বেজুনির কাছে শোনা...

পারুল আবরোল

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

তথাকথিত উন্নয়ন থেকে হয়তো পিছিয়ে! কিন্তু মানসিকতার উন্নয়নে অনেক এগিয়ে।

নেই লিঙ্গ বৈষম্য। এই গ্রামে পুরুষ-মহিলার সমান অধিকার। মহিলারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন। যে কোনও কাজে এগিয়ে আসতে পারেন, আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাঁদের যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্তই হয় শেষ সিদ্ধান্ত। এই গ্রামে নেই নারী-পুরুষ ভেদাভেদ, রাস্তায় একা কোনও মহিলাকে এখানে কটূক্তি শুনতে হয় না। সহ্য করতে হয় না পাশবিক নির্যাতনও। তৈরি হয় না ধর্ষণের পরিসংখ্যান।

ঝাঁ চকচকে কোনও বিদেশি গ্রাম নয়, এই গ্রাম আদিবাসীদের। বাস উপজাতি সম্প্রদায়ের।

গা ছমছমে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বেশ কিছুটা দূরে নিয়ামগিরির ‘কোন্ধ’রা। ওডিশার রায়গড়ের এই আদিবাসীদের সমাজব্যবস্থা ভিন্ন। উন্নয়নের হাতছানি থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও তারা লিঙ্গ বৈষম্যের ধারণা থেকে বাইরে গিয়ে নারী-পুরুষ সমমর্যাদার সমাজ গঠন করতে পেরেছে। কৃষিকাজ, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বিভিন্ন ধরনের কাজে সক্রিয় মহিলারা, জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নারী শক্তিই।

২০১৪ সালে ওডিশার বিস্‌সামকটক ব্লকের বন দপ্তরের এক আধিকারিক কান্ধুগুদা গ্রামে গিয়েছিলেন, গ্রামবাসী এবং বন দপ্তরের দীর্ঘদিনের বিবাদ নিয়ে আলোচনা করতে। বেশ অবাক হতে হয়েছিল ওই ‌আধিকারিককে। কোনও পুরুষ জমায়েত নয়, মহিলারা এগিয়ে আসেন কথা বলতে, নেতৃত্বে প্রৌঢ়ারা। দেশের অন্য কোনও প্রান্তে কোনও গ্রামে গেলে হয়তো একজন পুরুষ সরপঞ্চ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আসতেন, আর পিছনে থাকত পুরুষদেরই একটি বড় জমায়েত।

রায়গড় জেলার সমভূমি এলাকায় ‘কোন্ধ’দের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা। তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এটুকুই বৈশিষ্ট্য নয়। মহিলারা বিভিন্ন কঠিন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। নারী-পুরুষ সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে এই সম্প্রদায়। পিতৃতন্ত্র থাকলেও নেই বাঁধাধরা কড়া শাসনব্যবস্থা। পুরুষদেরও করা হয় না অবহেলা। নারী ও পুরুষকে দেওয়া হয় সমান মর্যাদা। নিয়ামগিরির করণদিগুদা গ্রামের বাসিন্দা বছর ৬৫’র লোকনাথ নাউরির ব্যাখ্যা, ‘নিয়ামগিরির রাজা নিয়ামা রাজার অবস্থান পাহাড়ের উপর, তিনি পুরুষ। আর গ্রামে ঢোকার মুখেই একটি কাঠের অবয়ব, তিনি মহিলা, দেবী। দু’জনেই আমাদের অলঙ্কার। ওঁরা থাকায় আমরা গর্বিত।’

‘কোন্ধ’দের মধ্যে শ্রমের ভাগ দর্শনভিত্তিক। প্রতিটি গ্রামেই সরকারি বিভাগ যা কুটুম্ভ নামে পরিচিত, সেখানে মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে সমানভাবেই অংশ নেন। নিজেদের ভাবনা জানান, সপক্ষে যুক্তিও দেন। পুরুষরা চাষের কাজে বা শিকারে বেরলে, মহিলারাই আগলে রাখেন গোটা সমাজকে।

