পুঁজির শাসনের বিরুদ্ধে আঘাত হানার প্রস্তুতি

এ কে পদ্মনাভন

১ মে, ২০১৫

ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি হিসাবে গত ৫০বছর ধরে সি পি আই (এম) দেশের বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। একই সঙ্গে, পুঁজির শাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহ্যকেও এগিয়ে নিয়ে চলেছে এই পার্টি। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার এই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যা শ্রেণী হিসেবে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।

সি পি আই (এম)-র বিংশতিতম কংগ্রেস ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টকে দেশে শ্রমিকশ্রণীর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে আরও তীব্র ও শক্তিশালী করে তোলার জন্য উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানিয়েছিল। পার্টির উনবিংশতি এবং বিংশতিতম কংগ্রেসের মধ্যবর্তী সময়ে নয়া-উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে দেশের কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে সার্বিক ঐক্য লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এই সময়কালে নয়া-উদারবাদী নীতির বিশ্বায়ন, উদারীকরণ ও বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তিনটি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট এবং অনেকগুলি ক্ষেত্রভিত্তিক ধর্মঘট ও আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেসের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্টে এসম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছিল: ‘‘প্রতিটি সফল কর্মসূচী ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মঞ্চ প্রসারিত হওয়া এবং ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচীতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাকে প্রতিফলিত করেছে।’’

২০১২ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটে এরই প্রতিফলন ঘটেছিল, যা ছিল ১৯৯১ সালে নয়া-উাদারবাদী নীতি চালু হওয়ার পর থেকে এর বিরুদ্ধে হওয়া চতুর্দশ সাধারণ ধর্মঘট। বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেস এটা লক্ষ্য করে বলেছিল: ‘‘স্বাধীন ভারতে এই প্রথম, সমস্ত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন একটি ধর্মঘট কর্মসূচী নেওয়ার একটি মঞ্চে সমবেত হয়েছে......অর্থনীতির সমস্ত ক্ষেত্র থেকে, সরকারী ও বেসরকারী এবং সংগঠিত ও অসংগঠিত, উভয় ধরণের ক্ষেত্রে কর্মরত অসংখ্য স্বাধীন এবং অননুমোদিত ট্রেড ইউনিয়ন এই কর্মসূচীতে ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়ার ফলে এই সাধারণ ধর্মঘট দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ইতিহাসে শ্রমিকশ্রেণীর বৃহত্তম সাধারণ ধর্মঘটে পরিণত হয়েছিল।



ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নতুনভাবে তীব্রতা বৃদ্ধি



বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেসের পরবর্তী সময়ে, ঐক্যবদ্ধ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে নতুনভাবে তীব্রতা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ব্যাপক ট্রেড ইউনিয়ন ঐক্যকে অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এই ঐক্যকে একেবারে নিচুতলা পর্যন্ত প্রসারিত করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। ‘‘যাদের কাছে পৌঁছানো হয়নি, পৌঁছাও তাদের কাছে’’-ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টের পক্ষ থেকে এই স্লোগান দিয়ে ঐক্যকে প্রসারিত করা এবং শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকে শাণিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই সমস্ত প্রচেষ্টার ফলে দেশের শ্রমজীবী জনগণ ২০১৩ সালের ২০-২১শে ফেব্রুয়ারি ৪৮ঘন্টা ব্যাপী আরেকটি ঐতিহাসিক সাধারণ ধর্মঘটে শামিল হয়। এই ঐতিহাসিক ধর্মঘটের আগে ও পরে দেশের সমস্ত জায়গায় ঐক্যবদ্ধভাবে বিক্ষোভ অবস্থান, সমাবেশ, মিছিল, গ্রেপ্তারবরণ কর্মসূচী পালিত হয়। সর্বোপরি ২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর ঐক্যবদ্ধভাবে সংসদ অভিযান কর্মসূচীতে ব্যাপকভাবে শামিল হন শ্রমজীবী মানুষ।

এই সমস্ত কর্মসূচীতে শ্রমিকদের ব্যাপক সাড়া মেলে, যার মধ্যে দিয়ে সমস্ত অংশের শ্রমিকদের মধ্যেই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলনকে সূচিত করেছে। এমনকি, যারা কোনো ট্রেড ইউনিয়নে নিজেদের অন্তর্ভূক্ত করেননি, এমন অংশের শ্রমজীবী মানুষও এই সমস্ত কর্মসূচীতে, বিশেষ করে ৪৮ঘন্টার সাধারণ ধর্মঘটে শামিল হয়েছিলেন।

বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেসের পরবর্তী সময়কালে ব্যাঙ্ক, বীমা, সরকারী কর্মচারী, টেলিকম, কয়লা, বিদ্যুৎ, সড়ক পরিবহন, জলপথ পরিবহন, রেল এবং অসংগঠিত ক্ষেত্র ও প্রকল্পভিত্তিক কর্মীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মচারীদের আরও অসংখ্য ধর্মঘট ও আন্দোলন প্রত্যক্ষ করা গেছে।

এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ক্ষেত্রভিত্তিক ও যৌথ, উভয় ধরণের আন্দোলনেই মহিলা শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ।

তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, হরিয়ানা, তেলেঙ্গানা এবং মহারাষ্ট্রের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলি এবং কয়েকটি ক্রমবর্ধমান শিল্পকেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য ধর্মঘট হয়েছে এই সময়ে। এই সমস্ত ধর্মঘটের অনেকগুলিই হয়েছে নিজেদের পছন্দমত একটি ইউনিয়ন গড়ার প্রশ্নে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের জন্য এবং তার ফলে কর্তৃপক্ষের আক্রমণের শিকার হওয়ার কারণে।

সরকারী ও বেসরকারী উভয় ক্ষেত্রের ঠিকা শ্রমিকরা, উৎপাদনমূলক ও পরিষেবা ক্ষেত্রে যারা এখন নিয়মিত শ্রমিকদের ছাপিয়ে গেছে, এই সময়ে বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্রে ধারাবাহিক ধর্মঘটে শামিল হয়েছেন।

সি আই টি ইউ এবং যারা এই সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ও ভ্রাতৃপ্রতিম, এই সমস্ত ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারী ও বেসরকারী উভয় ক্ষেত্রেই অনেক স্বতন্ত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে।

আমাদের অভিজ্ঞতা হলো যে, যেখানেই আমরা এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের দাবিকে একেবারে নিচুতলা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছি, সেখানেই ঐক্যের জন্য আগ্রহ খুবই স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে। অন্যদিকে, যৌথমঞ্চের পক্ষ থেকে যে দাবিগুলি তুলে ধরা হচ্ছে, তা শুধুই শ্রমিকদের সম্পর্কিত নয়, এগুলি সাধারণ মানুষের দাবি। যারফলে, এই ‌আন্দোলনগুলি সাধারনভাবে জনগণের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।



লোকসভা নির্বাচন ও পরবর্তী সময়

ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল কার্যত বর্তমান সময়কালে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের দুর্বলতাকে প্রতিফলিত করেছে। যখন ট্রেড ইউনিয়নগুলি নয়া-উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে এবং সমস্ত ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই এই নীতিসমূহের বিরুদ্ধে হচ্ছে, তখন আমরা এই সমস্ত বিষয়গুলিকে জনজীবনের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে এবং নির্বাচনের সঙ্গেও কার্যকরীভাবে যুক্ত করতে সক্ষম হচ্ছি না। আমরা নয়া-উদারবাদী নীতিগুলি এবং এর পিছনে যে রাজনীতি রয়েছে, তা শ্রমিকদের দাবিগুলির সঙ্গে যুক্ত করতে পারছি না। এমনকি, এগুলিকে সমসাময়িক ঘটনাবলীর সঙ্গে যুক্ত করে মানুষের সামনে উন্মোচিত করতেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি। শ্রমজীবী জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে মৌলিক দুর্বলতা এখনও বহাল রয়েছে এবং নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে এই দুর্বলতা যে আরো প্রতিফলিত হয়েছে, পার্টির বিভিন্ন দলিলে তা উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা আমাদের শ্রেণীদৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত। আমাদের কাছে শ্রেণী ঐক্য গড়ে তোলা, নিছক একটি রণকৌশলগত প্রশ্ন নয়, এটি রণনীতিগত বোঝাপড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি কর্তব্য। ট্রেড ইউনিয়ন ঐক্য, এই শ্রেণী ঐক্য গড়ে তোলার একটি সূচনামাত্র। এটা কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয় এবং খুবই ধৈর্যসহকারে একাজ করতে হবে।

উল্লেখ্য করার মত বিষয় হলো যে গত কয়েক বছর ধরে ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে যে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে, আজও পর্যন্ত এই ঐক্য বহাল রয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনের পর আসা নতুন সরকার গত এগারো মাসে যেভাবে নয়া-উদারবাদী নীতি রপায়ণের লক্ষ্যে ঘোড়ায় জিন লাগিয়ে দৌড়াচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

শ্রমিকবিরোধী-জনবিরোধী নীতিগুলির আক্রমণ আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকারের ওপর আক্রমণ; শ্রম আইনগুলির সংশোধন; জমি অধিগ্রহণ আইন; বেসরকারীকরণের নীতিগুলি এবং রেল, বীমা, প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলিতে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের জন্য আরও উন্মুক্ত করা; কর্মচারী ভবিষ্যনিধি ও কর্মচারী রাজ্যবীমার সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি থেকে হাত তুলে নেওয়া; সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপকহারে বরাদ্দ ছাঁটাই এবং আই সি ডি এস, মিড-ডে মিল, গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন, এম এন রেগার কল্যাণমূলক প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো; প্রাকৃতিক সম্পদের লুন্ঠন—এই সমস্ত পদক্ষেপই বি জে পি সরকারের কর্পোরেট-মুখী, জনবিরোধী চরিত্রকে সামনে এনে দিয়েছে।

কর্মসঙ্কোচন গুরুতর আকার ধারণ করেছে এবং নতুন কর্মসংস্থান কার্যত কাগজেকলমে বন্দী রয়েছে। কাজের যে সমস্ত সুযোগ বহাল রয়েছে, তার অধিকাংশই অত্যন্ত অস্থিতিশীল প্রকৃতির।

এই পরিস্থিতি শ্রমজীবী জনগণের কাছে বি জে পি সরকারের নীতিগুলির বিরুদ্ধে সরাসরি সংগ্রামে যাওয়ার জন্য তাদের ঐক্য আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানাচ্ছে। এই সমস্ত নীতিগুলির বিরুদ্ধে শ্রমজীবী জনগণের শক্তিশালী প্রতিবাদ আন্দোলন ও প্রতিরোধ আমাদের গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিকদের শক্তিশালী গণপ্রতিক্রিয়া অবশ্যই সমাজের অন্যান্য অংশের জনগণকে নিশ্চিতভাবেই উৎসাহিত করবে, যারা অত্যন্ত নির্দয়ভাবে শোষিত হচ্ছে। অতি দ্রুত একটি তীব্র প্রচার আন্দোলনের স্ফূরণ ঘটাতে হবে, যাতে শ্রমিকরা এই সমস্ত নীতিগুলির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সাধারণ ধর্মঘটের দিকে যেতে পারে।

বর্তমান সময়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের একটি প্রধান দুর্বলতা হলো, সাম্প্রদায়িকতার বিপদকে যৌথ আন্দোলনের মঞ্চ থেকে উত্থাপন করা যাচ্ছে না। অথচ বহুমুখী চেহারার সাম্প্রদায়িকতার বিপদ হলো জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার প্রশ্নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রশ্নে বিভিন্ন স্তরে সুনির্দিষ্ট হস্তক্ষেপ জরুরী হয়ে পড়েছে।

বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেসে উল্লেখ করা হয়েছিল: ‘‘শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে ভারতীয় জনগণের মুক্তির সংগ্রামে ঐকান্তিকভাবে নিয়োজিত একটি পার্টি হিসেবে শ্রেণী ঐক্য ও বিপ্লবী সচেতনতা গড়ে তোলা এবং শ্রমিকশ্রেণীর শক্তিকে এমন একটি স্তরে উন্নীত করার দায়িত্ব এসে পড়েছে, যাতে এই শ্রেণী ভারতে পুঁজির শাসনকে আঘাত হানার জন্য ভারতীয় জনসাধারণের শোষিত অন্যান্য অংশকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার মতো নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়।’’

Featured Posts

Advertisement