মে দিবসে

মানিক সরকার

১ মে, ২০১৫

Image

+

ফুল খেলবার দিন নয় পয়লা মে! রঙ খেলবার দিন নয় পয়লা মে! আনন্দ উৎসব উচ্ছ্বাসের দিন নয় পয়লা মে! চোয়াল চেপে, মুষ্টিবদ্ধ হাত মুক্ত আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে মানুষকে মানুষের সম্মানে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দুর্জয় শপথ নেবার দিন পয়লা মে!

ভারতবর্ষের বুকে এবারের পয়লা মে এসেছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো এক ক্লেদাক্ত পরিবেশে শ্রমিকশ্রেণির, শ্রমজীবী জনগণের সুদীর্ঘ সংগ্রামের পথ বেয়ে কষ্টার্জিত একটির পর একটি অধিকার হরণের প্রেক্ষাপটে।

পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের শ্রমিকশ্রেণি মজুরি নিয়ে দর কষাকষির অধিকার, কর্মস্থলে অনুকূল কাজের পরিবেশের জন্য অধিকার, প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পাশাপাশি ধর্মঘট করার যে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করেছিল, বি জে পি সরকার লেবার-ল’ সংশোধনের মাধ্যমে এক লহমায় তা ছাঁটাই করে দিল মালিক-মহাজনদের উদগ্র লুণ্ঠন-লালসা চরিতার্থ করতে।

শিশু ও মাতৃ কল্যাণের সাথে সম্পর্কিত আই সি ডি এস প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে অর্ধেক করে দিল। এই প্রকল্প থেকে কেন্দ্রীয় সরকার হাত গুটিয়ে নিতে তৎপর। এই স্পর্শকাতর প্রকল্পের দায়িত্ব বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দিয়ে এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত লক্ষ লক্ষ মহিলা কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলতে চাইছে বি জে পি সরকার।

‘রেগা’-র মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের সাথে যুক্ত প্রায় পাঁচ কোটি গ্রামীণ শ্রমজীবী পরিবারের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে নির্দয় ভূমিকা নিচ্ছে বি জে পি সরকার।

কেন্দ্রীয় বাজেটে ঘাটতি পূরণ করতে দেশের লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকৃত অর্থে এই সংস্থাসমূহকে লুটেরা বেসরকারি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বি জে পি সরকার এই সংস্থাসমূহের শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনে অনিশ্চয়তা ডেকে আনবার ব্যবস্থা করছে। লাভজনক জাতীয় বিমা ব্যবসায়ে বিদেশি পুঁজিপতিদের শতকরা ৪৯ ভাগ শেয়ারের মালিকানার সুযোগ দানের সুবাদে প্রকৃত মালিকানা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিদেশি বেসরকারি পুঁজির মুনাফা লুটের সুযোগ লাভের পাশাপাশি জাতীয় বিমা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবার ব্যবস্থাও করেছে এই সরকার। রেল ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি পুঁজিকে অনুপ্রবেশের সুযোগ দানের মাধ্যমে বিদেশি পুঁজিপতিদের শুধু অবাধ মুনাফা লাভের সুযোগই করে দেয়নি, সাথে সাথে এই শিল্পের সাথে যুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এই হচ্ছে আচ্ছে দিন আনার সরকার। এই হচ্ছে গুজরাট মডেল যা এখন ভারত মডেলে পরিণত। যা এখন নির্দয় রক্তচোষা দেশি-বিদেশি মুনাফা শিকারীদের স্বার্থরক্ষার মডেলে পরিণত। দশ মাসের শাসনেই বি জে পি সরকার বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করছে বাকি পঞ্চাশ মাস কোন পথ ধরে চলবে। আরও কঠিন দিন অপেক্ষা করে আছে। এখুনি এই আক্রমণ প্রতিহত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ দিন হবে ভয়াবহ।