কান্ধুগুদার একটি ঘটনায় স্পষ্ট হবে এখানকার মহিলাদের দাপট। সরকারি আধিকারিকরা আচমকাই গ্রামের ভিতর ইউক্যালিপটাস গাছ বপন করতে উদ্যোগ নেন। গ্রামবাসীরা বাধা দিয়েছিলেন। তাঁদের মত ছিল, ‘ইউক্যালিপটাস স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গ্রামবাসী এবং পশু-পাখিদের উপযোগী গাছের চারা বপন করা হোক।’ বন দপ্তর শোনেনি গ্রামবাসীদের কথা। জোর করে তাঁদের জমিতে লাগিয়েছিল ইউক্যালিপটাস গাছের চারা। গ্রামবাসীদের লাগাতার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। তবে দমে যাননি গ্রামবাসীরা। এগিয়ে এসেছিলেন গ্রামের মহিলারা। সামনে ছিলেন দুই প্রৌঢ়া, সিঙ্গারি কুনগারুকা এবং কোসা কুনগারুকা। তাঁরা বলেছিলেন, ‘আমরা গাছ বপনের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু এমন কোনও গাছের চারা লাগানো হোক, যাতে আমরা উপকৃত হই।’ কিন্তু কথা কানে তোলেননি ওই আধিকারিক। বারবার হুমকি, ন্যায্য কথাতেও আধিকারিকদের তাচ্ছিল্য! প্রতিবাদে সপাটে চড় আধিকারিকের গালে। দুই প্রৌঢ়ার নেতৃত্বে মহিলাদের প্রতিবাদী মিছিলও রওনা হয় থানার দিকে। সেদিনের মতো পালিয়ে গিয়েছিলেন ওই আধিকারিক। কিন্তু পরের দিনই এক গাড়ি পুলিশকর্মী গ্রামে হানা দেয়। ফের রুখে দাঁড়ান মহিলারা। নিজেদের গ্রাম তো বটেই, প্রতিবেশী গ্রামের বাসিন্দারাও শামিল হন প্রতিবাদে। সেদিনও পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল পুলিশ।

স্বাভাবিকভাবে এখানে একটি গ্রামে ২০ থেকে ২৫টি ঘরের বাস বা একটি করে কুটুম্ভ। গ্রামে যেকোনও বিষয়ে প্রত্যেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সিদ্ধান্তের কথা জানাতে পারেন। নেই কোনও নেতা। প্রস্তাব বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সংখ্যাধিক্য এবং যৌক্তিকতার বিচারে।

বিভিন্ন ধরনের কাজ থেকে জীবন পরিচালনা, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে মহিলারাই। জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা স্বাধীন। কোনও স্বামী তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে সেই মহিলার সম্পূর্ণ অধিকার আছে স্বামীকে ছেড়ে চলে যাওয়ার। আবার যদি বিয়ের পরও কোনও মহিলার অন্য কাউকে ভালো লাগে সেক্ষেত্রেও কোনও ভয়-ভীতি ছাড়াই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে সে। যদি কখনও গার্হস্থ্য হিংসা বা তর্কাতর্কি হয় কোনও দম্পতির মধ্যে, সেক্ষেত্রে কুটুম্ভ মধ্যস্থতার চেষ্টা করে। কিন্তু সম্পর্কে থাকবে নাকি বেরিয়ে যাবে, তা একান্তই সেই মহিলার সিদ্ধান্ত।

এই এলাকারই এক দোভাষী জগন্নাথ মাঝি কথা বলতে-বলতে ফিরে গিয়েছেন নিজের ছোটবেলায়। চলে গিয়েছেন নিজের ছেলেবেলার একটি ঘটনা। ‘তখন অনেক ছোট। একদিন জঙ্গলে গিয়েছিলাম কিছু পাতা আনতে। কিন্তু আচমকাই উর্দিধারীদের হাতে পাকড়াও হতে হলো। বন দপ্তরের আধিকারিকরা হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যায় থানায়। বেআইনি কাজের অভিযোগ ওঠে।’ দীর্ঘ কয়েক বছর পেরিয়ে এসে সেদিনের স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি বলছেন, ‘মা খুব রেগে গিয়েছিলেন। গোটা গ্রামের বাসিন্দাদের একজায়গায় জড়ো করেন। থানার বাইরে মা’র নেতৃত্বে ধরনায় বসেন গ্রামের অন্যান্যরা। পুলিশ আমাকে না ছাড়া পর্যন্ত মা লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন, সমানে-সমানে টক্কর দিয়েছিলেন।’ জগন্নাথের মা-ই শুধু নন, ওই আন্দোলনের শিরোভাগে ছিলেন আরও অনেক মহিলা। আর তাঁদের দাপটেই পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল পুলিশ।

গ্রামের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে মহিলাদের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। গৃহস্থদের মধ্যে আলাপচারিতা, কথাবার্তা আদান-প্রদান পর্ব চলে। গোটা সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। কয়েক বছর আগে, সরকার ইন্দিরা আবাস যোজনার অধীনে গ্রামে পাকা বাড়ি বানানোর একটি প্রকল্প নেয়। সেই প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি আর্কিটেক্টরা জানান, বাড়িগুলি প্রত্যেকটি স্বতন্ত্রভাবে গড়ে তোলা হবে। একেকটি বাড়ির দরজা একেকদিকে হবে, কোনও বাড়ির দরজাই মুখোমুখি থাকবে না। এক বাড়ির বাসিন্দার সঙ্গে অন্য বাড়ির লোকজনের দেখা হওয়ারও কোনও সুযোগ থাকত না। এই প্রকল্প এবং পরিকল্পনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান গ্রামের মহিলারা। গ্রামের চিরাচরিত সম্পর্ক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই পরিকল্পনা আঘাত হানবে দাবি করে বিরোধিতা করেন তাঁরা। মহিলাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধেই সরকার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়। চিরাচরিত কাঠামোর ভিত্তিতে বাড়ি তৈরি হবে এই নির্দেশিকা জারি হওয়ার পরই নির্মাণ কাজ শুরু করতে দেওয়া হয় গ্রামে। বিস্‌সামকটক ব্লকের বাড়িগুলি ইন্দিরা আবাস যোজনার অধীনেই নির্মিত। কিন্তু কোন্ধ সম্প্রদায়ের মহিলাদের দাবি অনুযায়ীই বাড়িগুলি তৈরি করা হয়।

কোন্ধ সম্প্রদায়ের গৃহস্থ বাড়িগুলিতে বীজকে একটি মূল্যবান সম্পদ মনে করা হয়। আর বীজ কার্যত এই মহিলাদের খাস সম্পত্তি। বীজ সাজানো, পরের বছরের জন্য তা সংরক্ষণ, দেবতাকে নিবেদন এবং বপনের সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ মেপে বীজ দেওয়া— সবটাই মহিলাদের দায়িত্ব। শস্যের বীজ এবং মহিলাদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক কার্যত মহিলাদের সম্মান ও সমাজে মহিলাদের অবস্থান নির্দেশ করে।

মুনিগুদা ব্লকের দুলারি গ্রামের বছর ৫৫’র শ্রীমতি দুদুকার কথায়, ‘বিশ্বমাতা আমাদের এই বীজ দিচ্ছে। এটি তার দান, তারই ফসল। আমাদের প্রতিবেশী কোনও গ্রাম থেকে এই বীজ চাইতে হয় না, আমাদের নিজের জমি থেকেই পাই। ভবিষ্যতে আরও বেশি ফসল যাতে দিতে পারে, সেজন্য নিজেকে তৈরি করছে আমাদের জমি। আমরা কখনওই তাকে অশ্রদ্ধা করতে পারি না।’ কোন্ধ-এ সবথেকে মূল্যবান হলো এই বীজ।

শুধু নেতৃত্ব দেওয়াই নয়। বীজের রক্ষণাবেক্ষণ, খাবার তৈরি এসবের মধ্য দিয়েও মহিলারা একাধারে সংস্কৃতির কান্ডারি হয়ে উঠেছেন। ফেলে দেওয়া বিভিন্ন শস্য বা কোনও সবজির কোনও অংশ মহিলারা সুস্বাদু রান্নাই করেন তা নয়, নিজেদের সন্তানদের তা খাওয়ানোর পাশাপাশি বুঝিয়ে দেন সেই শস্যের গুরুত্ব। কয়েকদশক ধরে সেইসব শস্যকে পর্যায়ক্রমিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণও করছেন তাঁরা। নিজেদের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শস্য রক্ষা করছেন সম্প্রদায়ভুক্ত মহিলারা।

কুটুম্ভের কাজ তিনভাবে হয়ে থাকে এবং প্রত্যেক ভাগের কান্ডারিও আলাদা। তাঁদের নামও ভিন্ন— জানি, দেসারি এবং বেজুনি। এই ‘বেজুনি’ সবসময়ই একজন মহিলা। উৎসব-অনুষ্ঠানে একজন ‘জানি’ শাস্ত্রীয় আচার পালন করেন। দেসারি স্থানীয় ওষুধ এবং আবহাওয়া সংক্রান্ত খবরাখবর রাখেন। বেজুনি বিভিন্ন বিপদ সম্পর্কে সচেতন করেন প্রত্যেককে, পুরুষরা শিকারে বেরোনোর আগে তাঁদের নির্দেশও দেন।

যে সময়ে খাস কলকাতার রাস্তায় অন্ধকার নামলে আট থেকে আশি, নাবালিকা থেকে বৃদ্ধা আশঙ্কায় ভোগেন, একা রাস্তায় হাঁটতে গেলে গা ছমছম করে ওঠে পাশবিক অত্যাচারের ভয়ে, যেখানে দিনে দুপুরেও নারীর শ্লীলতা নিয়ে হয় ছেলেখেলা, সেই সমাজেই, সেই দেশেরই প্রত্যন্ত এলাকায় লুকিয়ে রয়েছে এক ভিন্ন চিন্তাধারা। সভ্য সমাজের তথাকথিত ধারক-বাহকরা যা করতে পারেননি, করে দেখিয়েছেন আদিবাসীরা।

(রুরালইন্ডিয়াঅনলাইনের সৌজন্যে)

Featured Posts

Advertisement