প্রতিরোধের বর্ণমালা

১ জানুয়ারী, ১৯৭০

বিজয় একটা শব্দ। নিশানের মতন উড্ডীন, উজ্জ্বল, বিকীর্ণ এক শব্দ। শব্দটিকে অর্থময় করে তুলতে হলে কী অপরিসীম ত্যাগ, ধৈর্য, বীরত্ব এবং মতাদর্শে অকল্প আস্থা প্রয়োজন, তার উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা সোভিয়েতের কোটি জনতা। সেই জনতা, সেই লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন দেশে দেশে গড়ে উঠেছিল সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের সত্তর বছর পূর্তি স্মরণ করে পলিমাটি প্রকাশ করেছে তার সংকলন। ফ্যাসিবাদের স্বরূপ, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে শিল্পীদের সংগ্রাম, ভারতীয় ঐতিহ্য স্মরণ ও বিশ্লেষণ করে নিবন্ধ লিখেছেন ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাধন চট্টোপাধ্যায়, সুশ্নাত দাশ কিংবা চন্দন সেনের মতন লিখিয়েরা। পশ্চিমবঙ্গে কিংবা ভারতে আধা-ফ্যাসিবাদী আক্রমণ বা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা নিয়ে গদ্য লিখেছেন কমল গোস্বামী, ময়ূখ চক্রবর্তী। সঙ্গে একগুচ্ছ উজ্জ্বল কবিতা আর গল্প। সবমিলিয়ে পলিমাটি-র প্রতিরোধের বর্ণমালা হয়ে অনুশীলন আর অনুপ্রেরণার উৎস। পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটির মুখপত্র পলিমাটি সম্পাদনা করেছেন তপন দত্ত।

ঝকঝকে ‘ইচ্ছে’

বলতে গেলে একেবারেই অন্যরকম। এবার যেন আরও আকর্ষণীয়। ঝকঝকে ‘ইচ্ছে’-র শারদ সংকলনে খুশি উপচে পড়েছে প্রতিটি লেখায়। রঙিন এবং সাদাকালো ছবিতে আরও প্রাণময় হয়ে উঠেছে ছড়া-কবিতা, বড়গল্প, ছোটগল্প, রূপকথা-উপকথা, নিবন্ধ, বিজ্ঞান, ভ্রমণ, জঙ্গলের গল্প, চিত্র কাহিনি, খেলা, ছোটদের পাতা, ছোটদের আঁকা, কমিক্সে টইটুম্বুর ইচ্ছের ১৬৮পৃষ্ঠা। ছোটদের কথা ভেবেই এই পত্রিকা ফি-বছর প্রকাশিত হয়। এবারে উৎসব সংখ্যায় এ কালের সেরা কবি-সাহিত্যিকদের লেখা শুধু নয়, ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সি এ বি এ-র বর্তমান সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখাও রয়েছে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন ‘বিখ্যাত হতে গেলে কী কী করতে হবে’। লেখক তালিকায় কে নেই? রয়েছেন পবিত্র সরকার, কৃষ্ণ ধর, চণ্ডী লাহিড়ী, চিরঞ্জীব্য কার্তিক ঘোষ, দীপ মুখোপাধ্যায়, প্রচেত গুপ্ত, সুস্মেলী দত্ত, অপূর্বকুমার কুণ্ডু, শ্যামলকান্তি দাস, পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, ঘনশ্যাম চৌধুরি, কিন্নর রায়, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, অশোক সেন, শৈলেন্দ্র হালদার, দেবাশিস বসু প্রমুখ। নিজেদের মনের কথা, মনের ছবি মনের মতন করে শব্দ অক্ষর তুলিতে রাঙিয়েছে ছোটরাও। প্রচ্ছদ বিজন কর্মকারের। ডাঃ গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়, রত্না মিত্রের যৌথ সম্পাদনায় ‘ইচ্ছে’ উপহার দেবার মতনই শারদ সংকলন।