শ্রমিকশ্রেণির হারাবার কিছু নেই, তাই ভয়েরও কিছু নেই। শ্রমিকশ্রেণি মাথা নোয়াবার নয় — এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে শ্রমিকশ্রেণিকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। যে শিল্প বা প্রতিষ্ঠান যখন যেখানে আক্রান্ত সেখান থেকে শুরু করতে হবে প্রথম প্রবল প্রতিবাদ। পর্যায়ক্রমে শামিল করতে হবে অন্যান্য শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের সংহতি-সূচক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে। সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মধ্য দিয়েই একে প্রতিপন্ন করতে হবে শ্রমিকশ্রেণীর জাতীয় জঙ্গি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে। আন্দোলন-সংগ্রামের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করতে হবে শাসক ও শোষকের নিষ্ঠুর অমানবিক একতাকে। এই সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণিকে পতাকার রঙ নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে চলবে না। চাই সমস্ত বেড়াজাল অতিক্রম করে সর্বব্যাপক শ্রমিকশ্রেণীর লড়াকু একতা।

সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণিকে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে এ লড়াইয়ে মিত্র শক্তি জড়ো করার, বিশেষ করে কৃষক, খেতমজুর এবং যুব সমাজকে জড়ো করার। এ উদ্যোগে সাফল্য আনতে গেলে শ্রমিকশ্রেণিকে কেবলমাত্র তাদের উপর প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ আক্রমণ প্রতিরোধেই শুধু সংগ্রাম সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষক, খেতমজুর, যুবকসহ সমাজের অন্যান্য সমস্যা জর্জরিত ও আক্রান্তদের লড়াইয়ের পাশেও অবশ্যই স্বতঃপ্রণোদিত বলিষ্ঠ ও আন্তরিকভাবে দাঁড়াতে হবে। এর ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে বোঝাপড়া। এই বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে বৃহত্তর লড়াইয়ের ব্যাপকতম কার্যকর মঞ্চ যার প্রয়োজন আজকের পরিস্থিতিতে প্রশ্নাতীত। এই পথ ধরেই শ্রমিকশ্রেণিকে এগিয়ে যেতে হবে। বুঝতে হবে সমাজের সমস্যাপীড়িত অন্যান্য অংশের সমস্যা নিরসন না করে শ্রমিকশ্রেণি নিজেকে সমস্যা মুক্ত করতে পারে না।

বি জে পি-র মতো কুটিল শাসকেরা মালিক ও মুনাফাবাজদের স্বার্থ রক্ষায় শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনতার সংগ্রামী একতাকে ধ্বংস করতে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। শ্রমিকশ্রেণি ও তাদের মিত্র শক্তিকে বি জে পি-আর এস এস-র এই ঘৃণ্য চক্রান্তের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে। শ্রমিকশ্রেণিসহ সমাজের সকল অংশের সমস্যা জর্জর মানুষের মধ্যেকার গণতান্ত্রিক একতাকে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে। নিজেদের সুসংহত, সচেতন ঐক্যের ভিত্তিতেই চক্রান্তকারীদের বিষ দাঁত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে।

সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই দায়িত্ব প্রতিপালনের সাথে সাথে ত্রিপুরায় কল-কারখানা, শিল্প ক্ষেত্রের পাশাপাশি গ্রাম-শহর নির্বিশেষে যেখানেই বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন, তারা যাতে অসংগঠিত না থাকেন তা দেখতে হবে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে কর্মরত অগ্রণী সংগঠনকে।

শুধু আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত করলেই চলবে না। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে চুলচেরা পর্যালোচনা ও আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে সাফল্য ও দুর্বলতাকে চিহ্নিত করতে হবে। লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে কতটা নতুন শক্তিকে জড়ো করা গেল তা মূল্যায়ন করতে হবে। সাফল্যসমূহকে সংগঠনে সুসংহত করতে হবে। দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এর যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকটিতে নজর দিতে হবে।

সর্বোপরি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নজর দিতে হবে লড়াই-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সাধারণ শ্রমিক-শ্রমজীবীদের রাজনৈতিক চেতনার মান উন্নয়নে। প্রকৃত শত্রু-মিত্র সম্পর্কে ধারণা স্বচ্ছ ও ক্ষুরধার হতে সাহায্য করতে হবে। মতাদর্শগত ভিত সুদৃঢ় করার পাশাপাশি শ্রেণী-শত্রু সম্পর্কে তীব্র শ্রেণী-ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে।