গৃহভিত্তিক মহিলা শ্রমিক এবং নোট বাতিল

অর্চনা প্রসাদ

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বারবার নোট বাতিলের পদক্ষেপের বিরোধীদের কালো টাকা মজুতদারদের পৃষ্ঠপোষক রূপে অভিহিত করে চলছেন। এবং সেই সাথে তারা দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছেন এই অভিযোগও তুলছেন। এই যুক্তি এই ইঙ্গিতই বহন করে যে যারা যত নগদে উপার্জন করেন যদি সেটা আইনসম্মতভাবেও হয়েও থাকে তারা অপরাধী এবং তারা পার পেয়ে যেতেন যদি কোন রকম প্রস্তুতির জন্য সময় দেওয়া হতো।

সরকারের দিক থেকে এই আগ্রাসী প্রচারের একটা মৌলিক ত্রুটি আছে। এটা ধরে নেওয়া হচ্ছে নোট বাতিলের ফলে একমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন টাকার মজুতদাররা। কিন্তু গরিব শ্রমিক নন যাদের বেঁচে থাকাটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নগদ টাকায় পাওয়া মজুরির উপর। এটা বিশেষভাবে সত্য অপ্রথাগত শ্রমক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে যারা মোট শ্রমশক্তির ৮০ শতাংশ তাদের মধ্যে ৪২ শতাংশ অকৃষিকাজে যুক্ত, তাদেরকে ‘গৃহভিত্তিক শ্রমিক’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। তারা গৃহে থেকে খণ্ডিত হারে কাজ করে থাকে এবং গ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয় সাব-কন্ট্রাক্টিং পদ্ধতির মাধ্যমে যা মূলত নগদ নির্ভর। তাই এদের জীবন ও জীবিকার উপর নোট বাতিলের প্রভাব অনুধাবন করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গৃহভিত্তিক শ্রমিক এবং অস্তিত্ব বজায় রাখার বৃত্ত

২০১২ সালে ভারতে গৃহভিত্তিক শ্রমে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩৭.৫ মিলিয়ন। তার মধ্যে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা ১৬.০৪ মিলিয়ন। ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে মোট শ্রমশক্তির সাথে গৃহভিত্তিক শ্রমে নিযুক্ত অর্ধ মিলিয়ন শ্রমিক সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এবং যারা মূলত নিযুক্ত তিনটি ক্ষেত্রে — বিড়ি শিল্প, তাঁত শিল্প এবং পোশাক-পরিচ্ছদ প্রস্তুতকারক শিল্প।

সি আই টি ইউ ২০১৩ সালে এই ধরনের মহিলা শ্রমিকদের নিয়ে একটি সার্ভে করেছিল। যেই ৩,৩০০ জনকে নিয়ে সার্ভে করা হয়েছিল তার ৬০ শতাংশ মহিলা শ্রমিকেরই আশু দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর জন্য দৈনিক বা সাপ্তাহিক নগদ মজুরির উপর নির্ভরশীল থাকতে হয় তার মূল কারণ হচ্ছে নিম্ন মজুরি এবং স্বল্প আয়, যেখানে ৪০ শতাংশেরও বেশি শ্রমিকের মাসিক আয় ৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে এবং ৪৫শতাংশ শ্রমিক মাসে ১০০০ টাকার কম আয় করে থাকেন।

সার্ভে থেকে বেরিয়ে আসা তথ্যগুলি দ্বিগুণভাবে সমর্থিত হয়েছিল মধ্যপ্রদেশ মিনিমাম ওয়েজেস অ্যাক্ট (২০১৫)-র উপর ভিত্তি করে করা সার্ভের তথ্য থেকে।

সমীক্ষকরা ১৭টি জেলাজুড়ে সার্ভে করেছিলেন এবং দেখলেন ৮০ শতাংশেরও অধিক শ্রমিক বাড়িতে থেকে বিড়ি বাঁধার কাজে নিযুক্ত। ৫,৬০০টি বিড়ি বাঁধার বিনিময়ে দৈনিক মজুরি ৬৮ টাকা। ৮৭ শতাংশ বিড়ি শ্রমিকের ক্ষেত্রেই মজুরি প্রদান হয়ে থাকে খণ্ডিতভাবে এবং নগদে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমেই সাপ্তাহিক ভিত্তিতে মজুরি প্রদান করা হয়ে থাকে। কন্ট্রাক্টররাই কাঁচামাল সরবরাহ, ধার দেওয়া ও মজুরি লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, কন্ট্রাক্টরদের উপর নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পায় যেহেতু ওরাই হচ্ছে একমাত্র উপায় যেখান থেকে সংকটকালে ঋণ পাওয়া যায়, তাই এইরূপ নগদ লেনদেন এবং ঋণদান চক্রে কন্ট্রাক্টররা অনেকটা ত্রাতার ভূমিকা পালন করে থাকেন।

তৃতীয় সেই বিষয় যার উপর গৃহভিত্তিক শ্রমে নিযুক্ত শ্রমিকদের জীবিকা নির্ভর করে সেটি হলো কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে রপ্তানি বাজারে নিয়মিত কাজ পাওয়া। ২০১৩ সালে সি আই টি ইউ কৃত সারা ভারত সার্ভে এবং ২০১৪ সালে এস ই ডব্লিউ এ কৃত আমেদাবাদ সার্ভে এই দুটো থেকেই বেরিয়ে আসা তথ্যে আমরা জাতে পারি যে, গৃহভিত্তিক শ্রমিকদের পণ্য জোগান ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারের শৃঙ্খলে যুক্ত করা হয়েছে। আর এদের মজুরির স্তর নির্ভর করে কাজের গুণমানের উপর। তাই তাদের কোন নির্দিষ্ট আয় নেই এবং আয়ের কোন ধারাবাহিকতাও নেই। উপরোক্ত মধ্যপ্রদেশ সার্ভে থেকেও জানা যায় যে কন্ট্রাক্টররা প্রায়শই কাঁচামালের জোগান কমিয়েদেয় যেন ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার জন্য যে পরিমাণ বিড়ি বাঁধতে হবে সেই পরিমাণ বিড়ি না বাঁধতে পারে। এস ই ডব্লিউ এ কৃত সা‍‌র্ভে থেকে জানা যায় যে মহিলা শ্রমিকরা বলছেন, কন্ট্রাক্টররা কখনোই পুরো মজুরি প্রদান করেন না এবং চাহিদা পূরণে বিলম্ব ঘটলে মজুরি হ্রাস করে ফেলেন অসুস্থতাজনিত ন্যায়সঙ্গত কারণ থাকা সত্ত্বেও।