কবিগানের আসর

পশ্চিমবাংলার গ্রামাঞ্চলে অনেক জেলাতেই এখনও মেলা উৎসবে কবিগানের কদর মানুষ যথেষ্টই করেন যেকোন একটি বিষয়কে অবলম্বন করে তার দুটি পক্ষ নিয়ে দুই পাল্লাদার চাপান-ওতোরের মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তোলেন তাৎক্ষণিক গান ছড়া বাদানুবাদের সাহায্যে। সঙ্গে বাজে ঢোল, কবির ধরতাই বুলিকে দোহারেরা চাগিয়ে তোলেন হারমোনিয়াম খঞ্জনির সংগতে। একসময়ে কবিগান শুনতে গ্রামের সাধারণ মানুষ রাত ভোর করে দিতেন। এখন জীবনযাত্রার ছন্দ অন্যরকম হলেও কবিয়ালরা আজও এই গ্রামীণ সাধারণ মানুষকে জুগিয়ে চলেছেন আনন্দরস ও জীবনীশক্তি। সম্প্রতি এমন কয়েকজন লোককবিকেই পাওয়া গিয়েছিল রানুছায়া মঞ্চে একটি কবিগানের আসরে। এঁদের মধ্যে ছিলেন বর্ধমানের কবিয়াল সনৎ বিশ্বাস, বীরভূমের সদানন্দ যশ ও অনাদি দাস, মুর্শিদাবাদের সঞ্চিতা পাল। ঢোলসংগতে ছিলেন মুর্শিদাবাদের চেতন দাস ও নিমাই বায়েন, দোয়ারকি করেন নদীয়ার মনোময় মণ্ডল ও বীরভূমের নবকুমার দাস। গ্রাম বনাম শহর — এই ছিল কবিগানের বিষয়। আসরের শেষে গ্রাম শহরের খেটে-খাওয়া মানুষের সেতুবন্ধন সূচিত হলো সনৎ বিশ্বাস রচিত ‘এলড়াই বাঁচার লড়াই’ গানটির মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠানের ঢোল বেজে ওঠার পর থেকে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে মানুষের ভিড় প্রমাণ করলো অসাধারণ কুশলী এই লোকশিল্পীরা শহরের মানুষকে গান দিয়ে আকর্ষণ করতে পারেন। শুরুতে অনুষ্ঠানের সুর বেঁধে দিয়েছিলেন গণনাট্য সংঘের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদক অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় গণকবি গুরুদাস পালের দুটি গান গেয়ে। শহরের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য ব্যতিক্রমী এই কবিগানের আসরের আয়োজন করেছিল পুনর্ণবা কলকাতা তাদের প্রয়াত উপদেষ্টা ও পথ প্রদর্শক অধ্যাপক যশোধরা বাগচীর স্মরণে।

‘ফিরে দেখা’

১৯৭৭ থেকে ১৯৮২। পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে অসামান্য সময়কাল। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার। শুধু কি প্রতীক্ষা? পশ্চাদপটে ছিল কত মানুষের তুলনাহীন ত্যাগ, কত বীর শহীদের রক্তস্রোত, কত লড়াই সংগ্রাম। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ — স্বল্পমেয়াদী দু’টো যুক্তফ্রন্ট সরকার। বিকল্প গণতান্ত্রিক নীতির আভাস। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে টিকতে দেওয়া হয়নি। মানুষ দেখেছেন। আধাফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের অন্ধকারাছন্ন দিনগুলিও অতিক্রম করেছেন পশ্চিমবাংলার মানুষ। তারপরই এসেছে বামফ্রন্ট সরকার।

চার দশক পর সেই সময়কে ফিরে দেখছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের তরুণ মন্ত্রী। অনেক গুরুদায়িত্ব পালনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সন্ধিক্ষণের সাক্ষী।

ফিরে দেখা’ – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিকতম বই। শারদোৎসবের আগেই পাঠকের হাতে তুলে দিল ন্যাশনাল বুক এজেন্সি। শারদোৎসবের বুকস্টলগুলিতে ‘ফিরে দেখা’ ইতিমধ্যেই হাতে হাতে ফিরছে। ‘ফিরে দেখা’-য় স্মৃতিচারণার ঢঙে যেমন এসেছে গভীর রাজনৈতিক বিষয়, তেমনই কথা প্রসঙ্গে লেখক ছুঁয়ে গেছেন এতাবৎ অকথিত নানা অভিজ্ঞতা – ছোট এবং বড়। অতুল্য ঘোষের বইয়ের তাকে আলবেয়ার কাম্যুর কোন উপন্যাস দেখেছিলেন? কী বলেছিলেন তাঁকে বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায়? কেন নিষিদ্ধ হলো না সমরেশ বসুর বই? রাজবন্দিদের মুক্তি হয়েছিল কিভাবে? আটাত্তরের বন্যা বিধ্বস্ত ঘাটালে কী ঘটেছিল? কলকাতার রাজভবনে মরিচঝাঁপি নিয়ে কী ছিল প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাইয়ের প্রতিক্রিয়া? কলকাতায় শেখ আবদুল্লার সঙ্গে কেমন ছিল ক’টা দিন?

ভূমিকা আর উপসংহার নিয়ে ন’টি উপশিরোনামে গাঁথা পাঁচ বছরের কোলাজ—‘দীর্ঘ অপেক্ষা’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি’, ‘জনগণের হাতে ক্ষমতা’, ‘ঝঞ্ঝা ঝড় মৃত্যু দুর্বিপাক’, ‘প্রথম শিল্প ভাবনা’, ‘ঘটনা এবং রটনা’, ‘স্পর্শকাতর সংবাদপত্র’, ‘ফতোয়া নয় বহুত্ববাদ’, এবং ‘কেন্দ্র রাজ্য’। তবে ফিরে দেখতে গিয়ে এ-বই পাঠককে ভারাক্রান্ত হবার কোনো সুযোগই দেয়নি। মেদহীন ঝজু মার্জিত কথন ভঙ্গি। সংবলদনশীল কলমের কুশলী স্পর্শ। ‘ফিরে দেখা’ – সেই অর্থে শুধু একটা বই নয়। দু’মলাটের মাঝে গ্রথিত স্বাধীনতা উত্তর বাংলার এক ঐতিহাসিক কালপর্বের অনন্য অভিজ্ঞতা। লেখক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এখানে সেই কালপর্বের কেন্দ্রীয় চরিত্রও। যা পাঠকের কাছে বাড়তি পাওনা। ‘ফিরে দেখা’ কি বিগত সময়েরই কথা? কে যেন বলেছিলেন – অতীত আর বর্তমানের মধ্যে নিরন্তর কথোপকথনই ইতিহাস। এ বইয়ের পাঠ বিগত সময়ের অবগতিমাত্র নয়, শুধুমাত্র বামফ্রন্ট সরকারের সময়ের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে বুঝতেই তা আমাদের সাহায্য করে না – উন্মোচিত করে যুগপৎ - নিলাজ স্বৈরাচারে বিদীর্ণ বর্তমান বাংলায় একদা অর্জিত অধিকারগুলি আক্রান্ত ঠিক কোন্‌ পরিসরে।

আঁধার রাতে একলা পাগল

ভবিষ্যতে কিছু করবো বল, বিপ্লবী কখনো হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না— যতীন্দ্রনাথের এই কথা শিরোধার্য করে মানবিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ মঞ্চ প্রকাশ করলো বাঘাযতীনের প্রয়াণের শতবার্ষিক স্মারক গ্রন্থ ‘আঁধার রাতে একলা পাগল’। যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় দেশবাসীর কাছে যিনি বাঘাযতীন নামে পরিচিত। সংকলক ও সম্পাদক প্রবীর সেন জানিয়েছেন এই সংকলনের মূল লক্ষ্য বাঘাযতীন হলেও অন্যান্য ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের উপর সমানভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। সম্প্রতি আঁধার রাতে একলা পাগল স্মারক গ্রন্থটি এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ করেন নন্দন পত্রিকার সম্পাদক অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী। সংকলনের অধিকাংশ রচনাই পুনর্মূদ্রিত। কিন্তু তাতে এতটুকু ক্ষতি হয়নি বরং বাঘাযতীন ও তার সময়কালকে বুঝতে সহায়ক হয়ে উঠেছে। যে সমস্ত লেখকদের রচনায় আমরা বরাবরই ঋদ্ধ হয়ে থাকি। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, ডিরোজিও, মধুসূদন, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ঘোষ, রাসবিহারী বসু, যতীন্দ্রনাথ, মোহিনী চৌধুরি, বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়, অমলেশ ত্রিপাঠী, ভূপতি মজুমদার, ভগৎ সিং, মনোজ বসু, গৌরকিশোর ঘোষ, অতুলপ্রসাদ সেন, বসুধা গুপ্ত, আদিত্য শীল, প্রবীর সেন ও মুজফফ্‌র আহ্‌মদ।





ফিসফিস

কানে কানে ফিসপিস নয়। শারদোৎসবে অন্য ধরনের ফিসফিসের সন্ধান পাওয়া যাবে বালিগঞ্জের সুইনহো স্ট্রিটের এই হেঁসেলে। উৎসবের দিনগুলিতে পাতে রান্নার ব্যঞ্জনের সংখ্যা যদি বাড়ে ক্ষতি কী! তাই তো মেছো খাদ্যরসিকদের পাত পর্বের সূচনা হোক তন্দুরি প্রন, চিতল মাছের শিক কাবাব, ইলিশ মাছ ভাজা, চিতল কালিয়া, চিংড়ি বাঁশ পাতুরি। শুধ মাছ খেলে তো হবে না, থাকতে হবে সাদা ভাত, মুগ মোহর, বাদাম পোলাও নানা পদও। ভাপা ইলিশ আমরা খেয়ে থাকি ঘরে, কিন্তু গন্ধরাজ স্টিমড ভেটকি, তোপসে ভাজা খেতে গেলে কোথায় যাবো, কোথায় পাবো তার হদিশ দিয়েছে ফিশফিশ।

এই হেঁসেলে বাঙালি খুঁজে পাবে মাছ-ভাতের বিপুল সম্ভার। গ্রাম বাংলার ছোঁয়ায় সাজানো শারদোৎসবের দুপুর-রাতের ঠিকানা হতে পারে এই ফিসফিস। দেবাশিস কুণ্ডুর তত্ত্বাবধানে এই ভূরিভোজের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। শারদোৎসবের বিভিন্ন দিনে থাকছেন দেবজ্যোতি মিশ্র, মৈত্রেয়ী মিত্র ব্যানার্জি, অনিন্দ্য চ্যাটার্জিরা। ঘি-ভাত, ডাল, বেগুনভাজার সঙ্গে মাছের নানা পদের পরে থাকবে চাটনি, চকোলেট ফিরনি ও নলেন গুড়ের আইসক্রিমও।





অন্য ভূমিকায়



আলোকেরই ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও... প্রেমের জোয়ারে ভাসাবে দোহারে। সখি ভাবনা কাহারে বলে..। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর সিডি প্রকাশ। খেলা নিয়ে বহু গান নিজে লিখেছেন, সুর করেছেন গান গেয়ে সকলের মন জয়ও করেছেন। এবার অন্য ভূমিকায় দেখা গেলো ভুবন চ্যাটার্জিকে। প্রাক্তন ফুটবলার ও তাঁর স্ত্রী কাকলিকে নিয়ে দ্বৈত রবীন্দ্রসংগীতে আরও একবার নজর কাড়লেন। সম্প্রতি এক সিডি প্রকাশ ঘটলো টেবল টেনিসের নামী তারকা অনিন্দিতা চক্রবর্তীর হাত ধরে। বলাকা মিউজিক প্রকাশিত ভুবন ও কাকলির দ্বৈত রবীন্দ্রসংগীত উৎসবের দিনগুলিতে সংগীতপ্রমীদের কাছে অতিরিক্ত পাওনা।



লালন সাঁই

সারা জীবন একটাই লক্ষ্য মানুষের মিলনের গান এই ভুবনে বিলিয়ে দেওয়া। জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গে গান বেঁধেছেন কিন্তু শত বিপর্যয়েও মানুষকে ছেড়ে যাননি। খাঁচার ভিতর অচিন পাখির যন্ত্রণা অনুভব করেছেন বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের কোনও জাত, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, কুল নেই। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় সেই সার সত্য অনুভব করেছেন। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন। খাঁচার ভিতর অচিন পাখি গানে তিনি মনের অভ্যন্তরের সত্তাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সাথে, যা সহজেই খাঁচা রূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে কিন্তু তবুও একে বন্দি করে রাখা যায় না। লালন সাঁইয়ের প্রয়াণের ১২৫ বছর পরও তাঁর গান মানব সমাজে সমান প্রাসঙ্গিক।

লালনের জন্ম ১৭৭৪ প্রয়াণ ১৭ই অক্টোবর ১৮৯০। বাউল গানের অগ্রদূতদের অন্যতম লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী। যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সবরকমের জাতিগত বিভেদ ভুলে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্তরে স্থান দিয়েছেন। লালনের গান প্রভাবিত করেছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মতন বহু খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীসহ অসংখ্য মানুষকে। লালনের জীবন সম্পর্কে বিশদ কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। তার সবচেয়ে অবিকৃত তথ্যসূত্র তার নিজের রচিত অসংখ্য গান। কিন্তু লালনের কোন গানে তার জীবন সম্পর্কে কোন তথ্য তিনি রেখে যাননি, তবে কয়েকটি গানে তিনি নিজেকে "লালন ফকির" হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হিতকরী পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশত কিছুই বলিতে পারে না।" তরুণ বয়সে একবার তীর্থভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে পরিত্যাগ করে যার যার গন্তব্যে চলে যায়। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করেন মলম শাহ। মলম শাহ ও তার স্ত্রী মতিজান তাকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এরপর লালন তার কাছে দীক্ষিত হন এবং কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে স্ত্রী ও শিষ্যসহ বসবাস শুরু করেন। গুটিবসন্ত রোগে একটি চোখ হারান লালন।[১৪] ছেউড়িয়াতে তিনি দার্শনিক গায়ক সিরাজ সাঁইয়ের সাক্ষাতে আসেন এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হন।

লালনের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে গবেষকদের মাঝে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, যা তার জীবদ্দশায়ও বিদ্যমান ছিল। লালন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেনঃ“লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন - আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।” যদিও তিনি একবার লালন 'ফকির' বলেছেন, এরপরই তাকে আবার 'বাউল' বলেছেন, যেখানে বাউল এবং ফকিরের অর্থ পারস্পরিক সংঘর্ষপ্রবণ।

উপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন,‘‘লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনোও বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।’’লালনের পরিচয় দিতে গিয়ে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘‘কাঙাল হরিনাথ তাঁকে জানতেন, মীর মশাররফ চিনতেন, ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক জলধর সেন বা অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাঁকে সামনাসামনি দেখেছেন কতবার, গান শুনেছেন, তবু জানতে পারেননি লালনের জাতপরিচয়, বংশধারা বা ধর্ম।’’ একটি গানে লালনের সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন

‘‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।

যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান

জাতি গোত্র নাহি রবে।। ”

১৮৯০ সালের ১৭ই অক্টোবর লালন ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেউড়িয়াতে নিজ আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর প্রায় একমাস পূর্ব থেকে তিনি পেটের সমস্যা ও হাত পায়ের গ্রন্থির সমস্যায় ভুগছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতেন না। এসময় তিনি মাছ খেতে চাইতেন। মৃত্যুর দিন ভোর ৫টা পর্যন্ত তিনি গানবাজনা করেন এবং এক সময় তার শিষ্যদের কে বলেনঃ “আমি চলিলাম’’ এবং এর কিছু সময় পরই তার মৃত্যু হয়। তার নির্দেশ বা ইচ্ছা না থাকায় তার মৃত্যুর পর হিন্দু বা মুসলমান কোন ধরনের ধর্মীয় রীতি নীতিই পালন করা হয় নি। তারই উপদেশ অনুসারে ছেউড়িয়ায় তার আখড়ার মধ্যে একটি ঘরের ভিতর তার সমাধি করা হয়। আজও সারা বাংলাদেশ থেকে বাউলেরা অক্টোবর মাসে ছেউড়িয়ায় মিলিত হয়ে লালনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

ভ্রমণ পাখি

তিন বছরে ভ্রমণ রসিকদের কাছে নিজের আসন তৈরি করে নিয়েছে ভ্রমণ পাখি। এবার শারদে ভ্রমণ পাখির পাতায় পাতায় দেশ বিদেশের চেনা অচেনা নানান পর্যটন কেন্দ্রের হদিশ। পাতায় পাতায় মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আলোকচিত্র। মন বলে এখনই ছুটে যাই। এমন কিছু জায়গার খোঁজ দিয়েছেন ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়, সারণিক, পারিজাত মজুদার, চন্দ্রমাধব পাল, সুশোভন মুখোপাধ্যায়, মৌসুমী দাস বিশ্বাস, ঋষিকা মুখোপাধ্যায়, সোমা দত্ত, সঞ্চিতা পাল, ভোলানাথ মাহাতো। আবার অনুপল সেনগুপ্ত লিখেছেন স্বর্গ কি এমনই সুন্দর কাজায়, যা পাঠকদের নজর কাড়বেই। নেতাজীর স্মৃতিমাখা শহর কোহিমার গল্প শুনিয়েছেন গৌতম ঘোষ। সুমনা দের কারসগ ভ্যালি যেন পর্যটকদের অমরাবতী হয়ে উঠেছে। অমরনাথ ভ্রমণের আলো আঁধারির কথা জানিয়েছেন পরিতোষ নাথ। পড়ন্ত বিলেকে তারাশঙ্করের জীর্ণ জন্মভিটে লাভপুরের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন পার্থ প্রামাণিক।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement