বিভূতি ভূষণ স্মৃতি পুরস্কার

অসীম সরকার

১ জানুয়ারী, ১৯৭০

বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার এবার নিয়ে তৃতীয়বার। ‘পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে বিগত দুই বছর ধরে এই পুরস্কার চালু হয়েছে। এবার তৃতীয়বার। এ বছরও বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার পাচ্ছেন বেশ কয়েকজন লেখক। পুরস্কার প্রাপকদের তালিকায় রয়েছেন প্রশান্ত দাস, প্রণব চট্টোপাধ্যায়, প্রবীর রায়, চিত্তরঞ্জন মণ্ডল, সুধাংশু কুমার রায়, পুলক চট্টোপাধ্যায়, শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, লক্ষী নারায়ণ মীনা, বিশ্বজিত বাউনা, কানাইলাল সরকার, রেবা মুখোপাধ্যায় বিশ্বাস। যে গ্রন্থগুলি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে ‘কদমতল’, ‘অনত্থপদ সংহিতা’, ‘চাঁদ মামার দেশে’, ‘গম্ভীরানন্দ গিরি মহারাজ’, ‘নির্বাচিত দশটি নাটক’, ‘পল্লী কবি জসিমউদ্দিন’, ‘বর্ষা দুয়ার’, ‘গীতাভাষ্য, ‘আত্মখননের ফসিল’। আগামী ৫ই নভেম্বর বাংলা আকাদেমি সভাঘরে সন্ধ্যায় প্রাপকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

কালি ও কলম

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘কালি ও কলম’ বিগত বারো বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে। পত্রিকাটি এপার বাংলায়ও সমান সমাদৃত। এই পত্রিকার মাধ্যমে দুই বাংলার লেখক শিল্পীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চিন্তা-ভাবনা আদান প্রদান ঘটছে কালি ও কলমকে কেন্দ্র করে। দুই দেশের স্বনামধন্যদের পাশে নবীন লেখকদের মননশীল রচনায় সমৃদ্ধ এই পত্রিকা এবার থেকে কলকাতা থেকেও প্রকাশের সিদ্ধান্তে বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমীরা যারপরনাই মুগ্ধ। এপারের তো বটেই সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বহু মানুষের শিকড় রয়ে গেছে ওপার বাংলায়। তাই দুই বাংলার আবেগ ও স্মৃতিমেদুরতার আদানপ্রদানের একটা সুযোগ করে দিচ্ছে এই পত্রিকা। শুধু তাই নয় দুই বাংলার সাম্প্রতিক সাহিত্যচর্চা, অগ্রগতি ও গতিপ্রকৃতিকে তুলে ধরার প্রয়াস গ্রহণ করেছে কালি ও কলম পত্রিকা। যেহেতু দুই বাংলার মানুষ একই ভাষায় কথা বলেন, সাহিত্য রচনা করেন ফলে দুই বাংলার মানুষ ও সাহিত্যিকরা এখন কী ভাবছেন, সেই ভাবনার মিলনসেতুর কাজ করবে এই পত্রিকা। সেই ভাবনা থেকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়ে যাত্রা শুরু করেছে কালি ও কলম।