প্রতিটি ক্ষেত্র থেকেই একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে উঠে আসে যে গৃহভিত্তিক শ্রমিকরা ভীষণ অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন এবং ওরা নিয়মিত ও সরাসরি নগদ মজুরির উপর নির্ভরশীল।

নোট বাতিলের প্রক্রিয়ার প্রভাব

গৃহভিত্তিক শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনের উপর নোট বাতিলের প্রভাব এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই দেখতে হবে। প্রথম যে সম্ভাব্য প্রভাব পড়বে সেটি হলো তাদের কাজ পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে যেহেতু নিয়মিত নগদ টাকার জোগান থাকবে না। এই আশঙ্কা যে অমূলক নয় বরং ভয়ানকভাবে নিশ্চিত প্রমাণ হয়ে যায় যখন পুরাতন দিল্লির একদল মহিলা শ্রমিক গণতান্ত্রিক নারী সমিতির প্রতিনিধিবৃন্দকে জানান যে, নোট বাতিল পদক্ষেপ গ্রহণ করার পর থেকে তাদের কাজ পাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সম্ভবত দ্বিতীয় যে আশঙ্কাটা থাকছে সেটি হলো কন্ট্রাক্টর বা সাব-কন্ট্রাক্টররা বাতিল হয়ে যাওয়া নোটে মজুরি প্রদান চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এই নোটে আর তো কোন বিনিময় চলবে না। তখন এই টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু অধিকাংশ গৃহভিত্তিক মহিলা শ্রমিকদের কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই যদি তারা ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে যান তখন শুনতে হবে তারা যেন আরও মাস দুয়েক পরে আসেন এই অ্যাকাউন্ট খোলার কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। আর তখন পুরানো নোট জমা দেবার সময়সীমাও পার হয়ে যাবে। এর থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে মহিলারা তাঁদের অমূল্য কাজের সময় নষ্ট করে ব্যাঙ্কের লাইনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন আর নগদ অর্থের অভাবে দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে।

পুরাতন দিল্লি এই মহিলা শ্রমিকের দল আরও একটি বিষয়ের উপর আ‍‌লোকপাত করেন সেটি হলো শুধু তাঁরাই এই পরিস্থিতির শিকার হননি, স্বামী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন। তাঁদের কাজ নেই মজুরিও নেই। সেইসব পরিবারবর্গের অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মহিলাদেরই গৃহ থেকে শ্রমদান করে উপার্জন করতে হয়।

এইরকম পরিস্থিতি যেখানে প্রতিটি পরিবারের প্রায় দিন আনি দিন খাই অবস্থা। সেখানে নোট বাতিল পদক্ষেপ তাঁদের মজুরি উপার্জনে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে।

গৃহভিত্তিক শ্রমিকদের নোট বাতিল পদক্ষে‍‌পের কারণে যে কি বিশেষ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তার থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে এই পদক্ষেপের কারণে সবচেয়ে বেশি আঘাতগ্রস্ত হচ্ছে দৈনিক মজুরি বা খণ্ডিত সময়ের ভিত্তিতে মজুরি পাওয়া শ্রমিকবর্গ। তাঁরা যে শুধুই অনিয়মিতভাবে মজুরি পেয়ে থাকেন তাই নয় সেই সাথে তাঁদের অনেক অমূল্য কাজের সময় নষ্ট হয়ে যায় সেই মজুরি পাওয়া নিশ্চিত করতে। তারপরেও যেহেতু কন্ট্রাক্টররা বৃহৎ ব্যবসা থেকে অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যাপক পরিমাণে কাজ করে থাকে তাই এটা সম্ভব যে, যেসব পণ্য গৃহভিত্তিক শ্রমিকরা উৎপাদন করে থাকে তাঁদের সাথে ক্রেতাদের যোগাযোগ শিথিল হয়ে যায়। এছাড়া নোট বাতিল পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়ার পর দেখা গেল ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পুরাতন দিল্লির মতো জায়গাতেও পৌঁছায়নি। এই পরিস্থিতিতে এই প্রশ্ন ওঠাই প্রাসঙ্গিক যে গৃহভিত্তিক শ্রমে নিযুক্ত শ্রমিকদের অপ্রথাগত উৎস থেকে শোষণমূলক ঋণ গ্রহণ করার উদ্যোগ বাড়তি শক্তি পাবে কিনা। যদি তাই হয় তবে এই নোট বাতিল পদক্ষেপ শ্রমিকদের আরও শোষণমূলক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারবে না। তাই গরিবদের অবস্থার উন্নতি ঘটানোর জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে যে বাগাড়ম্বর চলছে তা তো নয়ই বরং দরিদ্র শ্রমিকশ্রেণিকে আরও শোষণের মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য কর্পোরেটমুখী দক্ষিণপন্থী সরকারের একটা পন্থা মাত্র।

Featured Posts

Advertisement