বন্ধ রেড ব্যাঙ্ক চা বাগান
গিট্টি কন্দ আর মৃত্যুমিছিল যেখানে রোজনামচা

সঞ্জিত দে

২৫ জানুয়ারী, ২০১৬

‘‘আপলোগ সোচতে হি নেহি, হামলোগ কেয়া খাতে হ্যায়। জঙ্‌লী ঢেঁকি শাক, কচু গেঁড়্যা, চায়ে কা ফুল, ইয়ে সব খাতে হ্যায়’’।

‘‘সারকার সে যো মিলতা হ্যায়, উস্‌সে আধা মাহিনা ভি চলতা নেহি’’।

‘‘হাম লোগ খাতে হ্যায় গিট্টি কন্দ’’।

‘‘মাছ, ডিম, দুধ ইয়ে সব তো হামলোগ কে লিয়ে সপ্‌নো কি বাত হ্যায়’’।

আধা হিন্দি ও আধা সাদ্রি ভাষাতে পিতরুশ খাখা, পঞ্চমী খাখা, মারকোশ এক্কা, আলিসা এক্কা, টাসিলা কুজুর—রা তাদের দৈনন্দিন জীবনের খাদ্য তালিকা ও নানা জ্বলন্ত দুঃখ দুর্দশার কথা বললেন।

বন্ধ রেড ব্যাঙ্ক চা বাগানের বাসিন্দা বিফা লাকড়ার বাড়ির উঠোনে তখন বাগানের বহু শ্রমিকের ভিড় উপ্‌চে পড়েছে। পেটে খিদের জ্বালা নিয়েও মুখে হাসি। গোটা বাগান জুড়ে খুশির মেজাজ। অগ্নিদগ্ধ ছোট্ট নিশারানি সুস্থ হয়ে বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরছে। তাকে দেখতে গোটা চা বাগানের শ্রমিকরাই যেন চার্চলাইনে ওই বাড়ি ছোট উঠোনে হাজির। বিফা লাকড়ার খোলামেলা রান্নাঘরে ডাঁই করে রাখা আলুর মতো এক ধরনের গোলাকৃতি বস্তু। বস্তুটির গায়ে সজারুর কাঁটার মতো অসংখ্য কাঁটা।

এই অদ্ভুত গোলাকৃতি বস্তুটি সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করতেই বন্ধ রেডব্যাঙ্ক চা বাগানের শ্রমিকরা জানালেন, এটা গিট্টি কন্দ। এক ধরনের জংলী কচু। বললেন, ‘আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে এই গিট্টি কন্দ। এর চাষ হয় না। ফরেষ্টের ঘন জঙ্গলে গিয়ে খুঁজে খুঁজে আনতে হয় এই গিট্টি কন্দ।’ শুনলাম, গিট্টি কন্দ সেদ্ধ করে একবার খেলে তারপর দু’দিন আর কিছু না খেয়েও থাকা যায়। নিমপাতার চাইতে তেতো এই জংলী গিট্টি কন্দ খাওয়ার প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জটিল। আলোর খোসার মতো খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে বার বার জলে সেদ্ধ করে সেদ্ধ করা জল ফেলে দিতে হয়। তারপর উনুনের ছাঁই দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে আবার জলে সেদ্ধ করে পুরোপুরি তেতোভাব কমিয়ে লবণ লঙ্কা দিয়ে গিট্টি কন্দ খাওয়া হয়।

জানালেন, বাগানে দীর্ঘদিন থেকে কোন কাজ নেই। আমাদের জন্য সরকার থেকে বরাদ্দ মাথা পিছু প্রতি মাসে মাত্র ৭কেজি চাল ও গম। প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন শ্রমিকরা, ‘‘বলুন তো এই দিয়ে কি সংসার চলে’’? নদীতে পাথর তুলে যদি কখনও সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই সামান্য আলু, তেল, নুন, পেয়াজ, লঙ্কা কিনে আনি। আমাদের ঘরে নুন সবসময়ই মজুত করে রাখি। নুন ঘরে থাকলে সরকার থেকে পাওয়া চাল গম ফুটিয়ে খাওয়া যায়। আর সরকার থেকে চাল গম না জুটলে কোন সময় তো শুধু জল খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি।

গত ২০১২সালে শ্রমিকদের কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করে মালিকপক্ষ বাগান বন্ধ করে পালিয়ে যায়। গত ৪ বছর ধরে ডুয়ার্সের বন্ধ রেড ব্যাঙ্ক চা বাগানের শ্রমিকরা অনাহার, অর্ধাহার, চিকিৎসার অভাবে, চরম দারিদ্রতার অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। গত দু’বছরে না খেতে পেয়ে এই বাগানে ইতোমধ্যেই ৩১জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গোটা বাগান জুড়ে হাহাকার। বিগত বামফ্রন্ট সরকার বাগান মালিকের শ্রমিক শোষন নীতির বিরুদ্ধে শ্রমিকস্বার্থ রক্ষার্থে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো। বামফ্রন্ট সরকারের শ্রমিকদরদী নীতি গ্রহণের দরুন সেই সময় চা বাগিচা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছিলো। বিগত বামফ্রন্ট সরকারের সময়েও নানা কায়দায় মালিকপক্ষ কয়েকবার এই বাগান বন্ধ দেয়। কিন্তু আইনের জোরে বিগত বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে মালিকপক্ষকে বন্ধ বাগান খুলতে বাধ্য করা হয়।

এছাড়াও নির্দিষ্ট আইনের ভিত্তিতে চা শ্রমিকদের জীবনের উন্নতি কল্পে ও পঞ্চায়েত এলাকায় উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে বিগত বামফ্রন্ট সরকারের আমলে শ্রমিকদের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা হয়েছিলো। পঞ্চায়েতের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বন্ধ বাগানের শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলো তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। কিন্তু এসবই এখন অতীত।

দিনের পর দিন জংলী কচু খেয়েই দিন কাটাচ্ছেন বন্ধ রেডব্যাঙ্ক বাগানের শ্রমিকরা। শরীরে বাসা বাঁধছে নানা দূরারোগ্য ব্যাধি। না খেতে পেয়ে চিকিৎসার অভাবে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যুর মিছিল চলছেই। যদিও বর্তমান রাজ্য সরকারের দাবি ‘‘অনাহারে বাগিচা শ্রমিকদের মৃত্যুর কোন ঘটনা ঘটেনি’’। বন্ধ রেডব্যাঙ্ক চা বাগানে দু’বার দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এসেছিলেন। ২০১৪সালের বিশ্ব খাদ্য দিবসের অনুষ্ঠানে রেডব্যাঙ্ক চা বাগানের হাসপাতালের মাঠে এসেছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। কিন্তু শ্রমিকদের অবস্থা যে তিমিরে ছিলো সেখানেই রয়ে গেছে। শ্রমিক মৃত্যু এখন বন্ধ চা বাগানের রোজনামচা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসবের মাঝেই আরেক চিত্র ফুটে উটছে ডানকানের বাগান ধুমচিপাড়াতে। অনেক মৃত্যু, অনেক দুঃখ,কষ্ট,যন্ত্রণা আমরা দেখেছি কিন্তু আর না এবার ঘুরে দাঁড়াবার পালা। সেকারনে এই বাগানের সব শ্রমিক ইউনিয়ন জোট বদ্ধ। পতাকার সব রঙ ভুলে এক মঞ্চে দাড়িয়ে গঠন হোল বাগান বাঁচাও কমিটি। কথা বলছিলেন সি আই টি ইউ-র চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের গনেশ প্রধান। তিনি বললেন, আমরা বাগান মালিককে গত নভেম্বর মাসে মেল করে জানাই আপনারা যদি বাগান না চালাতে পারেন তাহলে ছেড়ে দিন। আমরা সবাই মিলেই বাগান চালাব। এই শুখা মরশুমে বাগানে প্রুনিং এর কাজ করে গাছ সতেজ ও বেশি পাতাদায়ক করে তুলতে হয়। এ সময় এটা না করলে সারা বছর ভাল পাতা আসে। কোম্পানি আমাদের মেইল পেয়ে বার বার সময় চায়। আগামি ২২ তারিখ পর্যন্ত আমরা শেষ বারের মত অপেক্ষা করবো। এর পরেই আমরা বাগানের দায়িত্ব নিজেরাই সব শ্রমিক একত্রিত হয়ে তুলে নেব। ইতিমধ্যে পাঁচটি শ্রমিক সংগঠন মিলে বাগান বাঁচাও কমিটি গড়েছি। পাঁচজন আহ্বায়ক তৈরি হয়েছে। বিকাশ পরিষদ, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা, কংগ্রেস, ও তৃণমূলের এবং বামপন্থী সব শ্রমিকের এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনের নানা স্থানে ১৯টি চিঠি দিয়ে আমাদের কথা জানিয়ে দিয়েছি। সরকার এবারে ঠিক করুক আমাদের জন্য তারা কী করবে। আমরা মৃত্যুর মিছিল আর দেখতে চাই না, এবার আমরা জীবন বাঁচাবার মিছিল করতে চাই। গণেশ প্রধান ছারাও আরও যে কজন আহ্বায়ক হয়েছেন তারা হলেন সারা রাই,সপন নেহার,সারন ব্যোমযান, এবং বিকাশ পরিষদের রবি। এই শ্রমিক নেতারা বলেন এছাড়া আমাদের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। অনেক প্রান ঝরে গেল তবুও কিছু হোল না। মালিক চুপচাপ বসে সরকারের আইন আছে তবু কার্যকরী হচ্ছে না আমাদের বাঁচাতে। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে, কিছু একটা করতেই হবে। তাই এবার আমাদের পথ আমাদেরই খুজে নিতে হবে। ডানকানের বাগানের অসহায় শ্রমিকরা এখন মৃত্যু দূতকে হারাতে বদ্ধপরিকর। জেহাদ সরকারি উদাসীনতার বিরুদ্ধে।

Featured Posts

Advertisement