাতে শত শত কোটি টাকা আছে অথচ সাধারণ শ্রমিকরা পাচ্ছে না। মাঝে মাঝে নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রীকে পেটোয়া কিছু মানুষের হাতে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের টাকা তুলে দিয়ে নিজের ভাবমূর্তি গড়তে দেখা গেলেও রাজ্যের সাধারণ শ্রমিকরা সেই অন্ধকারেই আছে। তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন, মেডিক্যাল বেনিফিট, ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনার জন্যে আর্থিক সাহায্য, দুর্ঘটনায় মৃত্যুকালীন আর্থিক সাহায্য যাতে শ্রমিকরা দ্রুত পেতে পারেন ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। গরিব মানুষের কাছে বামফ্রন্ট সরকারের কাজগুলির সাফল্য আমাদেরই পৌঁছে দিতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকার ই এস আই-কে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকরা আর্থিক সাহায্য না পেয়ে আত্মহত্যা করছেন। অথচ বামফ্রন্ট সরকারের শেষ বছরেও ১৫০০ টাকা করে আর্থিক সাহায্য বন্ধ চা বাগান ও বন্ধ কলকারখানার শ্রমিকরা পেয়েছিলেন। সি আই টি ইউ-র রাজ্য কমিটির সিদ্ধান্ত ছিল, সংগঠিত ক্ষেত্র বা অসংগঠিত ক্ষেত্র—সর্বত্র আমাদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের স্বার্থে যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। কন্ট্রাক্ট লেবার, স্কিম ওয়ার্কার্স, প্যারা টিচারদের সমস্যাগুলি নিয়ে আন্দোলনে কর্মসূচি আগেই গ্রহণ করা হয়েছে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসব্যাপী অসংগঠিত শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজ্যের সমস্ত ব্লক, মহকুমা ও জেলা শহরে আন্দোলন ও ডেপুটেশনের কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। পুনরায় শ্রমিকদের নিয়ে মে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ১লা মে দিবস এবং ৩০শে মে সি আই টি ইউ-র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে সর্বত্র সেমিনার, রাজনৈতিক আলোচনা, রক্তদান কর্মসূচির পাশাপাশি শ্রমিকদের সংগঠিত করা, তাঁদের সদস্যভুক্তি করা দরকার।

কেন্দ্রে বি জে পি-র নেতৃত্বাধীন এন ডি এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এস এস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো শক্তি আমাদের রাজ্যেও সক্রিয় হয়ে উঠছে। এরা জনগণ ও শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য ধ্বংস করে শ্রেণী-শাসন ও শোষণ বজায় রাখতে সক্রিয়। এ বিষয়ে রাজ্যের শ্রমিকশ্রেণিকে সতর্ক থাকতে হবে। রাজ্যে তৃণমূলের হাত ধরে সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসবাদী শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠছে। তৃণমূল সরকারের প্রচ্ছন্ন মদতে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় রাজ্যে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি নিজেদের জমি শক্ত করার চেষ্টা করছে। খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণ কাণ্ড বাংলাদেশের মৌলবাদী জামাতে-ইসলামের মতো সংগঠনের যোগাযোগ আবার এদের সাথে তৃণমূল সাংসদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

গত চারবছর ধরে সরকারি মদতে তৃণমলের সন্ত্রাস চলছে। রাজ্যে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার গভীর চক্রান্ত চলছে। বামপন্থীরা আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য। রাজ্যে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, ছাত্র-যুব আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। নির্বাচনের নামে প্রহসন চলছে। সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তাই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার এই সংগ্রামে আজ শ্রমিকশ্রেণীকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। বিপ্লবী শ্রমিক সংগঠন হিসেবে সি আই টি ইউ-কেই প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে এবং অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে এই কাজে অগ্রসর হতে হবে। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কেন্দ্রের এন ডি এ জোট সরকারের জনবিরোধী, শ্রমিক-বিরোধী পদক্ষেপ, শ্রম আইন সংশোধন, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস ও বেসরকারীকরণের গভীর চক্রান্তের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনগুলিকে নিয়ে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে যে আন্দোলন ও ধর্মঘটের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, তাতে রাজ্যের শ্রমিকশ্রেণীকে শামিল করার শপথ গ্রহণ করতে হবে।