কে রাখে খবর তার।

মধুসূদন চ্যাটার্জি

২৭ নভেম্বর, ২০১৬

কাজ করতেন নির্মাণ শ্রমিকের। টাকা বাতিলের সাথে সাথে তাঁদের কাজও বাতিল হয়েছে। পাঁচশো-হাজারের নোট বাতিলের পরদিনই বাঁকুড়ার ঠিকাদার ডেকে বলে, তোদের তো আর পেমেন্ট হবে না। তারপর বড় মনের ঠিকাদার নিজেই ঠিকাশ্রমিকদের ত্রাতা হয়ে হাজির হন। ‘তোদের টাকা দিচ্ছি ঘর থেকে ভোটার কার্ডটা নিয়ে আয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে সব ব্যাঙ্কে লাইন দে। আজ আর কোন কাজ করতে হবে না, তোরা ইয়ংম্যান, এই বয়েসে খাটবি না তো কখন খাটবি! লাইনে দাঁড়িয়ে চার হাজার করে টাকা চেঞ্জ করে নিয়ে আয়।’

এক একজনের হাতে পুরোনো পাঁচশো-হাজারের চার হাজার টাকা ধরিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় এক একজন যুবককে। মালিকের লোক তাঁদের উপর নজর রাখে।

ভোরে লাইন দিয়ে টাকা পেতে পেতে সেই বিকেল। মাঝে খাওয়া দাওয়া কিছুই নেই।

‘মালিকের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার পর সে কী খুশি! আমাদের পুরোনো পেমেন্ট কিছু দিল। বললো সবটাতো দিতে পারবো না, বুঝতেই পারছিস আমাকেও তো চলতে হবে।’ এক শ্রমিক জানালেন। ‘জিজ্ঞাসা করেছিলাম আজ যে লাইন দিলাম তার কিছু? বলিস কীরে। এটা তোদের ভালোর জন্য করলাম, না হলে তোরা পেতিস টাকা? এখন আর বাকি টাকার জন্য চেঁচামেচি করিস না। কাজও বন্ধ থাকবে। যখন হবে তখন জানাবো।’

বললেন, ‘খালি পেটে সারাদিন লাইন দিয়ে টাকা তুলে মালিকের হাতে দিলাম, তার কাজ মিটলো আমাদের কাজ গেল।’

এভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছেন, হতে বাধ্য হচ্ছেন চিত্ত বারুইয়ের মতো এমন অনেক যুবক। আবার অনেকের জনধন অ্যাকাউন্টেও টাকা রাখা হচ্ছে। বুধবারই বাঁকুড়ার নতুন চটির একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে এই খাতায় টাকা রাখতে গিয়ে ব্যাঙ্কের কর্মচারীদের কাছে ধরা পড়ে যান এক হকার যুবক। অপমানিত হলো যুবকটি। যে অলক্ষ্যে থেকে টাকাটা পাঠিয়েছিল সে নিরাপদেই রইল।

গ্রাম ভারতের মতো গ্রাম বাংলাতেও এই নোট বাতিলের ঘটনায় বেশ কিছু কাজ হারা যুবককে অন্যভাবে খাটিয়েও সামান্য কিছু তাদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে। মিলেছে সে তথ্যও। মিলেছে এমন আরো আরো তথ্য।

‘‘জানেন পয়সার জন্য আজ পনেরো দিন দাঁড়ি পর্যন্ত কাটাতে পারিনি। রাস্তায় পরিচিত লোকজন জিজ্ঞাসা করেছেন বাড়ির কেউ মারা গেছে নাকি? কী বলব বলুন।’’ কথাটা শুনে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। ভেবেছিলাম হয়ত খানিকটা বাড়িয়েই বলছে। চুপ করে থাকতে দেখে জন মজুর যুবকটি বলে ওঠে, ‘‘ভাবছেন মিথ্যা বলছি? এই দেখুন ছাতনার ঝগড়াপুর থেকে এখানে কাজে এসেছি। ১০ টাকা ভাড়া দিয়েছি। পকেটে দুটো ২টাকার কয়েন পড়ে আছে। ভেবেছিলাম কাজ পাব। তাহলে দুপুরের ভাতটা এখানেই হোটেলে খেয়ে নেব। বাকি পয়সা নিয়ে ঘর যাব। ১১টা বেজে গেল এখনও কোন কাজ মিললো না। পাঁচদিন ধরে ঘুরে যাচ্ছি। ভাত এখানে জুটবে না, এখানেও কারোর কাছে ১০ টাকা ধার পাবো না, বাসের লোককে বলে কয়ে ম্যানেজ করে ঘর ফিরতে হবে। কাল আর আসব না।’’

নিজের ও সংসারের অস্তিত্ব রক্ষার এক গভীর সংকটের মুখে পড়ে কথাগুলো জানিয়ে গেলেন বাঁকুড়ার ছাতনার ঝগড়াপুরের দিনমজুর যুবক দয়াময় দেওঘড়িয়া।

যেটুকু বলার তার বাইরে একটা কথাও বললেন না। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রাস্তার দিকে। নোট বাতিলের মরীচিকার ফাঁদে পড়ে আজ আক্রান্ত গ্রাম বাংলার লাখো লাখো যুবক। যন্ত্রণাক্লিষ্ট যুবক যুবতীর এক জলজ্যান্ত প্রতীক বাঁকুড়ার এই দিনমজুর দয়াময় দেওঘড়িয়া। এমনিতেই গ্রাম বাংলায় কাজের টান। সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ কমছে দ্রুত। সেই বিশাল বেকার বাহিনী পেটের জন্য রাস্তায় দাঁড়াচ্ছেন, অন্য যে কোন গতর খাটানোর কাজের জন্য। একেবারে আনকোরা কাজে হোঁচট খাচ্ছে। তাও ছাড়ার কোন প্রশ্ন নেই। মাথায় সব সময় ঘুরছে বাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে চার পাঁচটা মুখ। রেগার কাজ প্রায়ই বন্ধ। যদিও এক দুটো কাজ মিলত, তার মজুরী দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি, যাচ্ছেও না। এই কাজেই বামফ্রন্টের আমলে কাজের মাপের পরই নির্দিষ্ট সময়ে মজুরী মিলত। এখন কেন মিলছে না, তার উত্তর এঁরা জানেন না। পঞ্চায়েতে গেলেও জানানো হয় না। খালি বলা হয় যখন আসবে তখন পাবে। গ্রামীণ যুবক যুবতীদের কাজের একটা বিরাট ক্ষেত্র একটু করে সংকুচিত হয়ে আসছে, তাহলে বেঁচে থাকার ভরসা কোথায়?

এক অবসাদ নিয়েই দয়াময় দেওঘড়িয়া, বিষ্ণুপুরের বন্ধ কারখানার শ্রমিক সেলিম মন্ডল, বা বড়জোড়ার বাগুলির বন্ধ হয়ে যাওয়া খোলামুখ কয়লাখনির শ্রমিক উত্তম বাউরিরা রাস্তায় নেমেছেন কাজের খোঁজে। টুকটাক করে দু’একটা কাজ জুটলেও, ‘‘আচ্ছে দিন’’ তল্পিবাহক প্রধানমন্ত্রীর ৫০০, ১০০০ টাকার নোট বাতিলের ঘোষণার পরই এই সব যুবকদের কাজ একদিন-প্রতিদিন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। খুচরো নেই, ধারে কাজ করবে? এই শান্ত কঠিন আহ্বানে চমকে উঠছে কাজের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক, যুবতীরা। দিনমজুর থেকে শুরু করে হকার, বিভিন্ন বীমার এজেন্ট, দোকানদার সকলের মধ্যেই এর মারাত্মক সর্বনাশের প্রভাব পড়েছে। দিশাহীন হয়ে পড়েছেন এঁরা।

ইন্দপুরের যুবক মার্শাল দাসের ২১শে নভেম্বর বিয়ের দিন ঠিক ছিল। গরিব খেতমজুর পরিবার। বিয়ে ঠিক হয়েছিল খাতড়ার আড়কামা এলাকায়। মেয়ের বাড়িও গরিব। বিয়ের জন্য যেটুকু জিনিস কেনাকেটার দরকার ছিল তা শেষ সময়ে কিনবে এই পরিকল্পনাই ছিল দুটি পরিবারের। ৫০০ টাকার নোট ছিল কিছু। সেগুলো ভাঙাতে পারেনি। বিনিময় করতে করতে গিয়ে ফিরে এসেছে। মেয়ের বাড়ি থেকেও জানানো হয়েছে কদিন পর বিয়ে হবে। অবস্থা একটু ঠিকঠাক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা।