ঐতিহ্য অন্বেষ

ঐতিহ্য মানব অস্তিত্বের আকর। অন্বেষণ মানুষের স্বভাব বৈশিষ্ট্য। ঐতিহ্যকে আশ্রয় করেই সভ্যতা ত্বরান্বিত হয় প্রগতির পথে। আবার ঐতিহ্যকে পাথেয় করেই বর্তমানের মানুষ হাঁটে ভবিষ্যতের দিকে। সে কারণে ঐতিহ্যের অন্বেষ, মূল্যায়ন তথা অনুধাবন মানবচেতনাকে সমৃদ্ধ করে। এই প্রত্যয় নিয়ে কামারহাটি অঞ্চলের একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মুখপত্র ঐতিহ্য অন্বেষা’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। ‘‘জন্মশতবর্ষে জ্যোতি বসু’’ অনুবদ্ধ ক্রোড়পত্র পত্রিকার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। সম্পাদক অমরনাথ ভট্টাচার্য জ্যোতি বসু ও আমরা নিবন্ধে জ্যোতি বসুর প্রাসঙ্গিক একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ‘‘গণতন্ত্রে জনগণ থেকে আক্রমণ আসে না, আক্রমণ আসে শাসকগোষ্ঠী থেকে, যাঁরা মুষ্ঠিমেয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন।’’ জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক জীবনপঞ্জী ১৯১৪ — ২০১০ সামনে নিয়ে এসেছেন প্রদোষকুমার বাগচী। নানান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জননেতা জ্যোতি বসু : সংসদীয় গণতন্ত্রের এক চ্যাম্পিয়ান কমিউনিস্ট আলোচনা করেছেন সুস্নাত দাশ। অশোক মিত্র যেমন উল্লেখ করেছেন কবিরে পাবে না তাঁর জীবনচরিতে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেও কি পাওয়া সম্ভব? সন্ধান করেছেন যে ইতিহাস হারিয়ে গেছে প্রবন্ধে। যেমন লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় সরাসরি বলেছেন আমার নেতা জ্যোতি বসু। সেইসঙ্গে পত্রিকাটিতে রয়েছে জ্যোতি বসুর লেখনিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ।

অনুবদ্ধ ক্রোড়পত্রের বাইরে সাহিত্য পত্রিকার আদলে চোদ্দটি কবিতা ও বেশ কয়েকটি মননশীল নিবন্ধ জায়গা করে নিয়েছে। উল্লেখযোগ্য কবিরা হলেন জিয়াদ আলী, ভারতি মুৎসুদ্দি, আরণ্যক বসু, অরুণ দাস, কুমকুম চট্টোপাধ্যায়, পরিতোষ রায়। প্রবন্ধ বিভাগে শ্যামল ভট্টাচার্যের শতবর্ষে বিজন আজও নির্জনে নন, চন্দন সেনের শম্ভু মিত্র এক অসংরক্ষিত কিংবদন্তী, হেমন্তকুমার রায়ের প্রসঙ্গ হো চি মিন, গৌতম মুখোপাধ্যায়ের কে? রত্নাকর বাল্মীকি? ও শুভংকর চক্রবর্তীর ফ্যাসিবাদ বিরোধী রবীন্দ্রনাথ পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করবে।

অচিন পটুয়া

সে ধরনের প্রথাগত আঁকার শিক্ষা কোনদিনই ছিল না পুরুলিয়া শহরের চিত্রশিল্পী আশিস নন্দীর। সবাই তাকে চেনে ‘বামা’ বলে। সংসারের বোঝা বইতে একসময় কাঁধে নলকূপ নিয়ে ঠিকাদারের অধীনে কাজ করেছেন। বাঁচার লড়াইয়ে মা, ভাই বোন, স্ত্রী, সন্তানদের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দিতে মিষ্টির দোকানে ব্যাবস্থাপক, ঠিকাদারের হয়ে সাইনবোর্ড লেখার মতন কোন কাজকেই ছোট মনে করেননি। কিন্তু মনের ক্ষিদে কিছুতেই মিটতে চায় না। তাই রঙ তুলি ক্যানভাসই ভরসা। বাবা সাইকেল মিস্ত্রির কাজ করে আটজনের সংসার চালাতেন। দাদু রামকিংকর নন্দী মাটির পুতুল, মূর্তি তৈরি করতেন। একসময় ভাদ্রমাসে ভাদু পরবে তাঁর তৈরি চিনির মূর্তি বা মাটির পুতুলের কদর ছিল। আঠারো বছর বয়স থেকেই আশিসের জীবন সংগ্রাম শুরু।

প্রকাশ কর্মকারের সংস্পর্শে আসার পর বদলে যায় জীবনবোধ। রঙ তুলি ক্যানভাসকে আশ্রয় করে এগিয়ে চলে অচিন পটুয়ার রূপকথা। পুরুলিয়া শহরে জয়শ্রী আর্ট স্কুলে শতাধিক ছাত্রছাত্রী এখন নিয়মিত আশিসের কাছে রঙ তুলির মাধ্যমে জীবনের পাঠ নেয়। কলকাতা, দিল্লি, হায়দরাবাদ, গুয়াহাটিতে যেমন প্রদর্শনী হয়েছে তেমনই নিজের জেলা পুরুলিয়াতেও নিজের আঁকা ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। এই জেলার অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শিল্পীর মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অপূর্ব সেইসব দৃশ্যাবলী এখন আশিসের রঙ তুলি ক্যানভাসে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

বিভাব

বিভাব নাট্য আকাদেমি এখন নাট্যসংস্কৃতি মহলে পরিচিত নাম। কিশোর কবি সুকান্ত লিখেছিলেন ‘এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। বিভাবের এখন আঠারো। নাটক নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু কী নাটক? বিগত কয়েক বছর ধরে নাট্যোৎসব, পত্রিকা প্রকাশ, ছোটদের নিয়ে নাট্য কর্মশালা বছরভর নানান কর্মসূচি। বিভাব নাট্য পত্রিকার এবার তিনে পা। বর্তমান সংখ্যাটি নবীন প্রবীণ নাট্যকর্মীদের সুচিন্তিত লেখায় সমৃদ্ধ। কুন্তল মুখোপাধ্যায়ের স্পষ্ট বক্তব্য এক ভীতু নাট্যকর্মীর আত্মকথনে। বলেছেন রাজ্যে পট পরিবর্তনের পরে যাঁরা আমাদের স্বজন মনে করেননি (না করার স্বাধীনতা তাঁদের একশোভাগ আছে) তাঁরা নিজেদের মতন করে সংস্কৃতির মঞ্চকে তাঁদের ক্ষমতাবলে, তাঁদের মতন করে সাজিয়েছেন—কাকে কোন প্রেক্ষাগৃহে অভিনয় করতে দেবেন অথবা দেবেন না, কোন নাট্যোৎসবে কে, কেন কীভাবে অংশগ্রহণ করবে তার টার্মস-কন্ডিশন ঠিক করা, এবং কে কত অনুদান পাবে কি আদৌ পাবে না, এসব ঠিক করার অগণতান্ত্রিক, আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার নাগপাশে বেঁধে ফেলে সংস্কৃতির গুণগত মানকে একরৈখিক, একমাত্রিক করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। ... ‘আপসমুখী সংস্কৃতি’,‘প্রশ্ন না তোলার সংস্কৃতি’ এখন না সংস্কৃতির প্রধান অঙ্গ। আর ভয়টা এখানেই। শম্ভু মিত্রকে নিয়ে সৌমিত্র বসু লিখেছেন শতবর্ষে মনে পড়ে। নীলিমা চক্রবর্তীর লেখায় ফুটে উঠেছে ‘থিয়েটার মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার কথা বলে’। মানুষের সেই মর্যাদা আত্মসম্মান আজ বাংলার মাটিতে ভূলুণ্ঠিত। এছাড়া স্বল্পদৈর্ঘ্যের চারটি নাটক লিখেছেন মৈনাক সেনগুপ্ত, সঞ্জয় সেনগুপ্ত, বিদ্যুৎ সরকার ও সুশান্ত বিশ্বাস।

সোনালি অতীত

লিলুয়ায় পূর্বরেলের গীতাঞ্জলি ইনস্টিটিউট এখন সোনালি অতীত। বলা চলে প্রায় আটাত্তর বছর ধরে যে গরিমা গীতাঞ্জলি ইনস্টিটিউটের ছিল সেখানে এখন কান পাতলে ঘুঘুর ডাক শোনা যায়। গীতাঞ্জলিকে ঘিরে একদা সরগরম ছিল শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি মহল। এখনও এচত্বরে পা রাখলে মনে হবে যেন বিদেশ বিভূঁইতে রয়েছি। চারিদিকে পামগাছ থেকে নানান ফলের গাছ, রকমারি মরশুমি ফুলের হিল্লোল আর সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রেলওয়ে আবাসন। মাঝখানে প্রশস্ত পরিসরে ইতালিয়ান গ্রথিক শিল্পসুষমায় নান্দনিক দৃষ্টিনন্দন গীতাঞ্জলি ইনস্টিটিউট।

১৯২৭সালের ২০শে জুন তদানীন্তন হাওড়ার পরিবহণ সুপারিটেনডেন্ট এ এম হান্টারের আবাসনে রেলের স্থানীয় ভারতীয় কর্মচারীদের এক সভায় লিলুয়া স্টেশন মাস্টার পি সি ইংলিশ-এর উৎসাহে এই ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৩২ সালের ২৯শে জুন হিউ হ্যামি এর দ্বারোদ্‌ঘাটন করেন। আদিতে নাম ছিল ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট। ১৯৭০ সালে সাধারণ সভা থেকে রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে রেখে নামকরণ করা হয় গীতাঞ্জলি ইনস্টিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারটি ছিল দেখার মতন। ১৯৫০ সালে যাত্রা শুরুর সময় বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ওড়িয়া, গুরমুখী এবং উর্দু ভাষার বইয়ের সংখ্যা ছিল সাড়ে ছয় হাজার। নিয়মিত সাহিত্য সভায় দেশবরেণ্য অনেক গুণীজনের সমাবেশ ঘটতো। তৎকালীন সাহিত্যিকদের সংগঠন ‘রবি-বাসর’-এর একটি অধিবেশনে কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অখিল নিয়োগী, জলধর সেন, মনোজ বসু, গজেন্দ্রকুমার মিত্রসহ প্রায় সমস্ত শিল্পী সাহিত্যিক অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী, কাজী নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এমনকী কাজী নজরুল ইসলাম সংগীত পরিবেশন করেন। নানান অনুষ্ঠানে ওস্তাদ আলী আকবর খান, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়,ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়,জ্ঞানেন্দ্র গোস্বামী, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।

সাংস্কৃতিক জগতে যে ইনস্টিটিউট পথিকৃতের ভূমিকা পালন করতো, কালের অমোঘ নিয়মে আজ আর সেই অবস্থায় নেই। শুধু কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে। এখানে কোন অনুষ্ঠান করতে হলে আয়োজকদের বাইরে থেকে চেয়ার, শব্দ প্রক্ষেপণের ব্যবস্থা ভাড়া করে আনতে হয়। চারদিকে ধুলার আস্তরণ। পরিষ্কার করতেই কালঘাম ছুটে যাবে। পূর্বরেলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী গীতাঞ্জলি ইনস্টিটিউট রক্ষণাবেক্ষণ কী রেলদপ্তরের পক্ষে সত্যিই অসম্ভব?

ফিরে দেখা ইতিহাস

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৬৫ সালের ২৯শে মার্চ বাংলা তথা ভারতীয় নাটকের জগতে প্রথম প্রদর্শনের সাথে সাথে ইতিহাস সৃষ্টিকারী নাটক ‘কল্লোল’। ভারতীয় নাটকের ঐতিহ্যে যে তিনটি নাটকের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয় ‘কল্লোল’ অন্যতম। নাটকের বিষয় ১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহ। নাটক মঞ্চস্থ হবার সঙ্গে সঙ্গে পক্ষে বিপক্ষে নানা মত উঠে আসে। এমনকী রাজনৈতিক মহলও ছিল দ্বিধাবিভক্ত। সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এই নাটক অবিলম্বে বন্ধ করার ফরমান জারি করে। অন্যদিকে কল্লোলের অভিনয় জারি রাখতে মেহনতি মানুষের অবদানও কম নয়। এই নাটক বন্ধের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আনন্দবাজার লিখেছিল ‘‘এ নাটক দেখব না, যারা এসব নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করব না এই সংকল্প গ্রহণ করা ছাড়া আর কোন পন্থা আছে বলে তো জানি না’’ (কমলাকান্তের আসর, ১৪ অক্টোবর, ১৯৬৫)।

কল্লোল নাটকের নাট্যকার নির্দেশক ছিলেন উৎপল দত্ত। মঞ্চ সুরেশ দত্ত, আলো তাপস সেন ও আবহ হেমাঙ্গ বিশ্বাস। মিনার্ভা থিয়েটারে প্রথম অভিনয় ২৯শে মার্চ, ১৯৬৫। অভিনয়ে উৎপল দত্ত, শোভা সেন, শেখর চট্টোপাধ্যায়, শম্ভু ভট্টাচার্য, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। সেই সময়ের দিকপাল সব অভিনেতা অভিনেত্রী।

কল্লোল নাটকের বিপুল জনপ্রিয়তা কমিউনিস্ট বিদ্বেষী প্রতিক্রিয়ার শিবিরকে বিচলিত ও বিব্রত করে তুলেছিল। এনাটকের প্রদর্শন বন্ধের যাবতীয় প্রয়াস তারা গ্রহণ করে। শুধু পত্রপত্রিকায় বিরূপ সমালোচনাই নয়, মিনার্ভা থিয়েটারের গুন্ডামির আশ্রয়ও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে কল্লোল নাটকের অভিনয় বন্ধ করতে পারেনি। এনাটককে বন্ধ করতে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার বিনাবিচারে উৎপল দত্তকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পরের দিন ২৪শে সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ থেকেই আনন্দবাজার পত্রিকা সহ বেশ কয়েকটি কাগজ কল্লোলের বিজ্ঞাপন প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। এমনকি সামাজিক বয়কটের ডাকও দেওয়া হয়। দেশহিতৈষী পত্রিকা ‘‘কল্লোল চলছে, চলবে’’ বলে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হতে থাকে। একই সাথে হাতে লেখা পোস্টারে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছয়লাপ হয়ে যায়। কল্লোল নিয়মিত অভিনয় চালু রাখার দাবিতে দিনের পর দিন ছাত্র যুবরা হলের বাইরে পাহারা দিতে থাকে।

শিল্পী সাহিত্যিকরা উৎপল দত্ত ও জোছন দস্তিদারের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে কলেজ স্কোয়ার থেকে ২৮শে সেপ্টেম্বর মিছিল করে প্রেক্ষাগৃহের সামনে এসে পথসভা করেন। সত্যজিৎ রায় এক বিবৃতিতে বলেছিলেন ‘‘বাংলার সংস্কৃতিতে এক অন্যায় আঘাত’’। অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরা সেই বিবৃতিতে সমর্থন করে স্বাক্ষর করেন। ২৬শে অক্টোবর ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট মঞ্চে প্রতিবাদ সভায় শিল্পী সাহিত্যিকরা মিলিত হন। পরবর্তীকালে ১৯৬৬সালের ২রা মার্চ কলকাতায় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট মঞ্চে গণপ্রতিবাদ সভা হয়। এই সভার আহ্বায়কদের মধ্যে ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার, মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, মধু বসু, মৃণাল সেন, অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

উৎপল দত্তের কথায় বিপ্লবী থিয়েটারকে চেনা যায় শাসকশ্রেণির দালালদের দ্বারা তা কতবার আক্রান্ত হয়েছে তার দ্বারা। কোনও কথার মারপ্যাঁচেই এই সত্যকে ঢাকা যায় না যে, সত্যকার বিপ্লবী নাটকের অভিনয় শাসকশ্রেণি কখনোই বরদাস্ত করতে পারে না, এবং শেষ পর্যন্ত সে অবধারিতভাবে তা নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে। কল্লোল প্রমাণ করেছে সাধারণ মানুষ সঙ্গে থাকলে কোনও বিপ্লবী নাটকের প্রদর্শন শাসকশ্রেণি যতই শক্তিশালী হোক না কেন বন্ধ করতে পারবে না। লিটিল থিয়েটার গ্রুপের কল্লোল নাটক প্রথম অভিনয়ের পঞ্চাশ বছর পরেও সমান প্রসঙ্গিক। কল্লোল চলছে চলবে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement