মে দিবসের কথা

প্রদোষ কুমার বাগচী

১ মে, ২০১৫

‘‘স্বাভাবিক কাজের ঘন্টা প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে শ্রমিক ও পুঁজিবাদীদের বহু শতাব্দী ব্যাপী সংগ্রাম’’ —মার্কস (ক্যাপিটাল, প্রথম খন্ড)



আজ ১লা মে। মে দিবস। শ্রমিক শ্রেণীর সৌভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের দিন।

১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরেই হয়েছিল মে দিবসের সূচনা। ১লা মে, ৫ লক্ষাধিক শ্রমিক জড়ো হয়েছিলেন ৮ঘন্টা শ্রম সময় নির্ধারণের এই আন্দোলনে। সেদিন শনিবার কাজের দিনেই লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিল আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার।সেই ডাকে সাড়া দিয়ে কলে কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে শ্রমিকেরা পরিবার পরিজন সহ সবাই যোগ দিয়েছিলেন শান্তিপূর্ণ মিছিলে।প্রত্যেকের মুখে এক স্লোগান - ৮ঘন্টার বেশি কাজ নয়। এই দিনটিতে সাধারণ মানুষও ঐতিহ্যানুগত বসন্তোৎসব ‘মে-ইভ’ বা ‘মে-পুল’ উৎসব পালনে নেমে এসেছিল রাস্তায়।স্বাভাবিক ভাবে সমগ্র শিকাগো শহরে সেদিন কেবল মানুষ আর মানুষ আর শ্রমজীবী মানুষের মিছিল, সঙ্গে নানা ধরণের গান ছড়া কবিতা ও রণধ্বনি।

মিছিল লেক ফ্রন্টে শেষ হলে নানা ভাষায় শুরু হয় বক্তৃতা— ইংরেজি, বোহেমিও, জার্মান ও পোলিশে। শ্রমিক শ্রেণীর নেতা পারসনস্ ও জার্মান শ্রমিক পত্রিকার সম্পাদক স্পাইজ বক্তৃতা দিলেন। নির্বিঘ্নে কেটে গেল প্রথম দিন। রবিবার ছুটির দিনও কেটে গেল একই ভাবে। পারসনস্ এদিন বক্তৃতা দিলেন সিনসিন্নাটিতে।এই সব সমাবেশ ও মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে নানা কুৎসা ছড়ানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল এই শুরু হলো রক্তাক্ত সংঘর্ষ। ঘটতে পারে প্যারি কমিউনের পুনরাবৃত্তি। তাই এই মিছিল মিটিং থেকে সরে এসে শ্রমিকদের উচিৎ কল-কারখানায় উৎপাদন চালু রাখা। নচেৎ চকরি খতম হবে। প্রয়োজনে নতুন লোক নিয়োগ করা হবে।

কিন্তু মালিকদের এই সব হঠকারী কথায় কান না দিয়ে হাজারে হাজারে শ্রমিক কলকারখানা ছেড়ে নেমে পড়েছিল রাস্তায়।লক্ষ লক্ষ মানুষের বিরাট মিছিল পরিচালিত হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবে। সেদিন পুলিসকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল ব্যারাকে। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে এমন সংহতি ও দৃঢ়তা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল মালিকপক্ষের। তাই ঠিক হয়, যে কোন মূল্যে এই আন্দোলন দমনে পুলিসবাহিনীকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রয়োজনে তৈরি করতে হবে প্ররোচনার ফাঁদ।

৩রা মে, সোমবার, ধর্মঘট আরো বিস্তার লাভ করে। ম্যাককর্মিক হারভেস্টার কারখানার সামনে তখন ধর্মঘটিদের জটলা। অতর্কিতে বিরাট পুলিসবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে শ্রমিকদের উপর। ঘটনাস্থলের অনতিদূরে করাতকল শ্রমিকদের এক সভায় তখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন স্পাইজ। তিনি স্বচক্ষে দেখলেন সেই হত্যালীলা। তার প্রতিবাদে সহকর্মীদের সাথে পরামর্শ করে পরের দিন ৪ঠা মে, সন্ধ্যায় হে-মার্কেট স্কোয়ারে ডাকা হলো শ্রমিকদের বৃহত্তম প্রতিবাদ সভা।সেই ডাকে সাড়া দিয়ে হে-মার্কেট স্কোয়ারে সমবেত হয়েছেন কাতারে কাতারে মানুষ।ইতিমধ্যেই পুলিসের এক গুপ্তচর প্ররোচনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পুলিসের দিকে বোমা ছোঁড়ে। এই ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে পূর্বপরিকল্পনামতো পুলিস গুলি চালিয়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়, ঘটনাস্থলে একজন নিহত ও সাতজন আহত হয়। পুলিস চারজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে। নেতারা হলেন—পারসনস্ , স্পাইজ, ফিসার ও এঞ্জেল। নামমাত্র বিচারের প্রহসন করে তাঁদের উপর ফাঁসীর আদেশ জারী করা হয়।

১১ই নভেম্বর ১৮৮৭। এই আন্দোলনের প্রধান নেতা অগাস্ট স্পাইজ ফাঁসীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলেছিলেন—‘‘এমন সময় আসবে যখন কবরের অভ্যন্তরে শায়িত আমাদের নিরবতা জ্বালাময়ী বক্তৃতার চেয়েও বাঙ্ময় হবে, শ্রমিকশ্রেণীর বিজয়লাভের শেষ সংগ্রাম পর্যন্ত সমস্ত লড়াইয়ে প্রেরণা যোগাবে এবং শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’’ কথাগুলির প্রতিটি শব্দ পরবর্তীকালে বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে। আইনের নামাবলী চাপানো নৃশংস এই সরকারী হত্যালীলাকে পৃথিবীর বহু দেশ থেকে ধিক্কার জানানো হয়েছিল। প্রতিবাদের কন্ঠ গর্জে উঠেছিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সভা ও শোভাযাত্রায়। ১৮৮৯ সালের ১৮ই জুলাই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ১৮৯০ সাল থেকে ১লা মে তারিখটি প্রতি বছর শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সৌভ্রাত্র ও সংগ্রামের দিন হিসাবে পালিত হবে। সেদিন থেকে এই দিনটি সর্বত্র পালিত হয়ে আসছে মে দিবস হিসাবে। ‘মে-ইভ’ বা ‘মে-পোল’ দিবস হিসাবে নয়, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসাবে।

সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে শ্রেণীগত ভাবে কোন আন্দোলনই হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না ,বাদ প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই তার এগিয়ে চলা। মেদিবসের আন্দোলনও তার ব্যতিক্রম নয়। ফলে হঠাৎ করে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক এই দিনের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন ব্যাপার তা নয়, এর পিছনে একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল। কলে কারখানায় সর্বত্র আরো মুনাফার লোভে শ্রমিকদের অমানুষিক ভাবে খাটানো হতো— ১২ঘন্টা, ১৬ঘন্টা , ১৮ঘন্টা । তার উপরে ছিল মজুরি সংকোচন। বহুদিন ধরে চলে আসা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণী মুখর হতে শুরু করেছিল উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে। ১৮৬৪ সাল থেকে এই দাবিতে নানা স্থানে গড়ে উঠতে থাকে ‘৮ঘন্টার শ্রম সমিতি’। ন্যশনাল লেবার ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে ৮ঘন্টা আইন পাশ করার দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছিল। অবশেষে ১৮৬৮সালে আমেরিকার আইন সভায় ‘৮ঘন্টার কাজ’-এর একটি আইনও পাশ হলো। কার্ল মার্কস এই আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। শ্রমিকরা ভেবেছিলেন এবার তাদের দাবি বাস্তবায়িত হতে শুরু করবে। কিন্তু বুর্জোয়া ব্যবস্থায় আইন পাশ করানোটাই যে যথেষ্ঠ নয়, তার প্রয়োগের দাবিতেও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি সেটা বুঝতে শ্রমিক শ্রেণীর অনেক সময় লেগেছিল—প্রায় ২০ বছর। তাহলেও সেদিন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের সংগঠিত সৈন্যবাহিনী হিসাবে শ্রমিক শ্রেণী সর্বত্র ৮ঘন্টা কাজের এক সাধারণ দাবি আদায়ে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল।

ভারতে মেদিবসের সূচনা বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। ১৯২৩ সালের ১লা মে, মাদ্রাজের সমুদ্র সৈকতে শ্রমিক নেতা সিঙ্গারাভেলু চেটিয়ারের সভাপতিত্বে ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয়েছিল। সেই সভা থেকেই এই দিনটিকে সরকারী ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণা করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। শোনা যায় হাতের কাছে লাল ঝান্ডা না থাকার কারণে চেট্টিয়ার তাঁর কন্যার শাড়ি ছিঁড়ে তাই দিয়ে পতাকা তৈরি করেছিলেন।

তবে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের ইতিহাস বহু পুরানো।ভাবলে বিষ্মিত হতে হয় যে ১৮৬২সালের মে মাসে হাওড়ায় ১২০০ রেল শ্রমিক ৮ঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘটে সামিল হয়েছিলো! রেল ব্যবস্থার পত্তনের মধ্য দিয়ে যে ঐক্যবদ্ধ আধুনিক ভারতের সূচনা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন তার পেছনে ছিল এই কুলি কামিনের ঐতিহাসিক ভূমিকা।সেই কুলি কামিনেরাই ৮ঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘটের মত বৃহৎ কর্মসূচীতে অংশ নেবার মতো মানসিক শক্তি অর্জন করছে , ৮ঘন্টা কাজের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একথা স্মরণে রাখবার মতো।

স্মরণে রাখা দরকার, মে দিবসের ধর্মঘট হয়েছিল ১৮৮৬ সালে, ৮ঘন্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনের প্রথম প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল তারও কুড়ি বছর আগে ১৮৬৬ সালে। আর তারও আগে ১৮৬২ সালে হাওড়ার রেল শ্রমিকরা এই বিষ্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করে এদেশের সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রদূত হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিল নিজেদের। আবার ঠিক তার ৯ বছর পরে ১৮৭১ সালে (প্যারি কমিউনের বছর) কলকাতা থেকে কে বা কারা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কাছে কলকাতায় একটি শাখা খোলার অনুমতি চেয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন, এবং মার্কসের উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদের সভায় তা পঠিত ও আলোচিতও হয়েছিল। এই সব ঘটনাক্রমই দেখিয়ে দিচ্ছে জঙ্গী চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলার মেহনতী মানুষ শোষণ-মুক্তির সংগ্রামে সর্বভারতীয় পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় উন্নীত হতে কীভাবে তিল তিল করে নিজেদের প্রস্তুত করেছে। অর্জন করেছে একাধিক অধিকার।