বৃহস্পতিবার বাঁকুড়া কলেজ মোড়ে রাজমিস্ত্রির যোগানদার হিসাবে কাজের খোঁজে আসা মার্শাল এখন ভাবছোন, আর বিয়েই করবেন কিনা। বললেন, খাওয়াবো কী? এমনিতেই তো কাজ নেই। আবার এই টাকার সমস্যাতেও কাজ মিলছে না। বিয়ের পর নতুন বৌয়ের আবদার মেটানো তো দুরের কথা, ভাত দিতে পারব কিনা ঠিক নেই। কেন দুটো পরিবারকে যন্ত্রণা দেব।

বাঁকুড়া শহরের রানীগঞ্জ মোড়ে কথা হচ্ছিল বাদুলাড়া গ্রামের সমীর বাউরির সঙ্গে। তিনিও কাজের লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বয়স ২৮। জানালেন, তিন দিন পর একদিন কাজ মিলেছিল। মজুরী কত? এমনিতে মজুরী ২০০টাকা। তবে কাজ করার পর মিস্ত্রি বললো তাকে ২০ টাকা কমিশন দিতে হবে। কারণ সে কাজ দিয়েছে। এই কমিশন দিয়েই দু-একটা কাজ মিলছে। তাও প্রতিদিন নয়। ঠিকাদারের কাজ প্রায় বন্ধ। জানান মিস্ত্রি যুবক মুর্শিদাবাদের আজম খাঁ। জানালেন, যারা কাজ করাতেন তাঁদের হাতে বড় টাকার নোট। ঘরে যা আছে তা বাজারে খরচ করতে পারছেন না। ব্যাঙ্কেও টাকা মিলছে না। বন্ধ কাজ। পেট বন্ধ আমাদেরও। কোথায় কাজ পাবে যোগাড়িয়ারা। তাই পয়সার অভাবে দাঁড়ি কাটা হয় না দয়াময় দেওঘড়িয়ার। পেট চালাবে না দাঁড়ি কামাবে?

পুরো দমে এখন শুরু হয়েছে ধানকাটা। গ্রাম বাংলার খেতমজুর, কৃষকদের মুখে খানিক হাসি ফোটার সময়। খানিক মানে সেই দান ঘরে এনে কৃষক ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারবেন কিনা, তার তো নিশ্চয়তা নেই। পরিবর্তনের ছ’বছরের জমানায় সেই সুযোগ কৃষকের আসেনি। যাই হোক এবছর রাজ্যে ধান মোটের উপর ভালই হয়েছে। তবে খেতমজুরের যন্ত্রণা বেড়েছে। একদিকে মেশিনে ধান কাটা, মাঠ থেকে তোলা, বাছাই সবই মেশিনে করছে। অন্যদিকে এর মধ্যেই যেটুকু কাজ মিলছে তাতে কিন্তু মজুরী মিলছে না। ছাতনার মেটালার খেতমজুর যুবক গোপীনাথ বাউরি জানালেন, তিনদিন পর পর ধান কাটতে গেছি। মালিক কাচু মাচু মুখ করে জানায়, দেখতেই তো পারছিস ব্যাঙ্কে টাকা দিচ্ছে না, ঘরেও টাকা নেই, কী মজুরী দেব? তার চেয়ে বরং ধান নিয়ে যা। কোথায় বিক্রি করব ধান? আমাদের চলবে কী করে? কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। তাই চারদিনের দিন আর যাইনি। ঘরে অসহায় হয়ে বসে আছেন হাজারো খেতমজুর।এই সময় বিষ্ণুপুরের রাধানগরের কাস্তে মিস্ত্রি যুবক পন্ডারাম কর্মকার প্রতিদিন ১০টা করে কাস্তে বিক্রি করতেন। এবছর নোট বাতিলের যাঁতাকলে পড়ে তাঁর সমস্ত কাস্তে ঘরে পড়ে রয়েছে। জানালেন, এই ধান কাটার সময়েই তার বিক্রিবাটা হত। সংসার চালাতে পারছেন না যুবকটি। যে কৃষক যুবক বাড়ির চাষ দেখেন তিনিও যন্ত্রণায় ছটপট করছেন। কবে ধান কাটা হবে? মেশিনে কাটতে গেলেও তো টাকা লাগবে? এর মধ্যে হাজির হয়েছে সব নতুন নতুন ফড়ে, যাদের বাজারে দেখা যেত না। জানালেন সিমলাপালের যুবক কৃষক প্রশান্ত সিংঠাকুর। ওরা এসে দাম বেশি দেবো বলছে। প্রথমে বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম ভালই। দরদামের সময় জানালো সব পুরোনো ৫০০- ১০০০ টাকার নোট দেবে। সেই টাকা জমা দেব কোথায়? গ্রামে তো সমবায় ব্যাঙ্ক, সেখানে তো ওই পুরোনো নোট নিচ্ছে না। নিচ্ছে না পোস্ট অফিসেও। তাহলে? এই সংকট সর্বত্র।

বাঁকুড়া পোস্ট অফিসে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের এজেন্টের কাজ করেন যুবক সন্দীপ চ্যাটার্জি। জানালেন, ডাকঘরের ফতোয়ায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে ৫০০, ১০০০এর নোট জমা দেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রাহকরা টাকা জমা দিতে পারছেননা। এই টাকা থেকে আমরা কমিশন পাই। সংকট তৈরী হয়েছে এই অংশের যুবকদেরও। বাঁকুড়া জেলার একটা বড় অংশের যুবক এখানে কাজের অভাবে ভিনরাজ্যে কাজ করতে চলে গেছেন। তাঁরা নিয়মিত টাকা মজুরী থেকে পাওনা টাকা বাড়িতে পাঠান। তাতে কোনরকমে সংসার চলে। সেই টাকাও পাঠাতে পারছেন না তাঁরা। দিনের পর দিন ব্যাঙ্কে গিয়েও ছেলের টাকা পাওয়ার খবর পাচ্ছি না, জানালেন মেটালার যুবক মিঠুন বাউরির বাবা দয়াময় বাউরি।

এই গ্রামেই মসলার দোকান চালান যুবক গোপী মুষিব, পথিক গোস্বামী। খদ্দেরের অভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন দোকান। জানান কে কিনবে, খুচরো টাকার অভাবে মানুষের কাজ নেই। গরিব মানুষই আমাদের খদ্দের। তাঁরা নেই, দোকানের ঝাঁপি বন্ধ। হরিডির সবজি বিক্রেতা রঞ্জিত ভান্ডারী আজ ১২ দিন তাঁর সাইকেলের ক্যারিয়ারে ঝুড়ি বাঁধা বন্ধ করেছেন। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে সবজি বিক্রি করতেন। খুচরোর অভাবে বিক্রি বন্ধ। সব বড় সমস্যায় পড়েছেন গ্রামের যুবকরাই। বেশিরভাগ গ্রামেই কোন এ টি এম নেই। যা ব্যাঙ্ক পরিষেবা আছে, তাতে সামান্য টাকাও মিলছেনা। সোনামুখীর পাথর মোড়া এলাকায় একটি গ্রামীণ ব্যাঙ্ক টিমটিম করে জ্বলছে। সেই ব্যাঙ্কে লাইন দেওয়ার জন্য হাতির হামলার মাঝেও গভীর জঙ্গল এলাকা ইন্দকাটা থেকে শুরু করে একাধিক গ্রাম থেকে মানুষজন এই শীতে মাঝরাত থেকে ঘর থেকে বের হচ্ছেন।

আবার এই নোট বাতিলের ঘটনায় কিছু মানুষের বাড়তি রোজগারও বেড়েছে। সোনামুখীর এক শিক্ষক জানালেন, ৫০০ টাকার নোট দিলে ১০০ টাকা কেটে খুচরো দেওয়ার কাজে নেমে পড়েছে কিছু মানুষ।

একদিকে কাজ নেই, অন্যদিকে কাজ করলেও তার প্রাপ্য পাওয়া অনিশ্চিত। এই সর্বনাশের যাঁতাকলে পড়ে দিশাহীন আজ লাখো যুবক। এদের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো পরিবার। কিন্তু এদের খবর কে রাখে?

Featured Posts

Advertisement